ব্রিটিশ রকসংগীতশিল্পী বার্কলি জেমস হারভেস্টের একটি গানের লাইন হলো : ‘দ্য হাইয়ার ইউ ফ্লাই, দ্য হার্ডার ইউ ফল’- তুমি যত বেশি ওপরে উড়বে, পতনে তুমি তত বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী, যিনি এখন সর্বত্র ‘ভারতে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা’ অভিধায় বর্ণিত, তিনি ভেবেছিলেন, উড়তে উড়তে তিনি স্বর্গের উচ্চতায় ধরাছোঁয়ার ঊর্ধ্বে উঠে গেছেন, কেউ আর তাকে স্পর্শ করতে পারবে না। কিন্তু তিনি তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে বছরের পর বছর ধরে তাদের ওপর সীমাহীন অত্যাচার-নিপীড়ন চালিয়ে, হত্যা ও গুম করে, অসংখ্য মানুষকে মিথ্যা মামলায় আটকে রেখে, অনেককে বিনা বিচারে বহু বছর পর্যন্ত অন্ধকুঠরিতে আটকে রেখে ‘অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী’ না হওয়ার শপথ লঙ্ঘন করে পাপ করেছেন। সেই অপরাধ ও পাপের ঘড়া কানায় কানায় পূর্ণ হয়েছিল। তাই তার লজ্জাজনক পতন ঘটেছে এবং প্রাণরক্ষা করতে দেশ থেকে দ্রুত পালাতে হয়েছে। শেখ হাসিনার পতনের বেগ এত প্রচণ্ড ছিল যে তিনি গতির মতোই প্রচণ্ডভাবে আছড়ে পড়েছেন। সেই পতনের আঘাত তার ক্ষমতা ও শক্তিকে নিঃশেষ করে ফেলেছে। তার সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শক্তি নেই। কার্যত তিনি রাজনৈতিক মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি নিজের, তার পিতা ও পরিবারের একটি ‘মিথ’ বা কল্পকাহিনি তৈরি করেছিলেন। যে নীতি ও মূল্যবোধ তিনি নিজেও ধারণ ও বিশ্বাস করতেন না, তিনি সেসব কথা বলেছেন এবং তার শাসনকালজুড়ে গণহত্যার নেতৃত্ব দিয়ে তিনি তার রাজনৈতিক মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
রাজনীতিতে ব্যক্তিপূজার ব্যাধি সব সময় সবচেয়ে বিপজ্জনক ছিল। সেই বিপদের কথা বাঙালি কখনো ভাবেনি বলেই ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালে ভারতীয় উপমহাদেশের এই অংশ স্বাধীন হয়েও ক্ষমতা নিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের কামড়াকামড়ির কারণে দেশকে কাঙ্ক্ষিত সমৃদ্ধির পথে নিতে পারেনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও যে তা সম্ভব হয়নি, এর কারণ একটাই, বাঙালি রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করার জন্য ব্যক্তিকে দেবতার পর্যায়ে উন্নীত করেছিল। এমন ব্যক্তিকে পৌরাণিক, এমনকি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ডেমিগড’, যিনি এমন এক ব্যক্তি, যার প্রতিভা ও ক্ষমতা এত বেশি যে, তিনি ঈশ্বর হওয়ার তুল্য। কোনো রাজনৈতিক নেতা যখন ‘আমিত্ব’কে প্রতিষ্ঠা করতে চান, তখন তিনি তার অনুগতদের কাজে লাগান তার আমিত্বে দীক্ষিত অনুসারীদের মগজ ধোলাই করতে। তাদের শেখানো হয় কঠোর আনুগত্য। আনুগত্যহীনতার পরিণতির কথা বলে তাদের মধ্যে একধরনের অপরাধবোধ জাগিয়ে রাখা হয়।
ব্যক্তিপূজার অন্ধত্বের শিকার ছিল বা এখনো আছে আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের লোক। তাদের নেতাকে ঘিরে যে আবহ গড়ে তোলা হয়েছে, তার প্রতি অনুগত থাকা, তার কথা ধর্মীয় বাণীর মতো মান্য করার মনস্তাত্ত্বিক বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করার ওপরই নির্ভরশীল ছিল শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার সাফল্য। এর অনুসারীরা কার্যত হয়ে পড়েছিল ‘স্বেচ্ছা দাসে’। মৃত মুজিব ও জীবিত হাসিনার বন্দনা গাওয়া ছাড়া তাদের আর কিছু করার ছিল না। তারা তাদের নিজেদের পরিচয় হারিয়ে ফেলেছিল এবং লাভ করেছিল নতুন পরিচয়। এই পরিচয়ের বাইরে যেতে পারত না তারা। কেউ এর বাইরে যেতে চেষ্টা করলে তাদের জীবন নরকতুল্য হয়ে উঠত, এমনকি জীবন হারানোর পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো। বাংলাদেশে আমরা এমন পরিস্থিতি দেখেছি ১৯৭৪ সালের এপ্রিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের সামনে ছাত্রলীগের সাত নেতাকে হত্যার ঘটনায়। ওই সময় যেহেতু আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কোনো প্রতিপক্ষ ছিল না, অতএব অন্য দলের কেউ তাদের হত্যা করেছে, এমন অভিযোগ ওঠেনি। তারা নিজেরাই নিজেদের হত্যা করেছিল।
শেখ মুজিব নিজেকে ‘বাংলাদেশ’ নামের রাষ্ট্রটির প্রতিরূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। তিনি ‘জাতির পিতা’ অভিধায় সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি পদ ও পদবিহীন ‘মহাত্মা গান্ধী’ হতে চাননি। তিনি বাংলাদেশের আমৃত্যু রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার সব বন্দোবস্ত করে ফেলেছিলেন। তোষামোদকারীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকতে ও তাদের দ্বারা গুণগানে আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে পছন্দ করতেন। ১৯৭৫ সালের আগস্টে দৈবক্রমে তার জীবন সংক্ষিপ্ত না হলে, মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তার প্রিয় স্লোগান- ‘এক নেতা, এক দেশ, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ’ যে রাষ্ট্রীয় স্লোগানে পরিণত হতো, তাতে সন্দেহ নেই। শেখ মুজিবের জীবদ্দশায় তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তই ছিল রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত। তার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করার সাহস দলের কোনো নেতার ছিল না বলে সব রাজনৈতিক দলের বিলুপ্তি ঘটিয়ে একদলীয় ‘বাকশাল’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। চারটি দৈনিক সংবাদপত্রকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে অন্য সব সংবাদপত্রের প্রকাশনা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।
এ ব্যাধি যে শুধু শেখ মুজিবের একার ছিল, তা নয়। বিশ্বের আরও অনেক নেতা এই সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, যিনি এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য ছিলেন, ক্ষমতার দাপট ও মোহ তার মাঝেও ব্যক্তিপূজার জীবাণু ছড়িয়েছিল। তাকে ‘মা দুর্গার প্রতিরূপ’ বলে প্রচার করত তার দলের তোষামোদকারীরা। ১৯৭৪ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ৮৩তম সভাপতি দেবকান্ত বড়ুয়া ঘোষণা করেন ‘ভারত হলো ইন্দিরা এবং ইন্দিরাই ভারত।’ ইন্দিরা যদি মৃত্যুবরণ করেন তাহলে কে বাঁচবে? ইন্দিরা গান্ধী সম্পর্কে বড়ুয়ার এ মন্তব্য দিয়ে তোষামোদীর মাত্রা সম্পর্কে ধারণা করা যায়।
একনায়কসুলভ চেতনার ধারক রাজনীতিবিদরা ব্যক্তিপূজাকে ক্ষমতার মূলমন্ত্র বলে ভাবেন। শেখ মুজিবও তা ভেবেছেন, তার কন্যা শেখ হাসিনা আরও বেশি ভেবেছেন। ব্যক্তিপূজা যদি ক্ষমতার শীর্ষ আসনে আসীন কোনো রাজনীতিবিদের প্রাণসঞ্জীবনীতে পরিণত হয়, তাহলে তিনি এর অসারতা সম্পর্কে ধারণা করতে পারেন না। শেখ হাসিনাও পারেননি। তোষামোদকারীরা তার পিতার ক্ষেত্রে উদ্ভাবন করেছিল ‘এক নেতা এক দেশ ...’, তারাই শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে উদ্ভাবন করেছিল, ‘শেখ হাসিনার সরকার, বারবার দরকার।’ ক্ষমতায় থাকলে কেউ মহাভারতের ভবিষ্যদ্বাণী ‘তোমাকে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে’, স্মরণ রাখে না। শেখ হাসিনাও তা স্মরণ রাখেননি। তার অপশাসনে অতিষ্ঠ জনগণের ক্ষোভের আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ যেকোনো সময় ঘটতে পারে, তাকে ঘিরে রাখা তোষামোদকারী এবং পাইক-বরকন্দাজ, এমনকি তার পোষ্য গোয়েন্দারা তাকে সে আভাস দিতে পারেনি। তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল তার ক্ষমতার মন্দির। তার দেড় দশকের রাজনৈতিক আধিপত্য যে শুধু পুরোনো দিনের রাজা-মহারাজা ও নবাবদের মতো একদল সুবিধাভোগী দরবারীর সৃষ্টি করেছিল, তা তিনি উপলব্ধি করতে পারেন, যখন রাজা লক্ষ্মণ সেনের মতো অসহায় অবস্থায় তাকে প্রাণভয়ে পালিয়ে যেতে হয়। দুনিয়াজুড়ে দেশে দেশে প্রতিটি স্বৈরশাসকের একই পরিণতি ঘটেছে এবং ঘটছে। এর সর্বশেষ দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের শেখ হাসিনা এবং সিরিয়ার স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদ।
ইংরেজি-ভাষী বিশ্বে, ‘কাল্ট’ শব্দটিকে নিন্দনীয় বিবেচনা করা হয়। শব্দটি উদ্ভব ল্যাটিন শব্দ cultus থেকে, যার অর্থ প্রার্থনা বা বন্দনা। রাজনৈতিক ব্যক্তিপূজা এবং আধ্যাত্মিক ব্যক্তিপূজার মধ্যে পার্থক্য হলো, আধ্যাত্মিক নেতা তার অনুসারীদের পরিচালিত করেন সংশ্লিষ্ট নেতার ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী তার ঈশ্বরের নামে। কিন্তু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নিজেকে ভাববাদী করে তোলেন সবকিছুর কৃতিত্ব নিজের দাবি করে। যে রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে তার ভূমিকা রাখার কথা, সে ব্যবস্থাকে নিজের মর্জির অধীনস্থ করে ফেলেন, যা করেছিলেন বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতার দাবিদার শেখ মুজিব। তিনি তার প্রতি জনগণের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আস্থাকে কাজে লাগিয়ে জনগণের ওপর তার যথেচ্ছচার প্রয়োগ করে নিজের, জনগণের ও দেশের সর্বনাশ ডেকে এনেছিলেন। ব্যক্তি যদি সব ক্ষমতার উৎস হয়ে ওঠেন, যেমন ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই, জার্মানির চ্যান্সেলর এডলফ হিটলার হয়েছিলেন- তারা বিশ্বের আর কোনো শক্তিকে তাদের মোকাবিলায় মনে করতেন ক্ষমতাহীন চুনোপুঁটি। ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই ১৬৪৩ সাল থেকে ৭২ বছরের বেশি সময় পর্যন্ত তার দেশ শাসন করেছেন নিরঙ্কুশভাবে। ক্ষমতার দাপট তাকে ভাবতে শিখিয়েছিল যে তিনিই রাষ্ট্রের সমার্থক এবং তিনি বলতে অভ্যস্ত ছিলেন, ‘আমিই রাষ্ট্র’। তিনি আরও বলতেন, ‘যে ব্যক্তি নিজেকে জয় করতে পারেন, তার সামনে অন্য কিছুই টিকে থাকতে পারে না।’ কিন্তু তিনি যে জীবনভর নিজেকে রাষ্ট্র বলে দাবি করেছেন শেষ পর্যন্ত তার সেই ভ্রম কেটেছিল। তবে তার এই উপলব্ধি ঘটেছিল অনেক বিলম্বে, তার অন্তিম শয়ানে। শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগে তিনি বলেন, ‘আমি চলে যাচ্ছি, কিন্তু রাষ্ট্র সব সময় টিকে থাকবে।’
কিন্তু বাংলাদেশের জন্য দুর্ভাগ্যজনক যে, বারবার নিজেদের ভুলের চরম খেসারত দিয়েও আওয়ামী লীগের কোনো পর্যায়ের নেতার সে উপলব্ধি ঘটে না। তারা বাংলাদেশকে মনে করেন তাদের জমিদারি এবং জনগণকে ভাবেন তাদের প্রজা। তারা শেখ মুজিবকে দেবতুল্য বিবেচনা করেন, তার আরাধনা করেন এবং অন্যদের বাধ্য করতে চান তাদের অনুকরণে শেখ মুজিবের, মুজিবকন্যার ও এমনকি তার পুত্রের আরাধনা করতে। দেশজুড়ে শেখ মুজিবের হাজার হাজার মূর্তি স্থাপন করে তাকে জাতিধর্মনির্বিশেষে সবার আরাধ্য করে তুলতে চেয়েছিলেন তারা। ব্যাপক জনগোষ্ঠীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে দেশে দেশে যেখানেই কোনো বিশেষ জীবিত বা মৃত ব্যক্তিকে পূজা করার জন্য বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে, সেখানেই জনরোষে মূর্তি ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। সাম্প্রতিক ইতিহাসে জার্মানিতে হিটলার, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে লেনিন ও স্টালিন, চীনে মাও জে দং, রোমানিয়ার নিকোলাই চশেস্কু এবং ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের হাজার হাজার মূর্তি উৎপাটিত ও ধ্বংস করা হয়েছে। এসব দৃষ্টান্ত সামনে থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের ব্যয়ে বাংলাদেশের আনাচকানাচে শেখ মুজিবের ছোটবড় শত শত মূর্তি ও ম্যুরাল স্থাপন করা কতটুকু সংগত হয়েছিল, ব্যক্তিপূজায় অন্ধ আওয়ামী পুরোহিতরা বিবেচনায় নেননি। কারণ তারা জনগণ বা জনমতের থোড়াই তোয়াক্কা করেন।
জার্মান একনায়ক হিটলার জনপ্রিয় ও জনগণের ভোটে নির্বাচিত শাসক ছিলেন। তিনি জার্মানি এবং তার অধিকৃত ভূখণ্ডের যত্রতত্র তার বিশাল বিশাল ছবি টাঙানো দেখতে ও তার মূর্তি স্থাপনে উৎসাহী ছিলেন। এসব প্রতীকও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, কারণ এগুলো ব্যাপকভাবে নাৎসি প্রচারের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। হিটলারের জন্য নাৎসিরা তাদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিল : ‘এক জনগোষ্ঠী, এক দেশ, এক নেতা’ (ein Volk, ein Reich, ein Führer)। নাৎসি প্রচারণা তাদের নেতাকে (ফুয়েরার) জার্মান জাতি ও জনগণের জীবন্ত প্রতীক হিসেবে চিত্রিত করেছিল, যা হিটলারের নাৎসি ধর্মকে আরও শক্তিশালী করেছিল। নাৎসি পার্টির দাবি হিটলারকে জার্মানির একক ত্রাণকর্তা এবং জার্মান জনগণের পিতা বানিয়েছিল।
শেখ মুজিবকে ব্যক্তিপূজার উপকরণে পরিণত করার সূচনা ঘটেছিল তার আকর্ষণীয় ক্ষমতা ও সহজাত দক্ষতার কারণে, যিনি তার কথার জাদুতে মানুষকে তার দিকে টানতে পারতেন। তিনি মানুষের মাঝে উন্মাদনা সৃষ্টি করে তাদের দিয়ে যা খুশি তাই করাতে পারতেন। রাজনৈতিক নেতা হয়েও তিনি নিজেকে অনেকটা আধ্যাত্মিক গুরুর মতো আবেদন সৃষ্টিকারী নেতায় পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পরিণাম শুভ হয়নি, বরং তার জন্য ও দেশের জন্য ধ্বংসাত্মক প্রমাণিত হয়েছে। তার ওপর বিশ্বাস স্থাপনকারী জনগণ প্রতারিত হয়েছে। রাজনৈতিক বক্তা হিসেবে তিনি জনগণকে ক্ষেপিয়ে তুলতে বা উদ্বুদ্ধ করতে যতটা সক্ষম ছিলেন, যখন শাসক হিসেবে তার ওপর রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে জনগণকে শাসন করার প্রকৃত দায়িত্ব অর্পিত হলো, তখন তিনি দায়িত্বের ওজন সামলাতে না পেরে নিজের অযোগ্যতা প্রমাণ করেন। তার ব্যর্থতায় জনগণ চরম আশাহত হয়। শেখ মুজিব তার ব্যর্থতা স্বীকার করার মতো ব্যক্তি ছিলেন না। তা ছাড়া তখনো তার তোষামোদ ও সুবিধাভোগীরা ‘এক নেতা এক দেশ, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ’ ধরনের স্লোগানে তাকে বুঁদ করে রেখেছিল। অতএব নিজের অযোগ্যতাকে আড়াল করতে শেখ মুজিব কঠোর হয়ে ওঠেন। কোনো ধরনের সমালোচনা ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে তিনি রক্ষীবাহিনী গঠন করেন। দেশকে গণতন্ত্রশূন্য, এমনকি রাজনীতিশূন্য করতে তিনি ‘বাকশাল’ কায়েম করেন।
তার কন্যা পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের নামে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে তার এখতিয়ারের অধীন করেছিলেন। নির্বাচনব্যবস্থা ভেঙে দিয়েছিলেন। ২০১৪ থেকে তাকে আর নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী বলা যায় না। তিনি গায়ের জোরে, তার বিভিন্ন বাহিনীর শক্তির ওপর ভর করে ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে দুই সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান ও জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলের চেয়ে শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনে জনগণ হাজার গুণ বেশি অত্যাচারিত হয়েছে এবং দুর্নীতি অনেক বেশি ডালপালা ছড়িয়েছে। ছাত্র-জনতার বিপ্লব হাসিনার ক্ষমতার মসনদকে খান খান না করে দিলে জাতিকে আরও দুর্ভাগ্য পোহাতে হতো।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, অনুবাদক, নিউইয়র্ক