প্রতিনিয়ত দেশে আসছে প্রবাসীদের ঘামঝরানো কষ্টার্জিত রেমিট্যান্স, যা দেশ গঠনে রাখছে বড় ভূমিকা। দেশের অর্থনীতি যখন সামষ্টিক চাপে বিপর্যস্ত, তখন রেমিট্যান্সপ্রবাহ নিয়ে এসেছে স্বস্তির বার্তা। আর এ কৃতিত্বের হিরো প্রবাসীরাই। অর্থাৎ দেশের ডলারসংকট সমাধানে প্রবাসী বাংলাদেশিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের গতি। রমজান উপলক্ষে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে রেকর্ড পরিমাণ প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এসেছে দেশে। এর আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে ফেব্রুয়ারিতে এত পরিমাণ রেমিট্যান্স আসেনি। মূলত এ মাসে দিনের সংখ্যা কম হওয়ায় রেমিট্যান্সও কম থাকে। কিন্তু এবার রমজান উপলক্ষে ফেব্রুয়ারি মাসে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি চোখে পড়ার মতো। অর্থাৎ ব্যাংকিং চ্যানেলে ২৫২ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে ফেব্রুয়ারিতে, যা দেশীয় মুদ্রায় ৩১ হাজার ৯৪ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে)। সে হিসাবে দৈনিক গড়ে ৯ কোটি ডলার বা ১ হাজার ১১০ কোটি টাকা রেমিট্যান্স এসেছে। উল্লেখ্য যে গত বছরের একই মাসের তুলনায় ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অর্থাৎ গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ২০২ কোটি ডলার
নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দিন দিন রেমিট্যান্সের প্রবাহ যেন বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাইয়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১৯১ কোটি ৩৭ লাখ ৭০ হাজার ডলার। তার পরের মাস আগস্টে আসে ২২২ কোটি ১৩ লাখ ২০ হাজার ডলার, সেপ্টেম্বরে ২৪০ কোটি ৪১ লাখ ডলার, অক্টোবরে ২৩৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার, নভেম্বরে ২২০ কোটি ডলার, ডিসেম্বরে ২৬৪ কোটি ডলার, জানুয়ারিতে ২১৯ কোটি ডলার এবং ফেব্রুয়ারিতে ২৫২ কোটি ৮০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। সে হিসাবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের টানা সাত মাসে দুই বিলিয়নেরও বেশি প্রবাসী আয় এসেছে দেশে। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি মার্চে দেশে রেমিট্যান্সপ্রবাহে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হবে। সে ক্ষেত্রে গত ডিসেম্বরে গড়া সর্বোচ্চ রেকর্ডও ছাড়িয়ে যেতে পারে। কারণ মার্চের শেষদিকে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে। রমজান ও ঈদ উপলক্ষে প্রবাসীরা সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পাঠান।
দেশের রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে, রেমিট্যান্সপ্রবাহের ইতিবাচক প্রভাবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বাড়ছে। বর্তমানে রিজার্ভের পরিমাণ ২০ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ ম্যানুয়াল অনুযায়ী, এ হিসাব করা হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবে মোট রিজার্ভ ২৬ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেকটি সূত্র থেকে জানা গেছে, এখন প্রবাসীরা বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত হচ্ছেন। বৈধ পথে রেমিট্যান্স আসার পেছনে সচেতনতা কাজ করছে। আবার বৈধ পথে ডলারের দরবৃদ্ধিতে হুন্ডি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন তাঁরা। এতে বাড়ছে রেমিট্যান্স আসার গতি। আরও বেশি পরিমাণ প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স আসবে বলেও তাঁরা আশা প্রকাশ করেন।
প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স, আজকের বিশ্বে উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য এক চালিকাশক্তি। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যখন আর্থিক সংকট নেমে আসে, তখন প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স হয়ে ওঠে অর্থনীতির জন্য অক্সিজেন। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। আমাদের দেশের অর্থনীতির বড় একটি অংশ নির্ভর করে প্রবাসী আয়ের ওপর। বর্তমানে বিশ্বের ১৭৬টি দেশে প্রায় ১ কোটি ৫৭ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত, যাঁরা প্রতি বছর গড়ে ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশে পাঠান। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তাঁদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ ছিল মোট ২ হাজার ৩৯২ কোটি ডলার।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে প্রবাসীদের এ বিপুল পরিমাণ কষ্টার্জিত অর্থ? এ ব্যাপারে মানুষের একটা সাধারণ ধারণা রয়েছে যে প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্সের অর্থ ভোগবিলাসে ব্যয় হচ্ছে। আসলে এর সবটাই কি ভোগবিলাসে ব্যয় হচ্ছে? কিছুই কি সঞ্চয় হিসেবে থাকছে না? বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে এর কিছু তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেখা গেছে যে প্রবাসী রেমিট্যান্স আয় বাবদ খাদ্য ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে যে বিনিয়োগ হয় তার বেশির ভাগই যায় অনুৎপাদনশীল খাতে। অর্থাৎ মোট রেমিট্যান্সের মধ্যে ৭৪.৬৮ শতাংশই কোনো উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হয় না। এগুলোর মধ্যে রয়েছে কাপড়চোপড়, তেল-সাবান, বিভিন্ন প্রসাধনী দ্রব্য থেকে শুরু করে নানা বিলাসী পণ্য, যেমন ফ্রিজ, টেলিভিশন, খাট, সোফাসেটসহ নানান সামগ্রী। বাকি ২৫.৩২ শতাংশ অর্থ পরোক্ষভাবে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ হয়। এর মধ্যে ১৭ শতাংশ অর্থ জমিজমা, ফ্ল্যাট কেনায় ও বাড়িঘর নির্মাণে ব্যয় হয়।
গত কয়েক বছরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে বছরের অন্য সময়ের তুলনায় রোজা ও ঈদের সময় সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে। যদিও ঈদের পরের মাসে তা আবার কমে আসে। ঈদের সময় যে পরিমাণ রেমিট্যান্স আসে তার বেশির ভাগ অর্থাৎ ৯০ শতাংশই ব্যয় করা হয় ভোগবিলাসে। বছরের অন্য সময় অবশ্য বিলাসিতায় এতটা খরচ হয় না। পরিসংখ্যান জরিপে আরও উঠে এসেছে যে প্রবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি পরিবার প্রাপ্ত অর্থ থেকে কমবেশি সঞ্চয় করে থাকে। এ ধরনের পরিবারের গড় হার প্রায় ৫৭ শতাংশ। তবে বিভাগওয়ারী এ হার ভিন্ন ভিন্ন। যেমন প্রবাসী আয় থেকে সঞ্চয় করে এমন পরিবারের সংখ্যা সবচেয়ে কম সিলেটে। বরিশালে এ হার সবচেয়ে বেশি। আবার যাঁরা ঋণ নিয়ে প্রবাসে গেছেন, ওই পরিবারগুলোতে সঞ্চয়ের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে প্রবাসীরা দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন। কিন্তু তাদের ঘামঝরানো এ আয়ের বড় অংশই ভোগবিলাসে ব্যয় হচ্ছে। আর বিনিয়োগ বলতে যা বোঝায় তা হলো জমিজমা কেনা ও ঘরবাড়ি নির্মাণ। অর্থাৎ প্রবাসী আয়ে এমন কোনো বিনিয়োগ হয় না, যার মাধ্যমে কর্মসংস্থান হয়। প্রবাসীদের এ রেমিট্যান্স আয় যদি পরিকল্পিতভাবে উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা যেত তাহলে আমাদের অর্থনীতি আরও দ্রুত এগিয়ে যেত। কাজেই আহরিত রেমিট্যান্স বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়ে আসার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি প্রবাসী পরিবারগুলো তাদের বেসিক চাহিদা মেটানোর পর হাতে যে উদ্বৃত্ত অর্থ থাকে তা যাতে তারা নিরাপদে ও সহজে বিনিয়োগ করতে পারে, সে লক্ষ্যে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া বাঞ্ছনীয় বলে মনে করি।
বিগত সরকারের সময় রেমিট্যান্সযোদ্ধারা ছিলেন অনেকটাই অবহেলিত। প্রবাসীদের মর্যাদা তো দূরের কথা বিমানবন্দরে তাঁদের নানারকম ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হতো। তাঁদের শ্রম-ঘাম, অর্থে কেনা জিনিসপত্র বিমানবন্দর থেকে প্রায়ই চুরি হয়ে যেত। এ ছাড়াও কোনো প্রবাসী বিদেশে মারা গেলে তাঁদের লাশ দেশে আনতে নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়। অথচ এ রেমিট্যান্সযোদ্ধারাই বছরের পর বছর রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছেন। ছাত্র-জনতার গণ অভ্যুত্থানের পর তাই প্রবাসীরা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে শ্রম খাত সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। প্রবাসীরা যাতে সত্যি সত্যিই রেমিট্যান্সযোদ্ধার মর্যাদা পান সে প্রত্যাশাই আমরা কামনা করছি।
লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক