গ্রীষ্মে সূর্যের প্রখর রোদ ও বর্ষায় খেয়া এবং শীতে ঘন কুয়াশা ভেদ করে চরাঞ্চলে রাশি রাশি বালু মাড়িয়ে নিদারুণ কষ্টে দীর্ঘদিন ধরে চলাচল করছেন ২৪ গ্রামের হাজার হাজার মানুষ। খরস্রোতা ধলেশ্বরী নদী পুরো একটি ইউনিয়নকে দ্বীপে পরিণত করে রেখেছে। একটি সেতুর অভাবে মূলস্রোতধারার বাইরে রয়েছে হাজার হাজার মানুষ। টাঙ্গাইল সদর উপজেলার মাহমুদনগর ইউনিয়নের এ চিত্র।
টাঙ্গাইল শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার পশ্চিমে ২৪টি গ্রাম নিয়ে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ইউনিয়ন মাহমুদনগর। প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৪ সালে। ৮ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এ ইউনিয়নে ৪ হাজার ২০০টি পরিবারের বসবাস। নদীর পলিমাটির ৫ হাজার ১২৫ একর আবাদি জমি এবং ১৫টি বিল নিয়ে জলধারা রয়েছে ২২টি।
জানা যায়, টাঙ্গাইল সদর উপজেলার কাতুলী ইউনিয়ন সংলগ্ন গোলচত্বর থেকে ধলেশ্বরী নদী পাড়ি দিয়ে মাহমুদনগরের মাকোরকোল গ্রামে যেতে হয়। গোলচত্বর ও মাকোরকোলের মাঝখান দিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার প্রশস্ত ধলেশ্বরী নদী। মাহমুদনগর ইউনিয়নের ছাত্রছাত্রী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীসহ সিরাজগঞ্জের চৌহালী, নাগরপুরের ভাড়রা ইউনিয়নের পশ্চিম অংশের হাজারো মানুষের চলাচলের একমাত্র রাস্তা। মাঝখানে প্রায় এক কিলোমিটার প্রস্থের ধলেশ্বরী নদী। ওই এক কিলোমিটারে গ্রীষ্মকালে ধু-ধু বালুচর, বর্ষায় শুধু পানি আর পানি এবং শীতকালে ঘন কুয়াশার রাজত্ব থাকে। এ অঞ্চলের মানুষ ওই এক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে চরম ভোগান্তির শিকার হয়। অসুস্থ রোগীকে জরুরি প্রয়োজনে জেলা সদরে নিতে না পেরে অনেকে অকালে জীবনও হারিয়েছে। স্থানীয়রা গোলচত্বর থেকে মাকোরকোলে ধলেশ্বরী নদীতে একটি সেতুর দাবি করছেন। কিন্তু বারবার জনপ্রতিনিধিদের কাছে ওই দাবি উপেক্ষিতই হয়েছে।
মাহমুদনগর ইউনিয়নের সিঙ্গাপুর প্রবাসী সাবেক ছাত্রনেতা রিফাতুল ইসলাম রিপন জানান, একটা সেতুর অভাবে মাহমুদনগর ইউনিয়নবাসীকে দীর্ঘকাল ধরে অবহেলিত থাকতে হচ্ছে। ফলে এ এলাকার জীবনযাত্রার মান মূলধারার জীবনমানের সঙ্গে খাপ খায় না। তিনি আরও জানান, ৩০ হাজার মানুষের স্বাস্থ্য সেবার জন্য ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রই একমাত্র ভরসা।
স্থানীয় কৃষক মুন্নাফ আলী, আবদুল জব্বার, আরফান আলীসহ অনেকেই জানান, ধলেশ্বরী নদীতে সেতু না থাকায় তারা কৃষিপণ্য চাষ করেও ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। সেতুর অভাবে উৎপাদিত ফসল বিক্রির জন্য সময়মতো বাজারে নিয়ে যেতে পারেন না। স্থানীয় ভ্যানচালক শরিফুল ইসলাম জানান, বর্ষায় নদী পথে নৌকায় ভ্যান উঠানো আবার অন্য সময়ে বালুপথে ভ্যান চালানো খুবই কষ্টকর। বর্ষায় খেয়া নৌকায় ভ্যান উঠাতে অনেক সময় নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। মাকোরকোল এলাকার রাওয়ান বিবি জানান, ধলেশ্বরী নদীর ওপর সেতু নির্মাণের দাবি দীর্ঘ দিনের। জনপ্রতিনিধিরা বারবার আশ্বাস দিলেও এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
টাঙ্গাইল এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ কামরুজ্জামান জানান, গোলচত্বরের ওখানে ধলেশ্বরী নদীর ওপর সেতু নির্মাণের বিষয়ে আলোচনা ও প্রাথমিক পরিমাপ করা হয়েছে। প্রায় এক কিলোমিটার প্রস্থের ধলেশ্বরী নদীতে সেতু নির্মাণে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। অচিরেই প্রাথমিক প্রাক্কলন করে অনুমোদনের জন্য এলজিইডি ভবনে প্রস্তাব পাঠানো হবে। অনুমোদন ও অর্থপ্রাপ্তি সাপেক্ষে সেতু নির্মাণে উদ্যোগ নেওয়া হবে।