ছোট ভাই আরিফকে নিয়ে রাজধানীর নতুন বাজার থেকে ছোলমাইদ ছাপরা মসজিদ এলাকায় যাচ্ছিলেন মো. নোমানি। হঠাৎ হাত ছেড়ে ছয় বছরের আরিফ দেয় দৌড়। সঙ্গে সঙ্গে নোমানির আর্তচিৎকার, ‘পড়ে যাবি। দৌড়াস না।’ উন্নয়নের নামে রাস্তায় চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। যেন হাঁটার উপযোগীও নেই! এমন বেহাল অবস্থা কেবল নতুন বাজার থেকে ছোলমাইদ পর্যন্ত রাস্তাই নয়, রাজধানীর সর্বত্রই এ চিত্র। অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়িতে দুর্ভোগ বাড়ছে মানুষের। নগরবাসীর ভোগান্তি চরমে।
নতুন বাজার থেকে ছোলমাইদ ছাপরা মসজিদ যাওয়ার পথে যে এভাবে রাস্তা খুঁড়ে রাখা হয়েছে তা জানতেন না নোমানি। তার মতো অনেকেই না জেনে এই রাস্তায় ঢুকেই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। নোমানি বলেন, ‘ছোট ভাইকে নিয়ে খালার বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছি। এ রাস্তা যে উন্নয়নের নামে কেটে রাখা হয়েছে তা জানতাম না। খন্দকারবাড়ি থেকে ছাপরা মসজিদ প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে আসতে হলো।’
সংস্কার কাজের জন্য রাস্তা খোঁড়ার পর খোয়া আর বালুর যে স্তর দেওয়া হয় ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভাষায় একে বলে সাবগ্রেডিং। এরপর কার্পেটিং করা হয়। কিন্তু রাজধানীর বেশির ভাগ সড়কে দেখা যায় সাবগ্রেডিং করার পর কার্পেটিং করার কথা যেন বেমালুম ভুলে যান প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘদিন সাবগ্রেডিং থাকার কারণে একটু বাতাসেই ধুলা উড়ে। খোয়া উঁচুনিচু হয়ে থাকার কারণে হাঁটাচলা কষ্টকর হয়ে পড়ে। আশপাশের দোকান-বাড়িতে ধুলার স্তর পড়ে যায়।
পথচারীর চেয়েও খোঁড়াখুঁড়ির এলাকায় থাকা বাসিন্দাদের ভোগান্তির মাত্রা বেড়ে যায়। অফিসে যাওয়ার পথে পোশাক নোংরা হয়ে যায়। চাইলেও তাদের অন্যপথে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। ১০ মিনিটের রাস্তায় সময় লেগে যায় এক ঘণ্টা। ঢাকা শহরে সেবাদাতা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের কারণে একই রাস্তা বারবার কাটাকাটি করা হয়। আর যত কাটাকাটি-খোঁড়াখুঁড়ি তত বেশি ভোগান্তি।
মিরপুর এলাকার কয়েকটি রাস্তায় ড্রেনেজ সংস্কারের জন্য খুঁড়ে রাখা হয়েছে। এতে সড়ক দিয়ে কোনো পরিবহন যাতায়াত করতে পারছে না। রাজধানীর শেওড়াপাড়া এলাকার শামীম সরণির বাসিন্দারা জানান, গত দুই দিন ধরে অনেক বাসাবাড়িতে পানি নেই। রমজান মাসে পানি না থাকায় চরম ভোগান্তি, অনেকের জীবন হাঁসফাঁস হয়ে উঠেছে। এই এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ওয়াসার পাইপ। এজন্য পাম্প থেকে পানি বন্ধ রেখেছে ওয়াসা। ফলে এই রাস্তার দুই পাশের বাসায় গত দুই দিন ধরে পানি পাওয়া যাচ্ছে না। রান্না, কাপড় ধোয়া, গোসলের জন্য পানি কিনে আনতে হচ্ছে। কতদিনে এ সমস্যার সমাধান হবে তা জানি না।’ মোহাম্মদপুর নূরজাহান রোডেও দীর্ঘদিন ধরে চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। সড়কটিতে পয়ঃনালা নির্মাণের কাজ করছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। একই সঙ্গে কাটাসুর এলাকার শেরেবাংলা রোড, সাদেক খান রোড (নামাবাজার অংশ), জাফরাবাদের শারীরিক শিক্ষা কলেজ সড়ক, জাকির হোসেন রোডের একটি সড়ক, নূরজাহান রোড (মূল রাস্তা), ইকবাল রোডের ছয়টি সড়ক, স্যার সৈয়দ রোডের (আংশিক), তাজমহল রোডের দুটি সড়ক এবং টিক্কাপাড়া এলাকার দুটি সড়কের উন্নয়নকাজ চলছে। এর মধ্যে কোনো সড়কে কাটাকাটি ও খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। কোনো সড়কে কাজ শেষে বালু ও ইটের টুকরা দিয়ে ভরাট করে রাখা হয়েছে। তেজগাঁওয়ের মনিপুরীপাড়া এলাকায় কয়েকটি সড়কে দীর্ঘদিন থেকে চলছে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ। দুই মাসেও কাজ শেষ না হওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন এলাকাবাসী। বিশেষ করে গাড়ি ও রিকশা চলাচল না করায় বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ পড়েছেন বিপাকে। এ রাস্তাটি দ্রুত সংস্কার চান এলাকাবাসী। রাজধানীর পুরান ঢাকার নয়াবাজার এলাকায়ও একই চিত্র দেখা যায়। সড়কটির ওপরে পয়ঃনালা সংস্কার কাজের জন্য রাখা হয়েছে পাইপ। এতে সরু হয়ে গেছে চলাচলের রাস্তা। সড়কটিতে সার্বক্ষণিক যানজট। একই এলাকার কয়েকটি সড়কে ড্রেনেজ সংস্কার কাজ চলমান। দীর্ঘদিন কাজ চলায় বিপাকে পড়েছেন এ সড়ক ব্যবহারকারীরা। সড়কটি দ্রুতই সংস্কার চান এলাকাবাসী।