মানুষ যে আমল করে আল্লাহপাক দুনিয়া ও আখেরাতে তার বদলা দান করেন। দুনিয়ার জীবনে ভালো কাজ করলে দুনিয়াতেই এর ভালো ফল পাওয়া যায়, যা আমরা অনেক সময় বুঝি অনেক সময় বুঝি না। অনেকের ভালো কাজের ফল তার চাহিদা ও পছন্দের বিপরীত কিছু হয়; তখন শয়তানের এ ওয়াছওয়াছা তার মনের মধ্যে উদিত হতে থাকে যে এত ইবাদত করার পরও কেন আমার ব্যবসায় মন্দা দেখা যাচ্ছে। যারা আমার সাথি তাদের তো কোনো সমস্যা নেই। সব সমস্যা আমার কেন। বস্তুত স্বভাবগতভাবে মানুষ এসব পরিস্থিতিতে মারাত্মক বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়।
একবার আমাকে গুলশানের এক লোক বলল, হুজুর! আপনার ওয়াজ শুনে আমি দীনের প্রতি এত আগ্রহী হই যে বিগত ১০ বছর ধরে আমার কোনো দিন তাহাজ্জুদের নামাজও বাদ যায়নি। কিন্তু হুজুর, আমার ব্যবসাবাণিজ্য দিন দিন অবনতি হতে হতে এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। মাঝেমধ্যে মনে চায় আগের মতো হয়ে যাই। এখন কী করব বলেন হুজুর। আমি চিন্তা করতে লাগলাম, তাকে কী জবাব দেওয়া যায়। সময় পার হয়ে এশার নামাজের জামাত শুরু হলো। লোকটি আমার সঙ্গে জামাতে দাঁড়াল। জামাত শেষ হওয়ার পর সে আমার দুই রাকাত সুন্নতের সময়ের মধ্যে সুন্নত, নফল ও বেতেরের মোট সাত রাকাত নামাজ শেষ করে বসে রইল। নামাজের পর বিশ্রামের রুমে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ফরজ নামাজের পর কত রাকাত নামাজ পড়েছেন? উত্তর দিল, সাত রাকাত। প্রশ্ন করলাম, কী কী সুরা দিয়ে পড়েছেন? উত্তর দিল সুরা-কেরাত তো জানি না, ছোটকালে মা ভাত দিত না নামাজ না পড়লে, পিতা ঘুমাতে দিত না, নামাজ না পড়লে। সুরা-কেরাত জানতাম না বিধায় মা বলতেন প্রত্যেক রাকাতে ‘ইয়া রাব্বি’ তিনবার করে পড়ে নামাজ পড়লেই হবে। আজ পর্যন্ত এভাবেই করে যাচ্ছি।
আগের দিনের মাতা-পিতা আর বর্তমান যুগের মাতা-পিতার পার্থক্য দেখুন। এখানে ভালো লাগল মাতা-পিতার প্রতি তার মান্যতা দেখে। আজকাল কিন্তু এমনটি পাওয়া দুষ্কর। আগের দিনের মাতা-পিতারা এমনই ছিলেন; তারা সন্তানদের নিয়ে নামাজ-বন্দেগি করে একসঙ্গে খেতেন। শৈশব থেকে একটি ছেলেকে যদি দীনি পরিবেশে গড়ে তোলা যায়, তাহলে এর প্রভাব সারা জীবন অবশিষ্ট থাকে। বাতি লাগানো থাকলে সুইচ দিলেই আলো আসে। বাতি যদি অপরিষ্কারও হয়ে যায় তাহলে সামান্য হলেও আলোর মুখ দেখা যাবে। তবে পরিষ্কার করে দিলে আবার আগের ন্যায় দেখা যাবে। কচি বাচ্চাদের মন বাতির ন্যায়। তাদের অন্তরে যখন দীনি পরিবেশের আলো জ্বালিয়ে দেওয়া যাবে, তখন তা দ্বারা নিজে উপকৃত হবে অন্যকেও উপকৃত করতে পারবে। কিছু সমস্যার কারণে যদি মাঝপথে বাতি ময়লাযুক্ত হয় তাহলে আবার পরিষ্কার করে দেওয়ার দ্বারা বাকি জীবনে তা অটুট থাকবে। মানুষ ত্রিশ-চল্লিশ বছর পর্যন্ত লাইনচ্যুত হয়ে থাকে, পঞ্চাশ পার হলে আবার লাইনে এসে যায়। অর্থাৎ বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মাঝে পরিবর্তন আসতে থাকে। এটা মহান আল্লাহপাকেরই দয়া।
যাই হোক বলছিলাম ওই ব্যক্তির নামাজের কথা। একটি উদাহরণ শুনুন। উদাহরণের মাধ্যমে যেকোনো বিষয় পরিষ্কার হয়। এক ফ্যাক্টরির মালিকের কাছে প্রতিদিন ম্যানেজার সাহেব টাকার ব্যাগ পাঠিয়ে দেন। মালিক ব্যাগ খুলে দেখেন সব ঠিকঠাক আছে। এভাবে এক বছর অতিবাহিত হলো। এখন আর তিনি ব্যাগ খুলে যাচাই করে দেখেন না। ম্যানেজারের প্রতি মালিকের বিশ্বাস দৃঢ় হয়ে গেছে। এদিকে ম্যানেজার সাহেব এ বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে এখন টাকার ব্যাগের মধ্যে কাগজ অথবা জাল নোট মিশিয়ে মালিকের কাছে পাঠান। মালিক আবার এক বছর পর কী যেন মনে করে ব্যাগ খুলে দেখলেন যে ওপরে সামান্য কিছু টাকা আর সম্পূর্ণ ব্যাগ নকল নোট দিয়ে ভর্তি। এখন বলুন, মালিক যখন ম্যানেজারের এ কর্ম দেখবে তখন কি তার চাকরি বহাল রাখবে, না সঙ্গে সঙ্গে বহিষ্কার করবে? অবশ্যই চাকরি থেকে বরখাস্ত করবে। কারণ সে দীর্ঘদিন যাবৎ টাকার নামে কাগজ কিংবা নকল টাকা পাঠাচ্ছে। ঠিক এরকমই ওই ব্যক্তি দীর্ঘদিন যাবৎ নামাজের নামে শুধু ওঠাবসা করছেন, অর্থাৎ ইবাদতের নামে নকল ইবাদত করে আসছেন। তিনি মনে করেছিলেন, এভাবে নামাজ পড়বেন আর আল্লাহতায়ালা আসমান থেকে স্বর্ণ-রৌপ্য পাঠিয়ে তাকে ব্যবসায় লাভবান করাবেন। বস্তুত আল্লাহ বড় দয়ালু। তিনি নকল ইবাদত করা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত নেননি।
অন্তরে খুব দুঃখ নিয়ে কথা বলছি। মানুষ দুনিয়ার জীবনে উন্নতির জন্য সবকিছুই শিখতে পারে, অথচ একটু সময় ব্যয় করে দুচারটি সুরা শিক্ষা করার সময় পায় না। আল্লাহপাক আমাদের বোঝার তৌফিক দান করুন।
♦ লেখক : আমির, আল হাইআতুল উলয়া ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ