প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে দুটো সম্ভাব্য সময়ের কথা বলেছেন। কম সংস্কার চাইলে নির্বাচন হতে পারে ডিসেম্বরে। বেশি সংস্কার চাইলে ২০২৬ সালের জুনে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কিছুদিন আগে বলেছিলেন, ডিসেম্বরে নির্বাচন হতে পারে, এটা মাথায় রেখেই কমিশন প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ডিসেম্বরে নির্বাচন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। বিএনপি জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য নেতা-কর্মীদের নির্দেশনা দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী মনোনয়নপ্রক্রিয়া শুরু করেছে, যদিও দলটি নির্বাচনের চেয়ে সংস্কারে বেশি উৎসাহী। সব মিলিয়ে পরিবেশ-পরিস্থিতি যা দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে করা যেতে পারে যে জাতীয় নির্বাচন এ বছরের মধ্যেই হয়ে যাবে।
জেনারেল ইলেকশনের আগে স্থানীয় সরকার ভোট করার যে পরিকল্পনা ছিল বা আছে তার বাস্তবায়নও কঠিন হতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে, এমন কেউ কেউ জাতীয় নির্বাচনের আগেই স্থানীয় সরকারের ইলেকশন করার কথা বলেছেন বিভিন্ন সময়ে। প্রধান উপদেষ্টা নিজেও বলেছিলেন যে জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কথাও ভাবা হচ্ছে। স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের প্রধান বলেছিলেন, বেশির ভাগ মানুষ আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চায়। তিনি একটি জরিপের কথা উল্লেখ করে জানিয়েছিলেন যে ৬৪ শতাংশেরও বেশি মানুষ এই নির্বাচন আগে দেখতে চান। সমবায় ও স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদও এক বক্তৃতায় জানিয়েছিলেন যে সরকার জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ও নুরুল হক নুরের গণঅধিকার পরিষদেরও এ ব্যাপারে সায় রয়েছে।
বর্তমান সংবিধানে না থাকলেও স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় মৌলিক গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার কথাও বলা হয়েছিল। মৌলিক গণতন্ত্র- এই টার্মটি ব্যবহার করা না হলেও মেম্বার-কাউন্সিলরদের ভোটে চেয়ারম্যান ও মেয়র নির্বাচনের কথা বলা হয়েছিল, যা মৌলিক গণতন্ত্রেরই নামান্তর। মৌলিক গণতন্ত্র সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের অনেকের পরিষ্কার ধারণা থাকার কথা না। পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ডিক্রির মাধ্যমে মৌলিক গণতন্ত্রের বিধানসংবলিত শাসনতন্ত্র জারি করেছিলেন সম্ভবত ১৯৬২ সালে। সেই ব্যবস্থায় চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত ইউনিয়নের ওয়ার্ড মেম্বারদের ভোটে নির্বাচিত করার বিধান করা হয়েছিল।
১৯৬৫ সালের জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট ইলেকশন সামনে রেখে তৎকালীন দুই পাকিস্তানের সবগুলো দল মিলে আইয়ুব খানের বিপক্ষে গঠন করে কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টি (কপ)। কপের মনোনীত প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হয়েছিলেন পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন মিস ফাতিমা জিন্নাহ। মিস জিন্নাহ ও কপের বেসিক ডেমোক্র্যাসির ইলেকশনে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল, জিততে পারলে এক বছরের মধ্যে জনগণের গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা হবে। অর্থাৎ পুনরায় ইলেকশন হবে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে। কিন্তু তৎকালীন দুই পাকিস্তানের সবগুলো দল মিলেও মৌলিক গণতন্ত্রের মেম্বারের মেজরিটির সমর্থন আদায় করতে পারেনি। সেই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের ৫৩ দশমিক ১২ শতাংশ তথাকথিত মৌলিক ভোটার আইয়ুব খানের মার্কায় ভোট দিয়েছিলেন। আর পশ্চিম পাকিস্তানে ৭০ শতাংশের বেশি বিডি মেম্বার আইয়ুব খানকে ভোট দিয়েছিলেন। এই হলো মৌলিক গণতন্ত্রের মাহাত্ম্য।
গ্রাম বা ওয়ার্ডের মতো ছোট ছোট ইউনিটে সাধারণত সেই ব্যক্তিরাই মেম্বার নির্বাচিত হয়ে থাকেন, স্থানীয়ভাবে যারা অর্থবিত্তে প্রভাবশালী। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই শ্রেণির লোকদের সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি কোনো কমিটমেন্ট থাকে না। গ্রামে আধিপত্য ধরে রাখাই তাদের মূল লক্ষ্য। আধিপত্যই যখন মুখ্য, তখন ক্ষমতার ছায়ায় থাকতেই তারা পছন্দ করেছিলেন। কড়কড়ে নোটের প্রলোভন তো ছিলই। সেই মৌলিক গণতন্ত্র বা বেসিক ডেমোক্র্যাসি ফিরিয়ে আনার একটা চিন্তাভাবনা যে আছে, তার আভাস রয়েছে। গণতন্ত্রের বিচারে নিঃসন্দেহে এটি একটি খারাপ চিন্তা।
পক্ষান্তরে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো জাতীয় সংসদের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিপক্ষে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত ২৭ ফেব্রুয়ারি দলের বর্ধিত সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে পরিষ্কার বলেছেন, ‘সংস্কার ও স্থানীয় নির্বাচন- এসব ইস্যু নিয়ে জনগণের সামনে একধরনের ধূম্রজাল সৃষ্টি করা হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রক্তপিচ্ছিল পথে রাজপথে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্য ও জাতীয় নির্বাচনের পরিবেশ বিনষ্টের অপচেষ্টা চলছে।’ তিনি যে অপচেষ্টার কথা বলছেন, হালফিল বাস্তবতায় তাকে অমূলক বলা যায় না।
কোনো কোনো উপদেষ্টাকে আমরা ইতোপূর্বেও বলতে শুনেছি যে এই সরকার কেবল একটা নির্বাচন করার জন্য আসেনি। এই সরকারকে বিপ্লবী সরকার ঘোষণা, সেকেন্ড রিপাবলিক ঘোষণা, গণপরিষদ গঠন করে নতুন শাসনতন্ত্র প্রণয়নের মতো উচ্চমার্গীয় কথাবার্তাও হয়েছে। গণ অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের দ্বারা গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি সেই চিন্তাগুলোকেই সামনে নিয়ে এসেছে ঘোষিত নীতি হিসেবে। তারা সেকেন্ড রিপাবলিক ঘোষণা করতে চান। জাতীয় সংসদের আগে তারা গণপরিষদের ইলেকশন চান।
গণপরিষদ নতুন সংবিধান প্রণয়ন করবে। নতুন সংবিধানের পর জাতীয় নির্বাচন ও নির্বাচিত সরকার। এরূপ দাবির তাৎপর্য অনুধাবন করা কঠিন নয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান আর জাতীয় নাগরিক পার্টির অবস্থানের মধ্যে যে বৈপরীত্য রয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
ডিসেম্বরে জেনারেল ইলেকশন হবে কি না, হলেও ভোট কতখানি অবাধ ও স্বচ্ছ হবে, তা-ও নিশ্চিত করে বলা যায় না। যে দেশে বহুদিন, বহু বছর ধরে অবাধ ও স্বচ্ছ ইলেকশনের দেখা পাওয়া যায়নি, মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়নি, সেই দেশের মানুষ সহজে মন থেকে সন্দেহের কাঁটা উপড়ে ফেলতে পারে না। ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। সব দিক দিয়ে অবাধ ও স্বচ্ছ একটি ইলেকশনের জন্য যে উপাদানগুলো বর্তমান থাকা অপরিহার্য, সেগুলো আছে কি না, তা নজর করে দেখা দরকার। সরকার এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতা, ইলেকশন কমিশনের নিরপেক্ষতা, ক্ষমতা ও ক্ষমতা প্রয়োগের সক্ষমতা, গণতন্ত্রের প্রতি রাজনৈতিক দল এবং নেতা-কর্মীদের কমিটমেন্ট- এগুলো স্বচ্ছ ইলেকশনের জন্য জরুরি। আর দরকার ভোটার সাধারণের সচেতনতা। সরকার, ইলেকশন কমিশন, রাজনৈতিক দল কিংবা ভোটার সাধারণ- কারও পক্ষেই বিচ্ছিন্নভাবে অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
শুনতে ভালো না শোনালেও অনেক ক্ষেত্রেই সরকারের সক্ষমতা প্রমাণিত হয়নি।
দেশে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চলছে। প্রতিদিনই গ্রেপ্তার হচ্ছে কমবেশি। এই অভিযানের মধ্যেও শহর ও গ্রামে ছিনতাই, ধর্ষণ, গণপিটুনির ঘটনা ঘটে চলেছে আকসার। যখন এরকম একটি অভিযান চলছে, তখন ছোটবড় সব শয়তানের ‘ছেড়ে দে মা পালিয়ে বাঁচি’- অবস্থা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হচ্ছে বিপরীত। কেন এমন হচ্ছে?
অনেক ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী অরাজনৈতিক সরকার কেন প্রত্যাশিত সাফল্য দেখাতে পারছে না, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানেও কেন অপরাধীরা ভয় পাচ্ছে না, তার কারণ সরকারকেই খুঁজে বের করতে হবে। রাজপথের বিপ্লবীরা নতুন দল করেছেন- জাতীয় নাগরিক পার্টি। পার্টির নেতা সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। পদত্যাগ করে দলের হাল ধরেছেন। খুব ভালো কথা। এই তরুণদের নিয়ে সাধারণ মানুষের আশা-ভরসা ছিল অনেক। গত সাত মাসে সেটা কতখানি অবশিষ্ট আছে, বলা মুশকিল। এটা ওপেন সিক্রেট যে বৈষম্যবিরোধীরা সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে চলেছে শুরু থেকেই। সরকারে তাদের প্রতিনিধিও রয়েছে। বর্তমান তথ্য উপদেষ্টাকে জুলাই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড বলে ড. ইউনূসই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। এমতাবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে নতুন দলের নেতাদের একটা নিবিড় সম্পর্ক থাকা বিচিত্র নয়। দলটি কিংস পার্টি নয়, তা প্রমাণ করা কঠিন। হালফিল বাস্তবতায় ড. ইউনূস সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে বৈকি। আর সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে অবাধ নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলীয় নেতা-কর্মীদের জনগণের বিপক্ষে যায়, এমন কাজ করা থেকে বিরত থাকার জন্য পূর্বাপর হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছেন। উচ্ছৃঙ্খল অনেক নেতা-কর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। দলীয় হাইকমান্ডের এ অবস্থান প্রশংসনীয়। তারপরও মাঠপর্যায়ের একশ্রেণির বেপরোয়া নেতা-কর্মীদের দলটি বাগে আনতে পারেনি। গণতন্ত্রের জন্য অবস্থাটি ইতিবাচক নয়। সুশৃঙ্খল দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর সুনাম শুনেছি। তাহলেও কোনো কোনো জায়গায় তাদের বিরুদ্ধেও সংঘশক্তি প্রদর্শনের অভিযোগ রয়েছে। নাগরিক ঐক্যের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্নাকে তাঁর নির্বাচনি এলাকায় ঢুকতে না দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অনেক জায়গায় স্থানীয় প্রশাসন রাজনৈতিক দলের চাপে ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এই আচরণগুলো গণতান্ত্রিক রীতিনীতির সঙ্গে যায় না। এগুলোর পরিবর্তন দরকার।
দেশের মানুষ এমন একটি নির্বাচন চায়, যা হবে সর্ববিচারে অবাধ, নিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। কোনো ছোট দল বা স্বতন্ত্র সম্ভাব্য প্রার্থীকে যদি তার নির্বাচনি এলাকায় ঢুকতেই দেওয়া না হয়, তা হলে অবাধ নির্বাচন হবে কোন জাদুবলে?
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক