দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের অন্যতম পুরোধা, সংগীতজ্ঞ, ছায়ানটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি সন্জীদা খাতুন আর নেই। গতকাল বেলা সাড়ে তিনটায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।
তাঁর মৃত্যুর খবরটি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন সন্জীদা খাতুনের পুত্রবধূ ও ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমেদ লিসা। তাঁর মৃত্যুতে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। আজ বুধবার দুপুর ১২টায় ছায়ানট প্রাঙ্গণে তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাবেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষরা। গতকাল রাত ৮টায় এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত দাফনের বিষয়ে কিছুই জানা যায়নি।
১৯৩৩ সালের ৪ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন সন্জীদা খাতুন। তাঁর পিতা ড. কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক ও জাতীয় অধ্যাপক। সন্জীদা খাতুন বাংলাদেশের একজন খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ ও সংগীতজ্ঞ। তিনি প্রয়াত কাজী আনোয়ার হোসেনের বোন এবং রবীন্দ্রসংগীত বিশেষজ্ঞ ওয়াহিদুল হকের স্ত্রী।
সন্জীদা খাতুন ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সম্মানসহ স্নাতক এবং ১৯৫৫ সালে ভারতের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ও শান্তিনিকেতন থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পরে ১৯৭৮ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
সন্জীদা খাতুনের কর্মজীবন শুরু হয় শিক্ষক হিসেবে। শান্তিনিকেতন থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের পর তিনি ইডেন কলেজ, কারমাইকেল কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা শেষে অবসরে যান।
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই তিনি রংপুর থেকে ঢাকায় আসেন। এরপর সাভারের জিরাব গ্রাম থেকে ঢাকা হয়ে কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। তাঁর সঙ্গে কয়েকজন সংস্কৃতিকর্মীও ছিলেন। তাঁরা ভারতের আগরতলা শহরে কিছুদিন অবস্থান করেন। তারপর ১৯৭১ সালের ৫ মে কলকাতায় প্রবেশ করে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে সাংস্কৃতিক কর্মীদের একতাবদ্ধ করা শুরু করেন।
তিনি মোট ১৬টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, রবীন্দ্রসংগীতের ভাবসম্পদ, ধ্বনি থেকে কবিতা অতীত দিনের স্মৃতি, রবীন্দ্রনাথ: বিবিধ সন্ধান, ধ্বনির কথা আবৃত্তির কথা, স্বাধীনতার অভিযাত্রা, সাহিত্য কথা সংস্কৃতি কথা, জননী জন্মভূমি, রবীন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রনাথ, শান্তিনিকেতনের দিনগুলি ও জীবনবৃত্ত।
কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত), দেশিকোত্তম পুরস্কার (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত)। এ ছাড়া কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট ১৯৮৮ সালে তাঁকে ‘রবীন্দ্র তত্ত্বাচার্য’ উপাধি, ২০১৯ সালে ‘নজরুল মানস’ প্রবন্ধ গ্রন্থের জন্য ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করে। ২০২১ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত করে।