এবার নতুন সংকটে পড়েছে শেয়ার বাজার। বিনিয়োগকারীদের মূলধন পাহারার দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) চরম অস্থিরতায় ঝুঁকিতে পড়েছে দেশের শেয়ারবাজার। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগের দাবিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মবিরতি পালনের কারণে বাজার মনিটর করা হচ্ছে না। এমনকি বাজার সার্ভিল্যান্সের জন্য দায়িত্বরত সবাই কর্মবিরতি পালন করছে। এতে ১০ লাখের বেশি লগ্নীকারীর বিনিয়োগ নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে। বিশৃঙ্খলা তৈরি করার অভিযোগ সংস্থার ১৬ কর্মকর্তাকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়েছে। কমিশনের এই পরিস্থিতির কারণে উদ্বিগ্ন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এভাবে শেয়ারবাজার বড় রকমের ঝুঁকিতে পড়েছে। দ্রুত এই সমস্যার সমাধান না হলে দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
জানা গেছে, গত ৫ মার্চ বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর আদেশ জারির পর নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিএসইসি চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের ফ্লোর (পঞ্চম তালা) ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিএসইসি ভবনের সামনে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। এ ঘটনার পরেরদিন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগের দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করে। অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে চার দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবির মধ্যে- বর্তমান কমিশনকে অনতিবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ডেকে কমিশনের-কর্মকর্তা কর্মচারীদের লাঠিচার্জ করার জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। প্রধান উপদেষ্টার সরাসরি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বিএসইসির জন্য পুঁজিবাজার সম্পর্কে অভিজ্ঞ ও যোগ্য চেয়ারম্যান এবং কমিশনার নিয়োগ দিতে হবে। সংস্কারের অংশ হিসেবে কমিশনকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান এবং দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনের মধ্যে বিএসইসি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বিএসইসি কার্যালয়ে আসেন। চেয়ারম্যান বলেন, কোনো ধরনের অন্যায়ের কাছে মাথা নত করব না। আমরা যে কাজ নিষ্ঠা ও নিয়মের সঙ্গে করে আসছি, সেটা করে যাব।
এরপরে ওইদিন বিএসইসির ১৬ কর্মকর্তাকে আসামি করে মামলা করা হয়। বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত গানম্যান আশিকুর রহমান বাদী হয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় অভিযোগের পর তা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। মামলার অভিযোগে বলা হয়, বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সভাপতিত্বে এবং কমিশনার মো. মহসিন চৌধুরী, মো. আলী আকবর ও ফারজানা লালারুখের উপস্থিতিতে কমিশনের নির্ধারিত সভাকক্ষে সভা চলাকালে অভিযুক্ত ব্যক্তিরাসহ আরও কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী কমিশনের সভাকক্ষে জোরপূর্বক ও অনধিকার প্রবেশের মাধ্যমে কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের অবরুদ্ধ করেন। এরই মধ্যে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কমিশনের মূল ফটকে তালা দেন, সিসি ক্যামেরা, ওয়াই-ফাই, কমিশনের লিফট বন্ধ করে দেন এবং বৈদ্যুতিক সংযোগ বন্ধ করে মারাত্মক অরাজকতা ও ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন। কমিশনের এই পরস্পর বিরোধী অবস্থানের কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বিএসইসি।
বিএসইসির অভ্যন্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে সৃষ্ট ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পুঁজিবাজারের স্টক ব্রোকারদের সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ)। ডিবিএর প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ বছর ধরে দেশবিদেশের নানা নেতিবাচক ঘটনা ও সিদ্ধান্তের ফলে দেশের পুঁজিবাজার ক্রান্তিকাল পার করছে। লাখ লাখ বিনিয়োগকারী পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। বাজার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার ন্যায় অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে কর্মকর্তাদের মাঝে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার ঘটনা বাজারের জন্য মোটেও সুখকর নয়। চলমান ঘটনার দ্রুত সমাধান না হলে বাজারে বিদ্যমান আস্থার সংকট আরও প্রকট হতে পারে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে।