টুপি তৈরির ধুম পড়েছে নওগাঁর মহাদেবপুর ও নিয়ামতপুর উপজেলার গ্রামাঞ্চলে। এখানকার নারীরা সংসারের কাজের অবসরে সুঁইয়ের ফোঁড়ে নানা নান্দনিক নকশায় ফুটিয়ে তুলছেন একেকটি কাপড়। এভাবে সুঁই-সুতায় নানা আলপনা এঁকে আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠছেন তাঁরা। এ কাজে নিয়োজিত থেকে কয়েক হাজার নারী অভাবের সংসারে এনেছেন সচ্ছলতা, পেয়েছেন সুখের ঠিকানা।
তাঁদের নকশা করা টুপি দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রির পাশাপাশি রপ্তানি হচ্ছে সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। জেলার প্রায় ৩০ হাজার নারীর কর্মসংস্থান হয়েছে টুপি তৈরিতে। এতে প্রতি বছর প্রায় শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা। মহাদেবপুর উপজেলা শহরসংলগ্ন খোসালপুর, চকগোবিন্দপুর, মধুবন এবং শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে উপজেলার উত্তরগ্রাম ইউনিয়নের নিভৃত গ্রাম শিবরামপুর, ভালাইন, লক্ষ্মণপুর, সুলতানপুর, রামচন্দ্রপুর, হেরেমনগর, বিল মোহাম্মদপুর গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, সংসারের কাজের ফাঁকে দৃষ্টিনন্দন টুপির কারুকাজে ব্যস্ত গ্রামের প্রতিটি পরিবারের নারীরা। আসন্ন ঈদ ঘিরে তাঁদের ব্যস্ততা বেড়েছে কয়েক গুণ। টুপি সেলাই করতে কেবল গৃহিণীরাই নন, স্কুল-কলেজ পড়ুয়া মেয়েরাও ব্যস্ত। সুঁই-সুতায় নকশা তুলে টুপি তৈরির কাজ করছেন দিনরাত। মহাদেবপুর সদর ইউনিয়নের খোসালপুর স্কুলপাড়ার আঞ্জুয়ারা বেগম জানান, বসতবাড়ি ছাড়া তাঁদের তেমন কোনো জমিজমা নেই। রিকশাচালক স্বামীর আয়ে চারজনের সংসার টানাপোড়েনের মধ্যে চলছিল। টুপি সেলাইয়ের কাজ করে সংসারে সচ্ছলতা এনেছেন। টুপিতে নকশা তোলার কাজ করে তাঁর স্বামীকে একটি অটোরিকশা কিনে দিয়েছেন তিনি। তাদের দুই সন্তান। মেয়ে অষ্টম আর ছেলে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। লেখাপড়ার পাশাপাশি মেয়ে কবিতাও মায়ের সঙ্গে টুপি সেলাইয়ের কাজ করে। মা-মেয়ে দুজনে মাসে কমপক্ষে ৩ হাজার টাকা আয় করেন। খোসালপুর গ্রামের একটি আমবাগানে ১০-১২ জন মহিলা একসঙ্গে বসে টুপিতে নকশা তোলার কাজ করছিলেন। সেখানে কথা হয় সাবিনা, রওশন আরা, সুমাইয়া, নাদিয়া, সুলতানা, লাইলি, রুবিনাসহ কয়েকজন গৃহিণীর সঙ্গে। তাঁরা জানালেন, সারা বছর টুপির চাহিদা থাকলেও রোজার মাস ও দুই ঈদে এ চাহিদা আরও বেড়ে যায়।
এ সময়ে কাজের অর্ডারও বেশি পাওয়া যায়। তাঁরা আরও জানালেন, মহাজনরা তাঁদের কাছে চাহিদা মোতাবেক টুপির কাপড় দিয়ে যান। কোনো কোনো কাপড়ে ডিজাইনারদের নকশা আঁকা থাকে। এসব নকশার ওপর সুতা তুলতে হয় তাঁদের। ডিজাইনারদের নকশা করা কাপড়ে সুতা তুলে দিলে প্রতি টুপিতে ২৫ টাকা করে পাওয়া যায়। আর যাঁরা নিজেরাই নকশা করে টুপিতে সুতা দিয়ে ফুল তোলেন তাঁরা প্রতি টুপিতে ২০০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত পান। নওগাঁ শহরের আয়মান হস্তশিল্পের স্বত্বাধিকারী জীবন আহম্মেদ জানান, নারীরা এ পেশায় নিয়োজিত। পুরুষরা এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন। বর্তমানে তাঁর অধীনে ৬ হাজারের অধিক নারী শ্রমিক টুপি তৈরির কাজ করছেন। ঈদুল ফিতর কেন্দ্র করে প্রায় কোটি টাকা মূল্যের টুপি ওমানে রপ্তানির টার্গেট রেখেছেন।