তিস্তা রক্ষার কর্মসূচিতে সম্প্রতি দেশের উত্তরাঞ্চলে ব্যাপক সমাবেশ করেছে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি। প্রতিবেশী দেশ ভারতের উদ্দেশে তারা সাফ সাফ বলেছে, বন্ধুত্ব চাইলে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্সা দিতে হবে। শুধু তিস্তা নয় উজানে অভিন্ন সব নদীর পানি প্রত্যাহারের অপনীতি থেকে সরে আসতে হবে ভারতকে। দুই দেশের বন্ধুত্ব রক্ষায় এটি এখন পূর্বশর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবারই জানা, পানির অভাবে ধুঁকছে একসময়ের প্রমত্তা নদী তিস্তা। এ নদীপাড়ের লাখ লাখ মানুষের জীবনজীবিকার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন নদীগুলোর একটি তিস্তা। দেড় দশক আগে এ নদীর পানিবণ্টনে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হয়। কিন্তু তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরকালে এ বিষয়ে চুক্তি হবে এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় দিল্লির পক্ষ থেকে। কিন্তু তিস্তার পানিবণ্টনে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের আপত্তিকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে দিল্লি সে প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যায়।
উজানে পানি প্রত্যাহারের কারণে মরতে বসেছে খরস্রোতা তিস্তা নদী। চারদিকে জেগে উঠেছে ধু-ধু বালুচর। নদীর আশপাশ এলাকায় পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। তিস্তা সেচ প্রকল্প পানির অভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ছে। উজানে ছোট ছোট জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনায় তিস্তাপাড়ের মানুষের কপালে চিন্তার ছাপ দেখা দিয়েছে। তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্সা থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত হওয়ায় উত্তরাঞ্চলের প্রকৃতিতে পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। শুকনো মৌসুমে পানির জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকে তিস্তার দুই পাড়ের মানুষ। অন্যদিকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে নদীপাড়ের মানুষ আন্দোলন-সংগ্রাম করে এলেও এখনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি কোনো সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি উঠলেও এখনো কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বিএনপি গত ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি তিস্তাপাড়ের বিশাল এলাকাজুড়ে করেছে জনসমাবেশ ও গণপদযাত্রা। সঙ্গে ছিল নানা সংস্কৃতিক কর্মসূচি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি সমাবেশে যুক্ত হয়ে তাঁর ভাষণে বলেছেন, ‘আমরা মনে করি, ভারতের সঙ্গে সব যৌথ নদীর পানির ন্যায্য হিস্সা আদায়ে বাংলাদেশকে সব ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করার পাশাপাশি, প্রয়োজনে জাতিসংঘসহ সব আন্তর্জাতিক ফোরামে যেতে হবে। দেশের গণমানুষের ন্যায়সংগত পাওনা পানির ন্যায়সংগত প্রাপ্য অংশ আদায়ে সোচ্চার হতে হবে।’ তার আগে উদ্বোধনী দিনে তিস্তাপাড়ের জনসমাবেশের ভাষণে সুস্পষ্টভাবে বিএনপি মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভারতের ক্ষমতাধর নেতাদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘যদি বাংলাদেশের মানুষের বন্ধুত্ব পেতে চান, তাহলে অবিলম্বে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্সা দিন।’
স্মরণ করা যায়, ১৯৭৬ সালে মজলুম জননেতা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী গঙ্গার পানি একতরফা প্রত্যাহারের প্রতিবাদে লংমার্চ করেছিলেন। বিপুল সাড়া তোলে সেই আন্দোলন। ‘গঙ্গার পানির হিস্সা চাই’ স্লোগান তুলে লংমার্চে নামে সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ। সেই লংমার্চ কর্মসূচি ছিল দুনিয়াকাঁপানো একটা লড়াই। মূল নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী। তাঁর পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ। বিশেষ করে পেছনে থেকে হুজুরকে সার্বিক সহযোগিতা দিয়েছিলেন রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান।
সাম্প্রতিক তিস্তা নদীর জনসমাবেশ ও দেশের অধিকার আদায়ের সোচ্চার কর্মসূচি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নতুন সংস্করণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, সেই আওয়াজ কী ভারতের আধিপত্যবাদী বিজেপি সরকার এবং পশ্চিম বাংলার নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কানে পৌঁছেছে? পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারপ্রধানকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে তারা হয়তো ভাবছে এখনো আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মতলব হাসিলের জন্য তাঁবেদার গোষ্ঠীর ওপর ভরসা করা যায়। তবে এই আশা নিতান্তই দুরাশা। এই দেশে আর কোনো দিন ফ্যাসিবাদের জায়গা হবে না। তাই ভারত সরকারকে কালবিলম্ব না করে পানিসহ অন্য সব কূটনৈতিক সমস্যা সমাধানে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যথার্থ যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার ৫৪টি যৌথ নদীর পানিবণ্টনের ক্ষেত্রে এবং বন্যানিয়ন্ত্রণসহ সব সমস্যার সমাধানের প্রশ্নে প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি গোঁয়ার্তুমির পরিচয় দিয়ে চলেছে। গঙ্গার পানি সমস্যার আংশিক সমাধান হয়েছে বটে, তবে পুরো হিস্সা বাংলাদেশ এখনো পায়নি। অন্য সব নদীর পানির সমস্যা ঝুলিয়ে রেখে ভারত দম্ভ প্রকাশ করে যাচ্ছে। এখন, সাম্প্রতিক দেড় দশকের বেশি সময় সবচেয়ে বড় সমস্যা সৃষ্টি করছে তিস্তার পানির ন্যায্য-বণ্টন সমস্যা। এ ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে যে আচরণ করছে তা বন্ধুসুলভ নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বছরের পর বছর বলে এসেছেন, ‘পশ্চিম বাংলার মানুষের কৃষি-সেচের ও খাবার পানির প্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে
তিস্তার জল, কীভাবে বাংলাদেশের জন্য তিস্তার পানি দেব?’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু দক্ষ রাজনীতিকই নন, সংস্কৃতিবান ও মানবপ্রেমী হিসেবে তাঁর সুনাম রয়েছে। তিনি কীভাবে মধ্যযুগীয় ভূস্বামী বা জমিদারের কায়দায় এমন একটা কথা বলতে পারেন? তিস্তা আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার যৌথ নদী। এর পানির ওপর ভারতের মানুষের যেমন অধিকার রয়েছে তেমনি সমান অধিকার বাংলাদেশের মানুষের। ন্যায্য অধিকারের জন্য তারা ১৯৮৩ থেকে অপেক্ষমাণ। আর কত দিন বাংলাদেশের মানুষকে অপেক্ষা করতে হবে।
তিস্তা নদী সিকিম ও পশ্চিম বাংলার বিশাল এলাকাজুড়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশের রংপুর বিভাগে প্রবেশ করেছে এবং যমুনা নদীর সঙ্গে একাকার হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। ৪১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই আন্তর্জাতিক নদীটি ভারতের ছয়টি জেলার মধ্যে ২৯৩ কিলোমিটারব্যাপী এলাকায় প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশের সীমান্ত দিয়ে লালমনিরহাট জেলার মধ্যে প্রবেশ করে ১২১ কিলোমিটার গতিপথ পেয়েছে এবং রংপুর বিভাগের পাঁচটি জেলার প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ মানুষের জীবনজীবিকার অনুষঙ্গ হয়ে বিরাজ করছে। কৃষি সেচ, মাছ আহরণ, দৈনন্দিন খাবার ও গোসলের পানির উৎসরূপে এবং নৌপথে চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এ নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি বিশেষ সংস্কৃতি ও সভ্যতা।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে ভারত বা চীন যার সঙ্গেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হোক, তার দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশসম্মত স্থায়ী সমাধান যেন বাংলাদেশ পায় এবং সেই সঙ্গে ভারতও। তিস্তা আন্তর্জাতিক নদী। এ নদীতে কিছু করতে হলে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা মানা হচ্ছে না। ভারত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার প্রতিশ্রুতি থেকে এখনো সরে আসেনি। এ ব্যাপারে দিল্লির সুমতি না হলে প্রয়োজনে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হতে হবে। ব্যয়বহুল হলেও তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নকে নিতে হবে চ্যালেঞ্জ হিসেবে। তিস্তা মহাপ্রকল্প বাস্তবায়নে চীনসহ বন্ধু দেশগুলোর সহযোগিতা নেওয়ার সম্ভাব্যতা নিয়েও ভাবতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ। বন্ধু দেশও বটে। বন্ধুত্বের স্বার্থেই ভারতকে তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনে যুক্তিগ্রাহ্য সমঝোতায় আসতে হবে।
লেখক : বিএনপির সাবেক তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক