জসীমউদ্দীন বাংলা কবিতার আধুনিক প্রতিনিধি। পল্লীকবির অভিধার পালক তাঁর মুকুটে যুক্ত হলেও তিনি ক্রমশ দীপ্যমান হয়ে ওঠেন। গ্রাম বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে তিনি মুগ্ধ হন। সরল সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের বর্ণনা তাঁর কবিতাকে মহিমান্বিত করেছে। বাঙালির প্রাণ আবেগ। সেই আবেগকে অবলম্বন করে তিনি অসংখ্য কবিতা রচনা করেছেন। বিরহ যাতনা তাঁর কবিতার প্রাণশক্তি। প্রণয়, বিরহ, পরিণয় সব পর্যায়ে তাঁর সজাগ সতর্ক দৃষ্টিনিবদ্ধ হয়েছে। বিশ শতকের তৃতীয় দশকে জসীমউদ্দীন বাংলা কবিতায় আত্মপ্রকাশ করেন। যখন রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল দোর্দণ্ড প্রতাপে বাংলা সাহিত্যকে শাসন করছেন, এমন সময়ও জসীমউদ্দীন তাঁর কবিতা নিয়ে বাঙালির হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন।
জসীমউদ্দীন রচিত কাব্যগ্রন্থ : রাখালী (১৯২৭), নকশী কাঁথার মাঠ (১৯২৯), বালুচর (১৯৩০), ধানক্ষেত (১৯৩০), সোজন বাদিয়ার ঘাট (১৯৩৩), হাসু (১৯৩৮), রূপবতী (১৯৪৬), মাটির কান্না (১৯৫১), এক পয়সার বাঁশি (১৯৫৬), ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে (১৯৬২), মা যে জননী কান্দে (১৯৬৩), হলুদ বরণী (১৯৬৬), জলে লেখন (১৯৬৯), পদ্মা নদীর দেশে (১৯৬৯), মাগো জ্বালিয়ে রাখিস আলো (১৯৭৬), কাফনের মিছিল (১৯৭৮), মহররম, দুমুখো চাঁদ পাহাড়ি (১৯৭৮), নাটক : পদ্মাপার (১৯৫০), বেদের মেয়ে (১৯৫১), মধুমালা (১৯৫১), পল্লীবধূ (১৯৫৬), গ্রামের (১৯৫৯), ওগো পুষ্প ধনু (১৯৬৮), আসমান সিংহ (১৯৮৩)। আত্মকথা; যাদের দেখেছি (১৯৫১), ঠাকুর বাড়ির আঙ্গিনায় (১৯৬১), জীবন কথা (১৯৬৪), স্মৃতিপট (১৯৬৪), স্মরণের সরণী বাহি (১৯৭৮) উপন্যাস : বোবা কাহিনী ইত্যাদি।
জসীমউদ্দীন যখন কবিতা চর্চায় আত্মনিয়োগ করেন, তখন ত্রিশ দশকের পঞ্চপাণ্ডব কবিদের বিদ্রোহ নতুন মাত্রা সূচনা করে। তুমুল প্রতিযোগিতার মধ্যে তাঁর যাত্রা। জসীমউদ্দীন গ্রামের পথে ঘুরে-ফিরে এক রাখালের মতো বাঁশি বাজিয়ে সবাইকে আকৃষ্ট করলেন। নাগরিক জীবনের হাতছানি, বিপন্নতা, অবসাদ, ক্লান্তি কারও কারও কবিতায় অনুপ্রবেশ করে। জসীমউদ্দীন গ্রাম বাংলার পথ-ঘাট, বৃক্ষ, ফুল, মানুষ ও তার সংগ্রামকে কবিতার বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেন। যে পল্লী সাহিত্য উপেক্ষিত ছিল তাকে তিনি রূপ ও রস প্রদান করেন।
ব্যক্তিজীবনের দুঃখকষ্টের মধ্যে দীনেশ চন্দ্র সেনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হলে তিনি গ্রাম্য গাঁথা সংগ্রাহক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। একদিকে কবিতা লেখার তাগিদ, অন্যদিকে গ্রাম সম্পদ সংগ্রহের জীবন তাঁকে নতুন অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ করে। জীবনযুদ্ধের মধ্যে তিনি ক্রমশ অগ্রসর হয়েছেন। পৌঁছে গেছেন গন্তব্যে।
জসীমউদ্দীনের লেখালেখির শুরু ছেলেবেলা থেকেই। ছাত্রাবস্থায় তিনি রচনা করেন কবর কবিতা :
এইখানে তোর দাদির কবর
ডালিম গাছের তলে
তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি
দুই নয়নের জলে।
এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু
সোনার মতন মুখ,
পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে
কেঁদে ভাসাইতো বুক।
এখানে ওখানে ঘুরিয়া ফিরিতে
ভেবে হইতাম সারা,
সারা বাড়ি ভরি এত সোনা মোর
ছড়াইয়া দিল কারা!
সোনালি ঊষায় সোনামুখ তার
আমার নয়নে ভরি
লাঙল লইয়া ক্ষেতে ছুটিতাম
গাঁয়ের ও-পথ ধরি।
যাইবার কালে ফিরে ফিরে তারে
দেখে লইতাম কত
একথা লইয়া ভাবি-সাব মোরে
তামাশা করিত শত।
কবিতাটি কল্লোল পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। লেখা পাঠানোর ছয় মাস পর কবিতাটি প্রকাশিত হলে পাঠক মহলে বিপুল সাড়া পড়ে যায়। দীনেশ চন্দ্র সেনের সমালোচনা তাঁকে নতুন করে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসে। দীনেশ চন্দ্র সেন এক ভবিষ্যৎ কবির সম্ভাবনাকে চিহ্নিত করেন।
জসীমউদ্দীন রচিত ‘নকশী কাঁথা মাঠ’ অসামান্য বর্ণনায় ঋদ্ধ। ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ কাব্যগ্রন্থে বাংলার মাটি ও মানুষের কাহিনি বিস্তৃত হয়েছে। ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন- ‘তোমার সোজন বাদিয়ার ঘাট অতীব প্রশংসার যোগ্য। এ বই বাংলার পাঠকসমাজে আদৃত হবে সে বিষয়ে আমার লেশমাত্র সন্দেহ নাই।’ জসীমউদ্দীনের কবিতায় উপমা-উৎপ্রেক্ষার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। চেনা জনপদ থেকে তিনি কবিতায় প্রবিষ্ট করেন :
“লাল মোরগের পাখার মত ওড়ে
তাহার শাড়ি
ভোরের হাওয়ায় যায় যেন গো
প্রভাতী মেঘ নাড়ি।”
গ্রামের সাধারণ মানুষ, পরিচিত দৃশ্য, প্রকৃতিস্নাত পঙ্ক্তিমালা পাঠকের অন্তর ছুঁয়ে যায়। তিনি ভাটিয়ালি সংগীত রচনা করেছেন। ইসলামী গান, দেশাত্মবোধক গান তাঁর রচনার অমর সৃষ্টি। জসীমউদ্দীন বাংলা কবিতায় এক নতুন আবহের রূপকার। যেমন কবিতার বিষয়, ছন্দ, শব্দ নির্বাচন তেমন স্বতন্ত্র হৃদয়গ্রাহী স্বাদ ও রুচির কবিতা নির্মাণে তাঁর মতো কৃতী কবি খুব কম দেখা যায়। তাঁর সময়ে একদল কবি নগর যন্ত্রণায় ব্রত হয়ে কাব্যচর্চা করেছেন। সেখানে তিনি গ্রাম্য জীবনকে অবলম্বন করে স্নাত লোকজ ঐতিহ্যের অনুরাগী হয়ে নতুনমাত্রিক কাব্যভাষা রপ্ত করেছেন। ফুল, পাখি, নদী, শস্যের মাঠ আর সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখে লীন জসীমউদ্দীন ধীরে ধীরে আধুনিক কবি হয়ে উঠেছেন। নিসর্গপ্রেমিক তিনি রাখাল আর বালুচরের সৌন্দর্যে মুগ্ধ। তাঁর রচিত সাধারণ মানুষেরা চাঁদ, সূর্য-বালুচরের মতো স্নিগ্ধ ও প্রবহমান। অসংখ্য কবিতায় নাগরিক জীবনে অভ্যস্ত হওয়া মানুষকে পেছনে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। জসীমউদ্দীনের মতো আর কেউ কি বলতে পেরেছেন এমন করে প্রাণের কথা : খেলা মোদের গান গাওয়া ভাই/ খেলা লাঙল চষা/ সারাটি দিন খেলতে জানি/ জানিই নেক বসা (রাখাল ছেলে/রাখালী) উদ্ধৃত করা যেতে পারে :
“১. কাল সে আসিবে,
মুখ খানি তার নতুন চরের মত
চখা আর চখি নরম
ডানায় মুছায়ে দিয়াছে কত।
(কাল সে আসিবে)
২. কেমন যেন গাল
দু’খানি মাঝে রাঙা ঠোঁটটি তাহার
মাঠে ফোটা
কলমি ফুলে কতকটা তার
খেলে বাহার
(রাখালী)
৩. কাঁচা ধানের পাতার
মত কচি মুখের মায়া,
তার সাথে
কে মাখিয়ে দেছে নবীন তৃণের ছায়া
জালি লাউয়ের ডগার মত বাহু
দু’খান সরু
গা খানি
তার শাওন মাসের যেমন তমাল তরু”
(নকশী কাঁথার মাঠ)
জসীমউদ্দীন রাজনীতিতে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। দেশপ্রেম ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তি করে তিনি অনেক কবিতা রচনা করেছেন। তাঁর রাজনৈতিক কবিতা তেমন আলোচিত হয়নি। তাঁর সদর্থক ভূমিকা ও উপনিবেশিক ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কবিতার বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
ভাষা আন্দোলনের শহিদদের উদ্দেশে তিনি উচ্চারণ করেন, ‘ঘুমাও ঘুমাও ভাইরা মোদের ঘুমাও মাটির ঘরে/ তোমাদের কথা লিখিয়াছি মোরা রক্ত আখর গড়ে/ মাতা দিয়ে তার সন্তান বলি/ লিখেছে অমর সেই কথা কলি/ ভাই দিছে/ ভাই বৌ দিছে স্বামী যে রক্ত পথ ধরে।’
হাজার বছর বাংলা কবিতার ভাণ্ডারে যে ঐতিহ্য ও বিষয় যুক্ত হয়েছিল তার সঙ্গে জসীমউদ্দীন নতুন ধারা সংযুক্ত করেন। বাংলার গ্রামীণ জনপদের আঙিনায় তিনি খুঁজে পেলেন তাঁর শিল্প সুষমা। রুপাই, দুলী, সাজুকে তাঁর কবিতার বিষয় বৈভব করেছেন তিনি। তাঁর মা পল্লী জননী। হিন্দু, মুসলমানদের যৌথ মাঙ্গলিক অভিযাত্রা তাঁর কবিতার মূর্ছনা। রবীন্দ্র, নজরুল, কল্লোল সাহিত্য প্রভাবিত যুগে তাঁর আবির্ভাব হলেও চন্দ্র কিরণের বিভায় আলোকিত করেছেন চারপাশ, তাঁর নিজস্বতা বজায় রেখেছেন সর্বক্ষেত্রে। আজও জসীমউদ্দীন স্বকাল, বাংলার রূপবৈচিত্র্য ও তাঁর ক্যানভাসে বর্ণিত বিষয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে বিরাজমান। বাংলা কবিতায় তাঁর সৃজিত ফসল কবিতা, নাটক, স্মৃতিকথা ও সংগীতে সমৃদ্ধ হয়ে আছে। স্মৃতিতে, স্মরণে জসীমউদ্দীন অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন তাঁর পাঠকের হৃদয়ে।
কবি জসীমউদ্দীন ১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। মৃত্যু ১৯৭৬’র ১৩ মার্চ।