পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করা হয়েছে ‘হে নবী বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস তবে আমাকে অনুসরণ করো। আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন ও তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত-৩১)। আল্লাহকে ভালোবাসতে হলে অবশ্যই রসুল (সা.)-কে অনুসরণ করতে হবে। এটি আল্লাহর দেওয়া শর্ত।
বুখারি শরিফের ১৪ নম্বর হাদিস, ‘রসুল (সা.) ইরশাদ করেন, যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ, শপথ তার, তোমাদের কারও কাছে যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার বাবা ও সন্তানের চেয়ে বেশি প্রিয় না হই, ততক্ষণ সে মুমিন হতে পারবে না।’ বুখারি শরিফের ১৫ নম্বর হাদিস, রসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার বাবা, তার সন্তান এবং অন্য সব মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় না হই।’ উল্লিখিত হাদিস দুটির ভাষ্য দ্বারা বোঝা যায় রসুল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ইমানের অংশ। মানুষ বাবা-মা আর সন্তান-সন্ততিকে ভালোবাসে স্বভাবজাত কারণে। এ ভালোবাসা অকৃত্রিম। এ ভালোবাসার আকর্ষণ এতটাই তীব্র যে, বাবা-মা নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে গড়তে চান সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য দুনিয়ার আরাম-আয়েশ ত্যাগ করেন অনায়াসে। আবার যারা সুসন্তান, তারা বাবা-মায়ের সেবার জন্য নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করতে একটুও চিন্তা করে না। বাবা-মা যেমনই হোক সন্তানের ভালোবাসা তাদের প্রতি সব সময় অটুট থাকে। তবে মুমিন হতে হলে পিতামাতা, সন্তান-সন্ততির চেয়েও রসুল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা থাকতে হবে। ইমানদাররা রসুল (সা.)-কে ভালোবাসে সবটুকু আন্তরিকতা দিয়ে। তাঁর নাম যখনই কোনো মুমিন বান্দার কানে আসে, সঙ্গে সঙ্গে চরম আবেগ প্রেম-ভালোবাসায় জবান দিয়ে উচ্চারণ করে ‘রসুল (সা.)’। নবীজির নাম যতবার উচ্চারিত হয় ততবার দরুদ পড়তে একটুও ক্লান্তিবোধ করে না মুমিন বান্দারা। আল্লামা শেখ সাদি (রহ.) বলেন, আল্লাহর বিধিবিধান পালন করার পর ‘যে ব্যক্তি দরুদ পড়ার অভ্যাস করে, তার ওপর জাহান্নামের আগুন হারাম হয়ে যায়’। নবীজির সিরাত ও সুরাতের আলোচনা মুমিন বান্দা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করে, উপদেশ হাসিল করে এবং হƒদয়ে তৃপ্তির খোরাক জোগায়। কেউ কেউ মনে করতে পারেন, রসুলকে সবকিছু থেকে বেশি ভালোবাসব ঠিক, তবে নিজের জীবন থেকে বেশি নয়। এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় একটি হাদিস থেকে। রসুল (সা.)-এর প্রিয় সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে হিশাম (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, একদিন তাঁরা মহানবীর সঙ্গে ছিলেন। তখন তিনি প্রিয় সাহাবি হজরত ওমর (রা.)-এর হাত ধরে ছিলেন। হজরত ওমর (রা.) রসুল (সা.)-কে লক্ষ্য করে বললেন, ইয়া রসুলুল্লাহ! আপনি আমার কাছে আমার নিজ জীবন থেকে বেশি প্রিয় নন। অর্থাৎ আপনাকে আমি দুনিয়ার সবকিছু থেকে বেশি মহব্বত করি, তবে আমার নিজ সত্তা থেকে বেশি মহব্বত করি না। রসুল (সা.) হজরত ওমর (রা.)-এর এ কথা শুনে বললেন। ‘নাহ! যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ, যতক্ষণ আমি তোমার কাছে তোমার নিজের চেয়েও বেশি প্রিয় না হই (ততক্ষণ তুমি পূর্ণ মুমিন নও)। এরপর হজরত ওমর (রা.) বললেন, আল্লাহর কসম, এখন আপনি আমার কাছে আমার নিজের চেয়েও বেশি প্রিয়। তখন রসুল (সা.) বললেন, হে ওমর এখন হয়েছে। (বুখারি শরিফ, হাদিস নম্বর ৩২)। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, সাহাবায়ে কেরামরা কত সহজ-সরল ছিলেন। তাঁদের ভিতরে-বাইরে একরকম ছিল। ভিতরে যা থাকত তা অকপটে বলে দিতেন। বর্তমানে অনেক মানুষ এমন আছে, যারা নিজেদের ভালো প্রমাণ করার জন্য এবং মানুষকে খুশি করার জন্য অহরহ মিথ্যা বলে। বিচক্ষণ সাহাবি হজরত ওমর (রা.) অনুধাবন করেছিলেন, অন্য সবকিছুর চেয়ে মানুষের নিজের প্রতি ভালোবাসাই বেশি। রসুল (সা.) যখন তাঁকে বললেন, হে ওমর তুমি যদি পূর্ণ ইমানদার হতে চাও তাহলে অবশ্যই তোমার ভিতর নবীর প্রতি ভালোবাসা তোমার জীবনের চেয়েও বেশি থাকতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বুঝে নিলেন, দুনিয়ার জীবন মাত্র কয়েক দিনের। দুনিয়ার হায়াত একদিন শেষ হয়ে যাবে। বরং মানব সৃষ্টির একমাত্র মাকসাদ হলো এক আল্লাহর ওপর ইমান আনা। আল্লাহর প্রেরিত রসুলদের বিশ্বাস করা এবং তাঁদের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা তৈরি করা। তাই তো তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলে দিলেন- ইয়া রসুলুল্লাহ! আপনাকে আমি আমার জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। রসুলের প্রতি প্রতিটি মুমিনের এমনই ভালোবাসা থাকা চাই। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রসুল (সা.)-কে অনুসরণ করতে হবে। তাঁর চলার পথে চলতে হবে। তাঁর দেখিয়ে দেওয়া পথে আল্লাহর রহমত নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আমেনা খাতুন হাফেজিয়া কোরআন রিসার্চ অ্যান্ড ক্যাডেট ইনস্টিটিউট কটিয়াদী, কিশোরগঞ্জ