কত হাসি আর কত কান্না দেখেছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা? গত প্রায় দুই দশকে রোমাঞ্চকর জয়ের সুখস্মৃতি যেমন আছে, তেমনি আছে বেদনাবিধুর পরাজয়ের দুঃসহ যন্ত্রণা। সেসবের বেশির ভাগেরই অংশীজন ছিলেন ‘পঞ্চপা-ব’। বাংলাদেশের ক্রিকেটে একে একে তাঁরা অতীত হয়েছেন। মাশরাফি বহু আগেই বিদায় জানিয়েছেন। তামিম ইকবাল ব্যাট-প্যাড তুলেছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। সাকিবও দৃশ্যপটে নেই। বাকি ছিলেন কেবল মুশফিক-মাহমুদুল্লাহ। এবার রঙিন পোশাকটা খুলে ফেললেন মুশফিক। আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলা ম্যাচটাই ছিল রঙিন পোশাকে তাঁর শেষ ম্যাচ।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে গত হয়েছেন কত কত ক্রিকেটার। অনেকেই নিজেদের কীর্তিতে উজ্জ্বল হয়ে আছেন। মুশফিকুর রহিম নিঃসন্দেহে সবচেয়ে ব্যতিক্রম হয়েই থাকবেন। মাত্র ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার এ ক্রিকেটার নিজেকে তুলে এনেছেন অনন্য উচ্চতায়। দৃপ্ত শপথে উইকেটে দাঁড়িয়ে গেলে কোনো বাধাই মানতেন না তিনি। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে এশিয়া কাপের ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে কত আঘাত সহ্য করেই না মুশফিক খেলেছিলেন ১৪৪ রানের ইনিংস। সেই ম্যাচে জয়ের উচ্ছ্বাসে ভাসে বাংলাদেশ। এমনই আরও কত ঘটনাই না রয়েছে। ২০১২ সালে ঐতিহাসিক এক ফাইনাল খেলে বাংলাদেশ। এশিয়া কাপের ফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিল টাইগাররা। মাত্র ২ রানে হেরে চোখের জলে মাঠ ভিজিয়ে ছিলেন অধিনায়ক মুশফিক। সেই কান্না দেশের কোটি কোটি ক্রিকেট অনুরাগীর মন ছুঁয়েছিল। কেবল এসব ঘটনাই মুশফিকুর রহিমকে চিরস্মরণীয় করে রাখার কারণ নয়। একজন স্পেশালিস্ট ব্যাটার হিসেবে দলে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। শুরুতেই জাত চিনিয়েছিলেন। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ক্রিকেটবোদ্ধারা দাবি করেছিলেন, ভবিষ্যতের তারকা পেয়েছে বাংলাদেশ। সত্যিই একজন তারকা হয়ে ওঠেন মুশফিকুর রহিম। এমন একজন তারকা, যার বিকল্প এখনো খুঁজে পায়নি বাংলাদেশ।
উইকেটের পেছনে দাঁড়ালে বোলারদের মধ্যে থাকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস। মুশফিকুর রহিম ওয়ানডেতে ২৯৯টি ডিসমিসাল করেছেন। এর মধ্যে ২৪১টি ক্যাচ ও ৫৬টি স্ট্যাম্পিং। উইকেটের পেছনে তাঁর কাজ ঠিক শিল্পীর মতোই। আর একজন ব্যাটার হিসেবে? পরিশ্রমী এবং অধ্যবসায়ী হিসেবে মুশফিকুর রহিমের সুনাম কার জানা নেই! অনুজদের জন্য তিনি এমন এক ‘মানদ-’ স্থাপন করেছেন, যার নিচে নামলে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ লেভেলে খেলাটা বেশ কঠিন হয়ে উঠবে ভবিষ্যতে। দলীয় অনুশীলনের বাইরে ব্যক্তিগতভাবে ঘাম ঝরানোর ধারা আগেও ছিল। তবে মুশফিকই এটাকে রীতিতে পরিণত করেছেন। এখন ব্যক্তিগত অনুশীলনে অনেক ক্রিকেটারেরই দেখা মেলে মিরপুরে। অনেক ইতিহাসের সাক্ষী মুশফিকুর রহিমের বিদায়টা সাদামাটাই হলো। ফেসবুকে এক বার্তায় তিনি বললেন, ‘আজ (বুধবার) আমি ওয়ানডে ফরম্যাট থেকে আমার অবসরের ঘোষণা দিচ্ছি। সবকিছুর জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা। হতে পারে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের অর্জন সীমিত। তবে একটি ব্যাপার নিশ্চিত। যখনই আমি দেশের জন্য মাঠে নেমেছি, নিজের শতভাগের চেয়ে বেশি উজাড় করে দিয়েছি। গত কয়েকটি সপ্তাহ আমার জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। আমি অনুধাবন করেছি, এটাই আমার নিয়তি। আমি আমার পরিবার, বন্ধু ও সমর্থক যাদের জন্য গত ১৯ বছর ধরে খেলেছি, তাদের সবাইকে মন থেকে ধন্যবাদ জানাই।’
মুশফিকুর রহিমের বিদায়টা কিছুটা রঙিন হলো মিরপুর স্টেডিয়ামে তামিমদের কল্যাণে। সেখানে ম্যাচের আগে ‘গার্ড অব অনার’ পেলেন তিনি। রূপগঞ্জের বিপক্ষে জয়ের পর মোহামেডানের সতীর্থদের নিয়ে কেকও কাটলেন মুশফিক।
ফারুক আহমেদ
‘বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ওয়ানডেতে মুশফিকের দেওয়া অসাধারণ সার্ভিসের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে। দুই দশকের বর্ণাঢ্য এক ক্যারিয়ার শেষে ওয়ানডে ক্রিকেটে ইতি টেনেছেন তিনি। মুশফিক বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটে যে অসাধারণ নিবেদন, আবেগ এবং পেশাদারি নিয়ে এসেছেন তা বিসিবি স্বীকার করছে। ব্যাটিং এবং উইকেটকিপিংয়ে তার অবদান দেশের ক্রিকেটের অগ্রগতিতে রেখেছে অপরিসীম ভূমিকা।’
মাশরাফি বিন মর্তুজা
তোমার বিদায়ের ঘোষণায় এক লহমায় অনেক কিছু ভেসে উঠল চোখে। এত বছরের একসঙ্গে পথচলা, মাঠের ভিতরে-বাইরে কতশত স্মৃতি! ওয়ানডেতে তোমার রেকর্ডই তোমার হয়ে সাক্ষ্য দেবে। তোমার পরিশ্রম, প্রতিজ্ঞা আর ত্যাগের গল্প বাংলাদেশের ক্রিকেটে প্রজন্মের পর প্রজন্মে অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।
আশা করি, সাদা পোশাকের বাকি অধ্যায়টুকু রঙিন করে তুলবে। তোমার ব্যাটে অভিজাত সংস্করণে দেশের ক্রিকেট সমৃদ্ধ হবে আরও...
তামিম ইকবাল
মুশফিককে আমি দেখছি অনূর্ধ্ব-১৫ থেকে। তাকে বলতে চাই- দোস্ত, আমি তোকে দেখেছি যে কীভাবে তুই একটা নরমাল ব্যাটসম্যান থেকে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা হইছোস। বাংলাদেশের জন্য বছরের পর বছর যা করেছিস মুশফিক, তা দুর্দান্ত। দেশের জন্য যা করেছিস, তা সবাই মনে রাখবে অনেক বছর।
মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ
অনবদ্য ওয়ানডে ক্যারিয়ারের জন্য তোমাকে অভিনন্দন। আমার এখনো মনে আছে, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুবাইয়ে সেঞ্চুরি করতে গিয়ে পাঁজরের হাড় ভেঙেছ। এটা প্রমাণ করে খেলাটার প্রতি তোমার নিবেদন, পরিশ্রম ও ভালোবাসা কতটুকু। সর্বোচ্চ পর্যায়ে পারফর্ম করার যে মানসিকতা তোমার, সেটি যে কোনো ক্রিকেটারকে অনুপ্রেরণা দেবে।
নাজমুল হোসেন
‘আমাদের মতো অসংখ্য মানুষকে প্রেরণা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ মুশফিক ভাই। খেলাটির প্রতি তোমার ডেডিকেশন আমাদের জন্য আদর্শ হয়ে থাকবে এবং আগামীতে যারা আসবে তাদের আগ্রহী করবে। বাংলাদেশের ক্রিকেট কখনোই তোমার অবদান ভুলবে না।’