সান্জীদা খালা ক্ষমা করবেন। সান্জীদা খাতুন আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। কথাটা বলা যত সহজ লেখাটা তত কঠিন। তিনি চলে গেছেন, তাঁর জন্য দুঃখ করছি, কান্না করছি, তাঁকে নিয়ে লেখার চেষ্টা করছি। কিন্তু খালা তো এই শহরেই ছিলেন, তাঁকে কি দেখতে গেছি কোনো দিন? গত কয়েক বছরে খালাকে একটিবারের জন্যও দেখতে যাইনি। কারও সঙ্গে দেখা হলে জিজ্ঞেস করেছি, সান্জীদা খালা কেমন আছেন? এই এতটুকুই। আমি খুব ছোটবেলা থেকেই সান্জীদা খালাকে আমাদের বাসায় দেখি। তিনি আমার মায়ের বন্ধু ছিলেন। দুজনের মধ্যে নানা ধরনের আলাপ হতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। সান্জীদা খাতুন রবীন্দ্রসাহিত্যের প্রতিটি শাখায় জ্ঞাত ছিলেন। যেমন কবিতায়, তেমনি গান, গল্প, উপন্যাসে। তাঁকে রবীন্দ্র এনসাক্লোপিডিয়া বললেও অত্যুক্তি হবে না।
এ ব্যাপারে একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। একবার আমীরুলের কাছ থেকে একটি গল্প শুনেছিলাম-
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনে শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান শুরু করেছেন। নাম চারুপাঠ। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থাপনার লিঙ্কের জন্য সায়ীদ স্যার রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার অংশ বিশেষ উদ্ধৃত করবেন। কবিতাটি হলো-
বহুদিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শীষের ওপর
একটি শিশির বিন্দু।
কবিতাটি সবারই প্রায় মুখস্থ। দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া পঙ্্ক্তিটা প্রায় প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয়েছে। কিন্তু কবিতাটার নাম কী? কোন কাব্যগ্রন্থে কবিতাটি আছে? কবিতাটির কি আরও পঙ্ক্তি আছে? ইত্যাদি নানা প্রশ্ন স্যারের মনে। পুরোপুরি না জেনে তো কবিতাটা উপস্থাপনায় উল্লেখ করা যাবে না।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের শিক্ষার্থীদের অনেককে স্যার জিজ্ঞেস করলেন। কেউ সঠিক তথ্য দিতে পারল না। সায়ীদ স্যার টেলিভিশনেও অনেকের সঙ্গে আলাপ করলেন। আশ্চর্যের ব্যাপার কেউ সঠিক তথ্য-উপাত্ত দিতে পারল না। কবিতাটা সম্পর্কে সবারই ভাসা ভাসা ধারণা।
তাঁর দুই প্রিয় ছাত্র আমীরুল আর মাযহার সঙ্গে আছে। চারুপাঠ অনুষ্ঠানে আমীরুল ছিল প্রধান সহকারী।
স্যার বললেন, কিহে কবিতাটার কোনো কূলকিনারা হলো?
না স্যার।
হাঁ-তোমরা তো আর রবীন্দ্রনাথ পড়লে না মন দিয়ে। কীভাবে কী হবে? একদিন দেখা যাবে এই সমাজে কেউ নেই যে রবীন্দ্রনাথকে কিছুটা জানে। জনপ্রিয় কয়েকটা রবীন্দ্রসংগীতের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকবেন। কবি রবীন্দ্রনাথের কবিতা নিয়ে কোনো আগ্রহ থাকবে না।
তারপর সায়ীদ স্যার বললেন,
চলো সান্জীদা আপার বাড়ি যাই।
সান্জীদা আপা মানে বিখ্যাত সান্জীদা খাতুন। সায়ীদ স্যারের ছোট্ট কিয়াই গাড়িতে মাযহার আর আমীরুল চড়ে বসল। চার তলা দালান। সান্জীদা খালা থাকেন তিন তলায়।
স্যার তিন তলা পর্যন্ত উঠলেন। সায়ীদ স্যার সান্জীদা খাতুনের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন,
থাক চলো চলে যাই। আপা খুব মেজাজি মানুষ। আমাদের সরাসরি শিক্ষক। কখন কী বলে ফেলে ঠিক নেই। এই বয়সে আর বকা খেতে ভালো লাগে না।
আমীরুল আর মাযহার অবাক হয়ে স্যারের দিকে তাকিয়ে আছে। স্যারকে এমন বিব্রত হতে কখনো দেখেনি তারা।
সায়ীদ স্যার কয়েক পা নামলেন। আবার দরজার দিকে তাকালেন।
না। আপা ছাড়া রবীন্দ্রনাথকে কে আর তেমন করে পড়েছেন। চলো যাই, আপার কাছে যাই। আর মনজুরে মাওলার কাছে। মাওলাও রবীন্দ্রনাথকে পুরো আত্মস্থ করেছে।
তারপর দ্বিধা কাটিয়ে স্যার প্রবেশ করলেন সান্জীদা খাতুনের বাসায়। সায়ীদ স্যার আপার ড্রইংরুমে বসে আছেন। হালকা সবুজ রঙের শাড়ি পরনে। নিপাট চেহারা। লাবণ্যমাখা মুখশ্রী।
আপা আপনার বাসায় ছাত্র বয়সে গান শুনতে আসতাম। আমি আর মান্নান সৈয়দ। আপনার মনে আছে?
আপার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি।
সায়ীদ স্যার তখন বললেন, আপা বহুদিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে- কবিতাটি কোথায় পাব?
আপা গম্ভীরভাবে তাকালেন স্যারের দিকে।
এটা পূর্ণাঙ্গ কোনো কবিতা নয়। এটা রবীন্দ্রনাথ বালক সত্যজিৎ রায়কে অটোগ্রাফ দিয়েছিলেন। সত্যজিৎ রায় তখন শান্তিনিকেতনে পড়তে গিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ সত্যজিৎ রায়কে ডাক নাম মানিক বলেই ডাকতেন। কারণ সত্যজিৎ রায়ের বাবা ছড়া সম্রাট সুকুমার রায় ছিলেন রবীন্দ্রনাথের অনুজ বন্ধু। সেই মানিককে অটোগ্রাফ দিতে গিয়ে এই অমর পঙ্ক্তিগুলো রবীন্দ্রনাথ লিখে দেন।
তারপর সান্জীদা খাতুন গভীরভাবে সায়ীদ স্যারকে বললেন,
সায়ীদ, তোমরা কেউই ভালো মতো রবীন্দ্রনাথ পাঠ করলে না। করা উচিত ছিল।
সায়ীদ স্যার মাথা নামিয়ে রইলেন।
এই হলেন সান্জীদা খাতুন। রবীন্দ্রনাথ নিয়ে যে কোনো জায়গায় যে কোনো বিষয়ে তাঁর মতো পাণ্ডিত্যময় ভাষণ তিনিই দিতে পারেন। পয়লা বৈশাখে ছায়ানটের যে অনুষ্ঠান হয় সেখানে সান্জীদা খাতুন একটি বক্তব্য দেন সেই বক্তব্যে কী পাণ্ডিত্য থাকে সেটা না শুনলে কেউ বুঝতে পারবেন না। রমনার বটমূলে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ থাকেন তারা অবশ্যই অনুধাবন করতে পারেন সান্জীদা খাতুন কী বলতে চেয়েছেন। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর কথা শোনেন। এ বছর আমরা তাঁর সেই মিষ্টি কণ্ঠে পাণ্ডিত্যময় বক্তব্য শুনতে পাব না এটা আমাদের জন্য কষ্টের, দুঃখের। তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত অনেক দিন শুনি না। রেডিও, টেলিভিশনের আর্কাইভে তাঁর গানের রেকর্ড রয়ে গেছে, তারা সেগুলো প্রচার করেন। ছায়ানট প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬১ সালে। সেই ছায়ানটকে তিনি বিশাল মহিরুহ রূপে পরিণত করেছেন। সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছায়ানটের শিল্পীরা শুধু রবীন্দ্রসংগীত নয়, তারা শুদ্ধ সংগীতচর্চা করে যাচ্ছেন। সান্জীদা খালা আজীবন চেষ্টা করে গেছেন একটি শিশু যেন মানুষ হয়ে বড় হয়ে ওঠে। সততার সঙ্গে বড় হয়। শিশু যেন শ্রেণিশিক্ষার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসে। শিল্পসাহিত্যকে ভালোবাসে। ছায়ানট ভবন তৈরি করেছিলেন সেই স্বপ্ন নিয়ে। এখানে যারা আসবে তারা একটি নতুন স্বপ্ন নিয়ে বড় হবে। একজন ভালো মানুষ হওয়ার স্বপ্ন। তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। সান্জীদা খাতুন আর ছায়ানট আসলে একই সূত্রে বাঁধা।
ছায়ানটের পয়লা বৈশাখের যে অনুষ্ঠান সেটি চ্যানেল আই প্রচার করেছিল। বাংলাদেশ টেলিভিশনও প্রচার করে আসছে। এ অনুষ্ঠান প্রচার নিয়ে সান্জীদা খালার সঙ্গে আমি এবং শাইখ সিরাজের একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। আমরা চেষ্টা করেছিলাম সেই ভুল বোঝাবুঝির অবসান করতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা সেটি পারিনি। আজ খালা যখন আমাদের মাঝ থেকে চলে গেলেন, তখন বলতে চাই সান্জীদা খালা আপনার প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসার কোনো কমতি নেই। নির্দি¦ধায় বলতে পারি সান্জীদা খালা আপনার মনে যদি কোনো কষ্ট দিয়ে থাকি তাহলে আমাদের ক্ষমা করবেন। খালা আপনাকে আমরা ভালোবাসি।
লেখক : গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব