সম্ভ্রম শব্দটির অর্থ মর্যাদা, সম্মান, মান, গৌরব, শ্লাঘা ইত্যাদি। ‘পদুমাবত’ বা ‘পদ্মাবতী’ সিনেমায় মুসলমান শাসক আলাউদ্দিন খিলজির অত্যাচার বা ধর্ষণের হাত থেকে রক্ষা পেতে রানি পদ্মাবতীর নির্দেশে নারীকুল সম্ভ্রম রক্ষার্থে আত্মাহুতি দেয়। এ সম্ভ্রম হচ্ছে আত্মমর্যাদা। যুদ্ধে পরাজিত পক্ষের নারীদের বিজয়ী পক্ষ গনিমতের মাল হিসেবে বিবেচনা করত বা এখনো করে। সে ক্ষেত্রে তখনকার দিনের নারীরা নিপীড়ন অপেক্ষা আত্মবলিদানকেই শ্রেয় বিবেচনা করেছেন। ইতিহাসে তাঁরা মহিমান্বিত হয়ে আছেন। যদি ওই নারীকুলের পদ্মাবতীর মতো ক্ষমতাবান ও সম্পদশালী দিকনির্দেশক না থাকতেন তাহলে বিজয়ী পক্ষ কর্তৃক ধর্ষণের শিকার নারীদের বলা হতো তাঁরা সম্ভ্রম হারিয়েছেন। যেমন আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে বলা হয় পাকিস্তানি হানাদার ও রাজাকার কর্তৃক নির্যাতিত দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম বা ইজ্জতের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতা।
শরীর বা যৌনতা দিয়ে নারীকে বিচার করা হয়। নারীর যৌনতা রক্ষাই তাদের মর্যাদা রক্ষা বা চরিত্র রক্ষা, তা সে বিবাহবহির্ভূত স্বেচ্ছাসম্মতিতেই হোক বা বিবাহিত-অবিবাহিতকে জোরপূর্বক হোক। এ নারীকে নখ-দন্ত-পুরুষাঙ্গ-পেশি ব্যবহার করে যারা অত্যাচার করে বা অত্যাচারের পর হত্যা করে, তারা ইজ্জত হারায় না, তাদের লজ্জা লাগে না, লজ্জিত হন অত্যাচারিতরা। তখন তাঁরা দেশ থেকে পালান, এলাকা থেকে পালান, আত্মহত্যা করেন বা সামাজিকভাবে পরিত্যক্ত হন। অথবা ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষণের শিকার নারীর বিয়ে দিয়ে ধর্ষকের প্রতি মধুর প্রতিশোধ গ্রহণ করা হয়। ধর্ষকদের বেশির ভাগই ক্ষমতাশালী হয়। ক্ষমতাসীন জনপ্রতিনিধিদের ছত্রছায়ায় তারা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। যেন ধর্ষণ তাদের পৌরুষেরই পরিচয় বহন করে। সে যে নপুংসক নয় তার প্রমাণ দিয়েছে। ওদিকে তথাকথিত ‘ইজ্জত হারানো’ মেয়েদের কেউ বিচারের জন্য তৎপর হলে তাঁকে জীবননাশের ভয় দেখানো হয় বা পরিবারের অন্য মেয়েটিও অচিরেই তাদের পৌরুষত্বের প্রমাণ পাবে বলে হুমকি দেওয়া হয়। অনেকে ইদানীং সম্ভ্রমহানি শব্দের সহনীয় বিকল্প হিসেবে শ্লীলতাহানি ব্যবহার করছেন। শ্লীল শব্দের অর্থ শোভন, ভদ্র, নম্র, মার্জিত, শালীন ইত্যাদি। তাহলে শ্লীলতাহানির অর্থ কী দাঁড়ায়? না, যার শালীনতা হরণ করা হয়েছে। শালীনতা বা ভদ্রতা তো বিমূর্ত বিষয়। সেটার হানি হয় কীভাবে? সম্ভ্রমহানি, ইজ্জতহানি, শ্লীলতাহানির ঘানি না টেনে এক কথায় ‘যৌন নিপীড়ন’ বললে কি ভাশুরের নাম নেওয়া হয়?
এখনো ছোটবড় জনসভায় কী রাজনৈতিক, কী প্রশাসনিক, কী আমজনতা মুক্তিযুদ্ধের ওপর বক্তৃতা করতে গিয়ে ‘দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জত’ নিয়ে মাঠ গরম করেন। নারীবাদী অ্যাকটিভিস্টরা দীর্ঘদিন ধরে এ অসম্মানজনক শব্দগুচ্ছ পরিহারের জন্য আবেদন জানিয়ে আসছেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা? টিভিতে নারীবিষয়ক অনুষ্ঠান চলতে থাকলে বাড়ির পুরুষ সদস্যরা আস্তে করে কেটে পড়েন। হয় সত্যি কথা শুনতে ভালো লাগে না, নয় ‘এরা আজকাল অতিরিক্ত বকছেন’ বলে গজগজ করতে থাকেন। পত্রপত্রিকা বা সামাজিক মাধ্যমে নারীবিষয়ক কোনো লেখা দেখলে দ্রুত পাতা ওল্টান। তাহলে নারীর প্রতি ব্যবহৃত অসম্মানজনক শব্দগুচ্ছ পরিহার করতে শিখবেন কীভাবে?
পত্রিকায় ধর্ষণের সংবাদে নির্যাতকের ছবি থাকে না, থাকে এলোচুলের দুই হাতে মুখ ঢাকা নারীর প্রতিকৃতি। মানসিকতায় আজন্ম সুরক্ষিত ধর্ষণপীড়িত নারীর যে ছবি আঁকা, তাকে ‘সম্ভ্রমহানি’ ছাড়া অন্য কোনো প্রতিকৃতিতে সাজানোর কথা কল্পনায়ও আসে না। বলা বাহুল্য, অধিকাংশ পত্রপত্রিকা পুরুষের নেতৃত্বে পরিচালিত। প্রতিবেদনে তারা নির্যাতিত নারীর ওপর নৃশংসতার ভয়াবহতা বর্ণনা করে কিন্তু অলংকরণে লজ্জিত মুখ ঢাকা নারীর প্রতিকৃতি তুলে ধরে। ছেলেশিশু বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের ওপরও ধর্ষণ চলে। সেসব সংবাদে মুখ ঢাকা কারও প্রতিকৃতি জুড়ে দিতে দেখা যায় না। সবচেয়ে ভালো হয় পত্রিকাগুলো যদি কোনো কারণে ধর্ষকের ছবি না ছাপতে পারে তাহলে যেন দুই হাতে মুখ ঢাকা ‘এসব জানোয়ারকে হত্যা করতে হবে’ প্রকৃতির ছবি বা প্রতিকৃতি প্রকাশ করে।
নারীবান্ধব পত্রিকাগুলোর দায়িত্ব অন্তত স্বাধীনতা ও বিজয়ের মাসে রাজনৈতিক পাঠকদের একটু সচেতন করা, তারা যেন গ্রামগঞ্জে-নগরে বক্তৃতায় ‘দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম/ইজ্জতের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতা’ শব্দগুচ্ছ আর ব্যবহার না করে। অনেক পত্রিকাওয়ালা একই সঙ্গে বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোরও মালিক। ‘ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর’, ‘দুটি সন্তানই যথেষ্ট’, ‘জরুরি সেবার জন্য ৯৯৯ কল করুন’ ইত্যাদির মতো পত্রিকার পাতায় বা টিভি বিজ্ঞাপনের আগে-পরে ‘ধর্ষণে নির্যাতিতের সম্ভ্রমহানি হয় না, হয় ধর্ষকের’ প্রচার করা কর্তব্য। তাহলে নির্যাতিতদের লজ্জার পরিবর্তে বুকে বল আসবে, আত্মহত্যার ইচ্ছা জাগবে না, সামাজিকভাবে হেনস্তা হতে হবে না, বিচারের নামে বারবার মৌখিক ধর্ষণের শিকার হওয়া লাগবে না। উপরন্তু ধর্ষককেই সম্ভ্রম বাঁচাতে বাস্তবে মুখ ঢেকে চলার প্রেরণা জোগাবে। রাজনৈতিক বক্তৃতায় অসংস্কৃতিবানরা রাতারাতি না হলেও ক্রমেই সভ্য হয়ে উঠবেন। অপরদিকে মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত দুই লাখ নারীর (মৃত ও জীবিত) আত্মা স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর সত্যিকারের সম্মান ফিরে পাবে।
লেখক : সাহিত্যিক