আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দ শ বছর আগে মানবজাতি ডুবেছিল অন্ধকার সমুদ্রে। আত্মিকতা পরাজিত হয়ে চলেছিল শয়তানতন্ত্রের কাছে। উন্নতি অগ্রগতির পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মানবসভ্যতা থমকে দাঁড়িয়েছিল। তখন জগতের মহান সৃষ্টিকর্তা তাঁর শেষ নবী এবং প্রিয়তম রসুল হজরত মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে (আমার আত্মা ও হৃদয় উৎসর্গিত হোক তাঁর প্রতি) এই পৃথিবীতে পাঠালেন, যেন তিনি হেদায়েতের জ্যোতি দিয়ে গোমরাহির অন্ধকার ছিন্ন করে দেন এবং মিথ্যার ওপর সত্যকে বিজয়ী করে দেন। আমাদের মাতা-পিতা তাঁর প্রতি উৎসর্গিত হোক। তিনি তাশরিফ আনলেন। আসামাত্রই তিনি আল্লাহর সিদ্ধান্তে পৃথিবীর রূপ পাল্টে দিলেন। বান্দাদের ধসে পড়া সম্পর্ক খোদার সঙ্গে জুড়ে দিলেন। যে ভাগ্যবিড়ম্বিত জন লাঞ্ছনার গহ্বরে পতিত ছিল তাকে সেখান থেকে উঠিয়ে উচ্চতার চূড়ায় পৌঁছে দিলেন। শিরককারীদের বানালেন একত্ববাদী। কাফেরদের বানালেন বিশ্বাসী। প্রতিমাপূজারিদের বানালেন খোদাপুরুস্ত। মূর্তিনির্মাতাদের বানালেন মূর্তিনাশী। রাহজানদের শেখালেন রাহনুমায়ী। দাসদের শেখালেন নেতৃত্ব্। একদার চোর পরিণত হলো চৌকিদারে। উৎপীড়ক হলো সহমর্মী। জগৎজোড়া আওয়ারা হয়ে গেল সবচেয়ে বড় সভ্যজন এবং যাদের জাতীয় মর্যাদা সম্পূর্ণ পচে গলে গিয়েছিল, তা আবার পরিপূর্ণ সজীব ও পুনর্গঠিত হয়ে উঠল। আত্মিকতার ফেরেশতা প্রবল হলো শয়তানতন্ত্রের ওপর। কুফুর ও শিরকের, বেদআত ও ভ্রান্তির এবং সব রকমের গোমরাহির ঘটল চরম পরাজয়। দুর্ভাগ্য ও বদবখতির মৌসুম বদলে গেল। সীমা লঙ্ঘন ও বিদ্রোহের এবং বিপর্যয় ও নাফরমানির শক্তি খতম হয়ে গেল। সত্য ও সত্যবাদিতার এবং কল্যাণ ও সৌভাগ্যের বিশ্বজনীন বিজয় হলো। আর পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হলো এমনই এক নিরাপত্তা ও ন্যায়ের বাদশাহি!
যে সময় মানবভুবনের এই মহান পরিত্রাতা এই পানি ও ফুলের, এই রস ও তৃণের পৃথিবীতে তাঁর প্রথম কদমটি রেখেছিলেন সেটি ছিল রবিউল আউয়াল মাস এবং যখন তাঁর বয়স চল্লিশ বছর পূর্ণ হলো তখনো এই মাসেই তাঁকে সোপর্দ করা হয়েছিল জগৎশুদ্ধির কাজে। সুতরাং এ হিসেবে বলা যেতে পারে, রবিউল আউয়ালই এই সর্বজনীন রহমত বিকাশের শুরুক্ষণ এবং এই আত্মিক কল্যাণ ও সুষমার ঝরনাধারার উৎসমুখ। আর এ কারণেই যখন মোবারক এ মাসটি আসে তখন মুসলমানদের হৃদয়ে (এমনকি সেসব অন্তরেও, অন্য মৌসুমে যারা থাকেন সম্পূর্ণ উদাসীন) সেই মহান অস্তিত্বের স্মরণ সজীব হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন ধরনের খুশি ও আনন্দের প্রকাশ ঘটানো হয়ে থাকে। আল্লাহতায়ালার বড় কোনো নেয়ামতের স্মরণে আনন্দিত হওয়া কোনো খারাপ জিনিস নয়। বরং শরিয়তের সীমারেখা অতিক্রম না করলে এটি একটি পর্যায় পর্যন্ত প্রশংসনীয়ও। রবিউল আউয়ালের মর্যাদার কয়েকটি দিক রবিউল আউয়াল আরবি বর্ষপঞ্জিকার তৃতীয় মাস। শাব্দিক অর্থ প্রথম বসন্ত। মহিমান্বিত রবিউল আউয়াল মাসটি তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ার অনেকগুলো দিক আছে।
প্রথম দিক : বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত, মানবসভ্যতার অহংকার, ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পৃথিবীতে আগমন হয়েছে রবিউল আউয়াল মাসে।
দ্বিতীয় দিক : রবিউল আউয়ালে নবীজি (সা.) নবুওতপ্রাপ্ত হয়েছেন।
তৃতীয় দিক : আল্লাহর রসুল (সা.) প্রিয় মাতৃভূমি মক্কাতুল মোকাররমা ছেড়ে মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরত করেন এবং যেদিন তিনি মদিনায় পৌঁছান তা ছিল সোমবার ১২ রবিউল আউয়াল।
চতুর্থ দিক : রসুল (সা.) বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর আরোপিত রিসালাতের দায়িত্ব পালন শেষে দীন-ইসলাম পূর্ণতার মাধ্যমে নিজের প্রভুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাঁর সান্নিধ্যে চলে যান। রবিউল আউয়ালে সুনির্দিষ্ট কোনো আমলের কথা কোরআন সুন্নাহে পাওয়া যায় না। আমাদের জীবনের মৌলিক লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে আল্লাহ প্রদত্ত শরিয়ার অনুসরণের বিকল্প নেই। সুতরাং রবিউল আউয়ালে এবং সারা বছরই আমাদের জন্য বিদআত পরিহার করে সুন্নাহ বা শরিয়ার যথার্থ অনুসরণ করা জরুরি।
রবিউল আউয়ালের বিশেষ করণীয়
এক. রবিউল আউয়ালে অন্যান্য মাসের মতো সোম ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখা।
দুই. আইয়ামে বিয তথা মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখ রোজা রাখা।
তিন. অধিক পরিমাণে দরুদ শরিফ পাঠ করা।
চার. গভীর অভিনিবেশে সিরাত পাঠ করা। কমপক্ষে নির্ভরযোগ্য একটি সিরাতগ্রন্থের শুরু থেকে শেষ পাঠ করা।
পাঁচ. সিরাতের শিক্ষা নিজের মাঝে ধারণ করা ও অন্যের মাঝে ছড়িয়ে দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া।
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া গাফুরিয়া মাখযানুল উলুম টঙ্গী, গাজীপুর