আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস আজ। নিখোঁজ হওয়া মানুষদের স্মরণে এবং গুমের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তুলতেই প্রতিবছর ৩০ আগস্ট দিবসটি পালনের ঘোষণা দেয় জাতিসংঘ। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর প্রোটেকশন অব অল পারসনস এগেইনস্ট এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ সম্মেলনে যে আন্তর্জাতিক সনদ কার্যকর হয়, তাতে ৩০ আগস্টকে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। দিবসটি উপলক্ষে গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন মায়ের ডাকসহ বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে।
‘গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্র্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। এতে গুম করার অপরাধে মৃত্যুদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া গুম সংক্রান্ত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং অভিযোগ গঠনের ১২০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্নের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে খসড়া অধ্যাদেশে। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অধ্যাদেশটির খসড়া নীতিগত অনুমোদন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে প্রথমে গুমের সংস্কৃতি বন্ধ করা হবে বলে জানিয়েছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। গতকাল বাংলা একাডেমিতে আন্তর্জাতিক গুম দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ‘মায়ের ডাক’র আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৮৫০ জন গুমের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৩৫০ জন এখনো ফেরত আসেননি। বিএনপি চাইছে, আর কোনো মা-বাবাকে যাতে ছবি হাতে নিয়ে সন্তান খুঁজতে রাস্তায় দাঁড়াতে না হয়। তিনি অভিযোগ করেন, আজীবন ক্ষমতায় থাকার লক্ষ্যেই আওয়ামী লীগ সরকার গুমের মতো ঘটনা ঘটিয়েছে। গত দেড় দশকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কয়েক হাজার মানুষ গুমের ঘটনা ঘটে। গুম কমিশন গঠনের এক বছরে ১ হাজার ৮০০টি অভিযোগ পড়েছে। গতকাল সকালে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্রেস ক্লাবে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) উদ্যোগে এক আলোচনা সভায় এ তথ্য জানানো হয়। সভায় মানবাধিকারকর্মী ও গুম কমিশনের সদস্যরা বলছেন, আগামীর বাংলাদেশে যেন গুম শব্দটি না থাকে, সে জন্য আমাদের যা যা করণীয় তা করতে হবে। আমরা সবাই মিলে ফ্যাসিজম তাড়িয়েছি কিন্তু আমাদের নিজেদের মধ্যে যে ফ্যাসিজম বা ফ্যাসিস্ট মনোভাব রয়েছে সেটিও দূর করতে হবে। আমাদের যে কাজগুলো ফ্যাসিজম ফিরে আসার পথ খুলে দেয়, সেগুলো বন্ধ করতে হবে। গুম মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক ভয়াবহ রূপ। তাই এর প্রতিরোধে সরকারের পাশাপাশি সব রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। সিস্টেম পরিবর্তন না করে ব্যক্তিবিশেষকে টার্গেট করে এই গুমের সংস্কৃতি দূর করা সম্ভব নয় বলে জানান গুম কমিশনের সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস। তিনি বলেন, আমাদেরকে সশস্ত্র বাহিনীগুলোর ক্যারেক্টার পরিবর্তন করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত পলিটিক্যাল পার্টিগুলো এই বাহিনীগুলোকে নিজেদের পলিটিক্যাল পান্ডা হিসেবে ব্যবহার করবে, ততদিন পর্যন্ত গুম খুন দূর হবে না। এজন্য ভবিষ্যৎ নেতাদের কাছ থেকে আমাদের এসব ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি আদায় করতে হবে এবং সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তাদেরকে দায়বদ্ধ করতে হবে। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, দল মত নির্বিশেষে সবাই গুম খুনের শিকার। ন্যায়বিচার প্রয়োজন। বিচারের দায়িত্ব ভুল ব্যক্তির কাছে গেলে হবে না। জাতিসংঘের আবাসিক অফিসের জ্যেষ্ঠ মানবাধিকার উপদেষ্টা হুমা খান বলেন, গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার এখনো ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তি হস্তান্তর ও মৃত্যু সনদের মতো মৌলিক বিষয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অনেকের নামে এখনো মিথ্যা মামলা চলছে, যা দ্রুত নিষ্পত্তি করা দরকার।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন বলেন, আমরা যদি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পাই, সেক্ষেত্রে আমাদের তিনটা উদ্দেশ্য থাকবে। মানবাধিকার, আইনের অনুশাসন এবং বাক্স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও নির্বাহী পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, নতুন বাংলাদেশে এই গুম খুনের সংস্কৃতিকে কোনো অবস্থাতেই সহ্য করা হবে না। এ ধরনের সংস্কৃতি যেন আর ফিরে না আসে, তার জন্য যত ধরনের আইনি, রাজনৈতিক এবং নৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন তা আমাদের করতে হবে।
এদিকে বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ও হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) পৃথক বিবৃতিতে বিভিন্ন দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে সব নাগরিককে গুম থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা, গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের যথাযথ পুনর্বাসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, গুমের শিকার সব নিখোঁজ ব্যক্তিকে অনতিবিলম্বে খুঁজে বের করে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং গুমের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অন্যতম।