বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, বাংলাদেশের শত্রুরা গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্জন নস্যাৎ করতে গভীর চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। এখনো ফ্যাসিস্টদের দোসররা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। ইস্পাতকঠিন ঐক্যের মাধ্যমে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এ ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত ব্যর্থ করে দিতে হবে। তিনি বলেন, আসুন, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করি। ঐক্য আরও বেগবান করি। এ সময় তিনি সংকীর্ণতা ভুলে দেশ ও জাতির স্বার্থে কাজ করার আহ্বান জানান।
গতকাল দুপুরে লন্ডন থেকে দলের বর্ধিত সভার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপিপ্রধান এ আহ্বান জানান। তাঁর এ বক্তব্য আগে থেকেই ধারণ করা ছিল। সেটি সভায় প্রচার করা হয়। খালেদা জিয়া বর্তমানে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে আছেন। বেলা ১১টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হল প্রাঙ্গণে শুরু হয় বিএনপির বর্ধিত সভা। এতে সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। খালেদা জিয়া বলেন, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য আমাদের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। দলকে আন্দোলন, সংগ্রাম ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নেতৃত্ব প্রদানে আরও ঐক্যবদ্ধ এবং সুসংহতভাবে গড়ে তুলতে হবে। নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে দলীয় চেয়ারপারসন বলেন, জনগণের প্রত্যাশা রাষ্ট্র মেরামতের ন্যূনতম সংস্কার দ্রুত সম্পন্ন করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার জন্য সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। আগামী নির্বাচনে সাফল্যের জন্য বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, আমার অবর্তমানে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, সিনিয়র নেতৃবৃন্দ আপনাদের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে নিরন্তর কাজ করে দলকে সুসংগত করেছেন। আমি আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমি বিশ্বাস করি- আপনারা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে আগামী নির্বাচনে সাফল্যের জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন। এমন কাজ করবেন না, যাতে আপনাদের এত দিনের সংগ্রাম বিফলে যায়। আমাদের শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সেই উক্তি মনে রাখতে হবে- ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়।’
সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসুন, আমরা আগামী দিনগুলোতে শহীদ জিয়াউর রহমানের স্বপ্নের আধুনিক, সমৃদ্ধি ও গণতান্ত্রিক দেশ বিনির্মাণের জন্য আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করি। এত ত্যাগের বিনিময়ে প্রাপ্ত এ অর্জনকে সুসংহত এবং ঐক্যকে আরও বেগবান করি। আমি যুক্তরাজ্য থেকে অসুস্থ অবস্থায় আপনাদের আহ্বান জানাতে চাই- আসুন, জনগণকে সম্পৃক্ত করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে পূর্বের ন্যায় আন্দোলন-সংগ্রাম ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নেতৃত্ব প্রদানে আরও ঐক্যবদ্ধ এবং সুসংহতভাবে গড়ে তুলি। বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, প্রতিহিংসা প্রতিশোধ নয়, পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের মাধ্যমে আমরা সবাই মিলে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে একটি বাসযোগ্য, উন্নত ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করব।
এর আগে জুলাই গণ অভ্যুত্থানে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে খালেদা জিয়া তাঁর বক্তব্য শুরু করেন। তিনি বলেন, আজ দীর্ঘ ছয় বছর পর আপনারা আবার একসঙ্গে ফ্যাসিস্টমুক্ত বাংলাদেশে একত্রিত হতে পেরেছেন। সেজন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামে যারা শহীদ হয়েছেন এবং সম্প্রতি জুলাই-আগস্টের ফ্যাসিবাদী শাসকদের ভয়াবহ দমননীতির কারণে গণহত্যায় যারা শহীদ হয়েছেন তাঁদের সবার প্রতি আমি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। যারা আহত হয়েছেন তাঁদের প্রতি জানাচ্ছি আন্তরিক সমবেদনা। আমি চিকিৎসার কারণে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করলেও সব সময় আপনাদের পাশেই আছি।
দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, দেশ আজ এক সংকটময় সময় অতিক্রম করছে। আপনাদের ও ছাত্রদের সমন্বিত আন্দোলনের ফলে ফ্যাসিস্ট শাসকরা বিদায় নিয়েছে। একটা অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে। তাদের কাছে জনগণের প্রত্যাশা, রাষ্ট্র মেরামতের ন্যূনতম সংস্কার দ্রুত সম্পন্ন করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার জন্য সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। এ সময় জনগণকে সম্পৃক্ত করে ‘ঐক্যবদ্ধ বিএনপি’ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ বিশেষ করে- তরুণ সমাজ আজ এক ইতিবাচক গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংকীর্ণতা ভুলে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের কাজ করতে হবে। বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণে পরামর্শ রেখে খালেদা জিয়া বলেন, ইস্পাতকঠিন ঐক্যের মাধ্যমে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ওদের চক্রান্তকে ব্যর্থ করে দিতে হবে। তাই আসুন- আমরা আগামী দিনগুলোতে শহীদ জিয়াউর রহমানের স্বপ্নের আধুনিক সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করি।
লন্ডনে নিজের ছেলে তারেক রহমানের বাসায় লন্ডন ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন আছেন খালেদা জিয়া। গত ৭ জানুয়ারি তাঁকে কুয়েতের আমিরের পাঠানো বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে লন্ডন নিয়ে লন্ডন ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। সেখানে কিছুদিন চিকিৎসার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তারেক রহমানের বাসায় চিকিৎসা নেওয়ার জন্য ছাড়পত্র দেয়। ২০১৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর লা মেরিডিয়ান হোটেলে বিএনপির সর্বশেষ বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে খালেদা জিয়া সভাপতিত্ব করেছিলেন। সারা দেশের তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের ৩৫ হাজার নেতা এ বর্ধিত সভায় অংশ নেন। খালেদা জিয়া ভার্চুয়ালি বক্তব্য প্রদানের সময় তাঁর পাশে বসেছিলেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। চেয়ারপারসনের বক্তব্যকালে তৃণমূলসহ সিনিয়র নেতাদের পিনপতন নীরবতার সঙ্গে তাঁদের নেত্রীর বক্তব্য শুনতে দেখা যায়।