খুবই বেদনা-ভারাক্রান্ত মনে আজকের এই লেখা শুরু করছি। এটা আমাদের ভাষার মাস, মহান শহীদ দিবসের মাস। কিন্তু এই বিশেষ দিনটিকে ঘিরে অনেক দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে দেশজুড়ে। শহীদ মিনার সবার ভালোবাসার, শ্রদ্ধার জায়গা। দল-মত-ধর্ম-বর্ণ-নির্র্বিশেষে সবাই সেখানে শ্রদ্ধা জানাতে পারে, শ্রদ্ধা জানায়। কিন্তু শুনলাম, এবার কোনো কোনো ব্যক্তিকে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে দেওয়া হয়নি। কেন, তা জানি না। ঘটনাটা সত্য হলে কেন এমনটা হলো তার কোনো ব্যাখ্যাও এখনো পাওয়া যায়নি।
এর মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়াজুড়ে ঘুরছে শহীদ মিনার ভাঙার ভিডিও। কতগুলো ছোট ছোট ছেলে জওয়ানি জোশ নিয়ে ভাঙছে স্মৃতির এই মিনার। ফেসবুকে একজন লিখেছেন, ‘এই ভিডিওটা নাকি বানানো।’ তবে তিনি এটাও লিখেছেন, ‘এটা বানানো হলেও অনেকগুলো শহীদ মিনার ভাঙা হয়েছে দেশব্যাপী।’ এরপর আমার আর বলার কিছু থাকে না। আমি একজন ভাষাসৈনিকের কন্যা। ভাষার জন্য বায়ান্নর যে আত্মবলিদান সারা বিশ্বে যা স্বর্ণাক্ষরে লেখা, যা আমাদের ইতিহাসের উজ্জ্বলতম অংশ; কেন সেই বায়ান্নর প্রতীক শহীদ মিনার ভাঙা হচ্ছে, কারা ভাঙছে, কী প্রতিকার হচ্ছে, জানি না। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। যার যা ইচ্ছা সে তাই করছে। যেন বাধা দেওয়ার কেউ নেই। সবাই স্বাধীন। রাস্তায় চলতে ভয় করে। সেদিন আমার গাড়িতে একটা অটোরিকশা লাগিয়ে দিল। ড্রাইভার বেচারা শুধু পেছন ফিরে তাকিয়েছে, গাড়ি থেকে নামেওনি। অটোয় বসা দুজন হাত তুলে তাকে চড় মারার ভঙ্গিতে অশ্রাব্য গালিগালাজ করতে লাগল। যুবক ড্রাইভার উত্তেজিত হয়ে উঠল। ড্রাইভারকে বললাম, ‘নেম না বাবা। চুপ থাক।’ ওরা কিছুক্ষণ চেঁচিয়ে থেমে যাবে।
ছিনতাই, রাহাজানি, খুন-জখম, ধর্ষণের অভয়ারণ্য যেন দেশ। গত সরকারের আমলেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছিল। এখন সেটা চরমে পৌঁছেছে। সরকার পতনের আগে সিরাজগঞ্জের একটা থানায় ১৩ জন পুলিশকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, ১৩টি থানা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, ভাঙচুর করা হয়েছে অনেক থানায়। এ সময় পুড়ে গেছে শত শত মামলার নথি। গত সরকারের বিদায়ের পর গণহারে থানা আক্রমণ হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ৪৫০টি থানা আক্রান্ত হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছিল।
আমার এক পরিচিতের বাসায় একজন বুয়া কাজ করেন। চেহারা দেখলেই বোঝা যায়, তিনি কোনো ভালো পরিবার থেকে এসেছেন। চালচলন আদবকায়দা ভালো। এখানে একটা কথা বলা দরকার, উন্নয়নের বাণী আমরা যতই শোনাই না কেন, দেশের মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্তরা আছে বড় বিপাকে। তারা নিঃস্ব হয়ে গেছে। অনেকে তাই এখন অটো চালায়। অনেকে মুখ ঢেকে ন্যায্যমূল্যের ট্রাকের পেছনে দাঁড়ায়, অনেকে বাসাবাড়িতে কাজ করে। তা সেই বুয়ার ছেলে একটা অটোরিকশা চালায়। রিকশাটা অন্যের। দিন কয়েক আগে রিকশায় দুজন প্যাসেঞ্জার নিয়ে সে যাচ্ছিল। প্যাসেঞ্জারদের একজন একসময় বলল, ‘ভাই আমার ব্যালান্স শেষ হয়ে গেছে। তোমার ফোনটা একটু দেবে। একটা কল করব। আমি তোমাকে টাকাটা দিয়ে দেব।’ এমন তো আমরা কত করি। নিজেরাও দিই, অন্যের কাছ থেকেও নিই। ছেলেটা দিল। লোকটা একটা কল করল। তারপর মোবাইল ফোনটা ওর হাতে ফেরত দিল। মোবাইল ফোন হাতে নেওয়ামাত্র অজ্ঞান হয়ে গেল ছেলেটা। এরপর সে নিজেকে আবিষ্কার করল সায়েদাবাদের কোনো এক নির্জন এলাকায়। তার অটোও নেই, মোবাইল ফোনও নেই। এখন অটোর এক লাখ টাকা ওই ছেলেটাকে দিতে হবে। সে কোথা থেকে দেবে! একটা নয়, এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে। দেশজুড়ে অনেক ইজিবাইক, অটোরিকশা চুরির ঘটনা ঘটেছে। সব কটাই হয়েছে কোনো না কোনো পন্থায় অজ্ঞান করে।
প্রতারণার অজস্র ফাঁদ পাতা হচ্ছে নিত্যনতুন কৌশলে। প্রতিদিনই চেনাজানা কারও না কারও ফেসবুক হ্যাক হচ্ছে। টাকা চাচ্ছে। বিষয়টা এখন অনেকটাই কমন হয়ে গেছে বলে সবাই সতর্ক। কিন্তু একসময় আমি নিজেও হ্যাকারের দেওয়া বিকাশে বন্ধুর জন্য টাকা পাঠিয়েছি। একজন মানুষ কতক্ষণ সতর্ক থাকতে পারে! একটু অসতর্ক হলেই বিপদ। মাত্র কিছুদিন আগে আমি নিজেই মহাবিপদে পড়তে যাচ্ছিলাম। আমি ছিলাম ছোট বোনের বাসায়। সেখানে একটা ফোন এলো। জানতে চাইল, আমি কভিডের শেষ টিকাটা দিয়েছি কি না। বললাম, ‘দিইনি। বুস্টার ডোজটা আমেরিকায় দিয়েছিলাম। তারপর থেকে আর কোনো মেসেজ আসেনি বলে দেওয়া হয়নি।’ ওপাশ থেকে বলল, ‘কাল ঢাকা মেডিকেল কলেজে আপনার ডোজ দেওয়া হবে। এখন আপনার ফোনে একটা নম্বর যাবে। ওই নম্বরটা আমাকে বলবেন।’ আমি খানিকটা দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বললাম, ‘কিন্তু আমি তো দিয়েছি পিজিতে।’ ‘ওখানেও দিতে পারবেন। তবে ওই নম্বরটা লাগবে।’ বলতে বলতেই আমার ফোনে একটা নম্বর এলো। আমি ভালো করে দেখার আগেই ওপাশ থেকে ফোন করে বলল, ‘নম্বরটা বলেন’। বললাম, ‘আপনি তো সঙ্গে সঙ্গেই ফোন করলেন। নম্বরটা তো দেখতেই পাইনি।’ ‘আপনি দেখেন। আমি আবার ফোন করছি।’ এ সময় দেখি ভগ্নিপতি হাত নেড়ে আমাকে নিষেধ করছে। আমি থমকে গেলাম। এর মধ্যে ফোন এসে গেল। ভগ্নিপতি বলল, ‘তোমার চেনা?’ না বলাতে বলল, ‘কিছু দেবার দরকার নেই। ফোন ছেড়ে দাও।’ আমি লোকটাকে বললাম, ‘দেখেন টিকা আমার। নম্বর যদি লাগে আমার লাগবে। তা ছাড়া আমার আগের ডকুমেন্টস আছে। আপনাকে দেব কেন?’ সঙ্গে সঙ্গে সে ফোন ছেড়ে দিল। পরে শুনলাম ওই নম্বরটা দিলে ওরা আমার ব্যাংকের সব টাকা তুলে নিতে পারত। চিন্তা করুন। কী মহাবিপদ! আর ওরা নাকি বেছে বেছে বয়স্ক লোকদেরই টার্গেট করে, যাঁরা প্রযুক্তি ভালো বোঝে না, যাঁদের শরীর খারাপ। ভালো করে চিন্তাভাবনা করতে পারেন না।
প্রত্যক্ষ-অপ্রত্যক্ষ কতভাবে যে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। ঢাকার মোহাম্মদপুর এখন সন্ত্রাসী এলাকা হিসেবে বহুল আলোচিত। দিন কয়েক আগে সন্ত্রাসীরা একটা দোকানে ঢুকে অস্ত্রের মুখে ডাকাতি করে। অস্ত্রধারীদের প্রকাশ্যে রামদা ও চাপাতি হাতে দৌড়াদৌড়ির ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে দেখে লোকজন রীতিমতো ভয়ার্ত। অস্ত্র হাতে একদল তরুণ এক তরুণীকে টানাহেঁচড়া করছে, তাঁর ওড়না টেনে ফেলছে, তরুণী দৌড়ে বাঁচার চেষ্টা করছেন, এ দৃশ্যও আমাদের দেখতে হচ্ছে।
এ দুুটি ঘটনা ঘটেছে মোহাম্মদপুরে। এরপর এলাকাবাসী বিক্ষোভ করলে যৌথ বাহিনীর অভিযানে ৪৫ জন আটক হয়েছে। কিন্তু এখনো জনমনে স্বস্তি ফেরেনি।
৫ আগস্ট এবং তার পূর্ববর্তী-পরবর্তী কয়েক দিন ওই এলাকায় ছিল ডাকাতির প্রচ- ভয়। নৌকায় করে বেড়িবাঁধে এসে নামত ডাকাতরা। তারপর পুরো এলাকায় ডাকাতি করত। কত দিন মধ্যরাতে মাইকিং হয়েছে মসজিদ থেকে। এলাকার ছেলেরা লাঠি হাতে নেমে গেছে ডাকাত তাড়াতে। এখন ডাকাত নয়, তরুণ কিশোর গ্যাংয়ের ভয়ে সবাই তটস্থ। এমনকি যৌথ বাহিনীর পরিচয় দিয়ে ঢুকে ব্যবসায়ীর বাসায় ডাকাতিও হয়েছে মোহাম্মদপুরে। ডাকাতরা নাকি সেনাবাহিনী ও র্যাবের পোশাক পরে গিয়েছিল। লুটে নিয়েছে ৭৫ লাখ টাকা ও ৭০ ভরি সোনা। এ ঘটনায় আটজন আটক হয়েছে। তবে এটাও প্রশ্ন, এ জমানায় ৭৫ লাখ টাকা আর ৭০ ভরি সোনা ঘরে রাখার দুঃসাহস উনি কেন দেখালেন!
শুধু ঢাকা নয়, দেশজুড়ে চলছে হামলা লুটপাট ডাকাতি ধর্ষণ। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চর এলাকায় ঘটেছে মর্মন্তুদ ঘটনা। ঘর থেকে মা-মেয়েকে একসঙ্গে তুলে নিয়ে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করেছে দুর্বৃত্তরা।
নীলফামারীর সৈয়দপুরে ব্যাংক থেকে ২৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে বের হচ্ছিলেন এক ব্যক্তি। ছিনতাইয়ের শিকার হন তিনি। ঘটনার আকস্মিকতা ও আঘাতে মারা যান ভদ্র্রলোক।
কনস্টেবলসহ দুজনকে ছিনতাইয়ের অভিযোগে গণপিটুনি দিয়েছে ফরিদপুরের ব্রাহ্মণকান্দার লোকজন। এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় সিএনজিচালিত একটি অটোরিকশা ছিনতাই করতে গিয়ে এর চালককে খুন করেছে সন্ত্রাসীরা।
ঢাকা থেকে রাজশাহীগামী চলন্ত বাসে ডাকাতি হয়েছে, হয়েছে ধর্ষণ। দুর্ভাগ্যের বিষয়, ভিকটিম তিন দিনের মধ্যে মামলা করতে পারেননি। অবশেষে দেশব্যাপী ব্যাপক আলোচনার পর মামলা নিয়েছে থানা।
সব মিলিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন একেবারেই নাজুক। পুলিশ দীর্ঘদিন কাজ করেনি। এখন তারা কাজ করছে বটে, কিন্তু অনেকটাই গা বাঁচিয়ে। কোনো হাঙ্গামায় তারা যেতে চায় না। তাদের মধ্যে সব সময় একটা আতঙ্ক কাজ করে বলে মনে হয়। পুলিশ যদি আতঙ্কে থাকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে কী করে!
দেশের পুলিশ আগের মতো পূর্ণোদ্যমে কাজ করতে না পারায় অপরাধীরা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। তা ছাড়া জেল থেকে অনেক অপরাধী বেরিয়েও গেছে। তারা তাদের নেটওয়ার্ক সুসংগঠিত করে জোরেশোরে মাঠে নেমেছে। অন্যদিকে দেশের এ অরাজক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার সুযোগ নিচ্ছে একদল মানুষ। যার ওপর যার রাগ আছে এখনই সেটা মেটাবার মোক্ষম সুযোগ। সেটাই তারা মেটাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য। দ্রব্যমূল্য এতটাই বেড়েছে, অনেকেই সংসার চালাতে পারছেন না। বাধ্য হয়ে তারা অপরাধের পথ, প্রতারণার পথ বেছে নিচ্ছেন।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সবার আগে পুলিশকে গতিশীল করতে হবে। মানুষ আগে যেমন পুলিশ শুনলেই ভয় পেত, গুটিয়ে যেত সেই অবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। পাড়া-মহল্লায় স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গঠন করা দরকার। তারা কোনো অন্যায় হতে দেখলেই প্রতিকার করবে সংঘবদ্ধভাবে। অভিভাবকদের উচিত তাদের তরুণ-কিশোর সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখা। তারা কোনো খারাপ সঙ্গে মিশছে কি না, সেটা দেখা। আমাদের নিজেদেরও কাজকর্ম চলাফেরায় সাবধান, সচেতন থাকতে হবে যেন কোনো বিপদে না পড়ি, কোনো ফাঁদে পা না দিই। শুরু করেছিলাম শহীদ মিনার ভাঙা দিয়ে। সেটা দিয়েই শেষ করি। যা কিছু আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের উত্তরাধিকার, আমাদের পরম্পরা, সেসব আমাদের সম্পদ। সেগুলো নষ্ট করা মানে নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত করা। সরকারের প্রতি এদিকে দৃষ্টি দেওয়ার অনুরোধ রইল।
♦ লেখক : কথাসাহিত্যিক, গবেষক