২০২৪ সালের শুরুতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে প্রথম শহীদ আবু সাঈদ, তার আত্মত্যাগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন এক গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তরিত হয়। রংপুরের একজন সাধারণ ছাত্র আবু সাঈদ, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সেই দীর্ঘ সংগ্রামী ধারার প্রতিফলন...
১৯৭১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রতিটি আন্দোলন ও সংগ্রামে উত্তরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের অসামান্য অবদান ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে আছে। শহীদ শঙ্কু সমজদার থেকে শহীদ আবু সাঈদ এই দীর্ঘ যাত্রাপথে উত্তরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগ আমাদের জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের শিখাকে প্রজ্বলিত করেছে এবং তা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রতিটি কোণে। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চের সেই ঘটনাটি আজও জ্বলজ্বল করছে আমাদের স্মৃতিতে। কৈলাশ রঞ্জন উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র, ১২ বছরের কিশোর শঙ্কু সমজদার, বড় ভাইয়ের হাত ধরে মিছিলে গিয়েছিলেন রংপুরের রাজপথে। সেই মিছিলে পাকিস্তানি হানাদারদের গুলিতে চোখে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে তিনি শহীদ হন। শঙ্কুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে রংপুরের জনতা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। সেই দিনই অবাঙালির গুলিতে রংপুর কলেজের ছাত্র আবুল কালাম আজাদ এবং ওমর আলী নামের একজন শহীদ হন। এই তিন শহীদের আত্মত্যাগ সারা দেশে স্বাধীনতার আগুন জ্বেলে দেয়। ২০২৪ সালের শুরুতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে প্রথম শহীদ আবু সাঈদ, তার আত্মত্যাগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন এক গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তরিত হয়। রংপুরের একজন সাধারণ ছাত্র আবু সাঈদ, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সেই দীর্ঘ সংগ্রামী ধারার প্রতিফলন, যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত বিস্তৃত। তিনি ছিলেন বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক অকুতোভয় সংগ্রামী, যার নেতৃত্ব ও সাহসিকতা তার সহপাঠীদের মধ্যে প্রেরণার সঞ্চার করেছিল। আন্দোলনের শুরুতে শিক্ষার্থীরা বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করছিল। আবু সাঈদ ছিলেন সেই মিছিলের অগ্রভাগে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা উচিত। আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আবু সাঈদের এই নির্মম হত্যার খবর মুহূর্তেই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রবল ক্ষোভের সৃষ্টি করে। সারা দেশের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাদের দাবি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরে। এই আন্দোলনের উত্তাপে উত্তরাঞ্চলের আরও ১০ জন শিক্ষার্থী এবং সারা দেশে শত শত ছাত্র-জনতা শহীদ হন। যারা তাদের জীবন উৎসর্গ করে আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করেন। (তথ্যসূত্র : বই-‘জেনারেশন জেড ও অভ্যুত্থান’)
আবু সাঈদ এবং অন্য শহীদদের এই আত্মত্যাগ শুধু একটি আন্দোলনের সফলতা এনে দেয়নি, বরং এটি দেশের মানুষকে একটি নতুন স্বপ্ন দেখার সাহস দিয়েছে। ১৯৭১ সালে শহীদ শঙ্কু সমজদারের আত্মত্যাগ যেমন মুক্তিযুদ্ধের শিখা প্রজ্বলিত করেছিল, তেমনি ২০২৪ সালে আবু সাঈদের আত্মত্যাগ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নতুন শক্তি ও উদ্দীপনা জোগায়। চব্বিশের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং পরে ছাত্র-জনতার গণআন্দোলন ছিল উত্তরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি যুগান্তকারী অধ্যায়, যেখানে তারা পুনরায় প্রমাণ করেছে যে, তাদের রক্তেই বহমান সংগ্রামের ঐতিহ্য। এই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে যে সাহসিকতা দেখিয়েছে, তা উত্তরাঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধকালীন সংগ্রামের মতোই অনবদ্য। আবু সাঈদের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীরা কেবল আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেনি, তারা জীবন উৎসর্গ করে এই আন্দোলনকে এক ঐতিহাসিক সাফল্যের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে।
শিক্ষার্থীদের এই গণঅভ্যুত্থানের ফলস্বরূপ দেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়, যার নেতৃত্বে রয়েছেন নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সাত মাস ধরে শিক্ষার্থীদের অর্জন অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করলেও উত্তরাঞ্চলের জনগণ প্রত্যাশিত সুফল থেকে অনেকটাই বঞ্চিত রয়ে গেছে। আবু সাঈদের শহর রংপুর আজও উন্নয়ন পরিকল্পনার মূলধারায় প্রবেশ করতে পারেনি।
যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে আবু সাঈদ তার রক্ত দিয়ে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন, সেই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় আজও সমতার সোপানে পৌঁছাতে পারেনি। উন্নয়ন ও সুযোগ-সুবিধার বিচারে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য এই প্রতিষ্ঠানটির জন্য প্রয়োজন অনেক বড় অংকের বরাদ্দ। বিগত দিনগুলোতে যথেষ্ট বরাদ্দের অভাবে কাক্সিক্ষত পরিসরে সম্প্রসারিত হয়নি একাডেমিক ভবন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিংবা আধুনিক সুযোগসুবিধা। কিছু প্রকল্প পরিকল্পনার আওতায় থাকলেও বাস্তবায়নের গতি এতটাই ধীর যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশার সঞ্চার হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের মানুষ তাদের প্রাপ্য উন্নয়ন দেখে যেতে চায়, তারা কেবল পরিকল্পনার খসড়ায় আটকে থাকতে চায় না।
স্বাধীনতার পর যেভাবে এই অঞ্চল অবহেলার শিকার হয়েছিল, ঠিক তেমনি জুলাই বিপ্লবের পরও উত্তরাঞ্চলের মানুষ সেই একই বঞ্চনার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু ইতিহাস বলে, এই জনপদ কখনো নতি স্বীকার করেনি।
লেখক : অধ্যাপক, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর