আমার শিক্ষার্থীরা যখন রাজপথে নেমেছে। তারা নিজের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে যখন দেশের মানুষের মুক্তি সংগ্রামে অংশ নিয়েছে। শিক্ষক হিসেবে তাদের একা রেখে চুপচাপ ঘরে বসে থাকতে পারিনি...
জীবনের কিছু মুহূর্ত আমাদের এমন অবস্থানে গিয়ে দাঁড় করায় যখন পাত্রাপাত্র জ্ঞান থাকে না। তখন মানুষের বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্তের বিপরীতের সহজাত প্রবৃত্তি সাড়া দেয় আগে। গত জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান আমাদের সবার জীবনে নিয়ে এসেছিল এমন সময়। আমার সন্তানের রক্ত ঝরছে। তারা দেশের গণমানুষের মুক্তির জন্য রাজপথে গিয়ে জীবন দিচ্ছে। এটা দেখার পর একজন বাবা হিসেবে নিশ্চুপ থাকতে পারিনি। আমার শিক্ষার্থীদের বুকে গুলি চালানো হচ্ছে এটা দেখার পর একজন শিক্ষক হিসেবে ঘরে বসে থাকার মতো কাপুরুষ ছিলাম না কোনো দিন।
অনেকে অহমবোধ নিয়ে পরিচয় দিয়ে থাকেন নিজ জন্মস্থান সম্পর্কে। কেউ কেউ বলে থাকেন জেলার মাটি নাকি কথা বলে। জানি না জুলাই-আগস্টে আমার জেলার মাটিও অজান্তে কথা বলেছিল নাকি। পাকিস্তানি বাহিনী আমাদের জনপদে আক্রমণ করে বসার পর অনেকে আত্মগোপনে গিয়েছিলেন। সবার সামনে প্রাণ বাঁচিয়ে রাখাটাই তখন ছিল বড় দায়। কিন্তু একজন মেজর গর্জে উঠেছিলেন উই রিভোল্ট বলে। আর তাঁর জন্মস্থান এবং আমার জেলা অভিন্ন হওয়াতেই কি না আমিও চুপ থাকতে পারিনি। আমি ভিতর থেকে তাগিদ অনুভব করেছি আমার ছেলেমেয়েদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। একজন বাবা হিসেবে মুক্ত স্বাধীন দেশ নিশ্চিত করতে হবে তাদের জন্য।
আমার শিক্ষার্থীরা যখন রাজপথে নেমেছে। তারা নিজের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে যখন দেশের মানুষের মুক্তি সংগ্রামে অংশ নিয়েছে। শিক্ষক হিসেবে তাদের একা রেখে চুপচাপ ঘরে বসে থাকতে পারিনি। মনের অজান্তেই মিশে গিয়েছিলাম তাদের বিপ্লবী স্রোতে। আমি এতটাই তাদের সংগ্রামে মিশে গিয়েছিলাম যে বুঝতে পারিনি তাদের সঙ্গে গলা ফাটিয়ে স্লোগান দিচ্ছি। পরে সেই সেøাগান দিতে দেখে পাশ থেকে একজন বর্ষীয়ান বললেন, ‘হাসনাত তুমি না একজন প্রফেসর। একজন প্রফেসর মানুষ এভাবে গলা ফাটিয়ে স্লোগান দেয় নাকি?’
শিক্ষার্থীদের সেই আন্দোলনে আমি এতটাই মিশে গিয়েছিলাম যে, ওই ভদ্রলোকের কথায় কর্ণপাত করিনি। পরে ভিডিও ভাইরাল হলে তা দেখে একটু অবাক এবং বিব্রতও হয়েছিলাম। আমি নিজেই ভাবছিলাম কোনো উত্তেজনার বশে এভাবে সেøাগান বেরিয়েছিল। এখন আমাকে শতবার অনুরোধ করা হলেও বাকি জীবনে হয়তো এভাবে এতটা উত্তেজনা নিয়ে স্লোগান দিতে পারব না। পরক্ষণেই ভাবি আমার মতো এমন হাজার লাখো মানুষ নিজের সত্তাকে হারিয়েছিলেন জুলাই-আগস্ট গণ অভ্যুত্থানের স্রোতে। তাদের সামনে লক্ষ্য একটাই- মাতৃভূমির মুক্তি অথবা মৃত্যু। তাদের পেছনে ফ্যাসিবাদের ঘোর অন্ধকার আর সামনে থেকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ। তবে সেই বাংলাদেশের রং অনেক লাল। আমার সন্তান আবু সাঈদ, ওয়াসিম আকরাম, মীর মুগ্ধ, ইয়ামিনসহ আরও অনেকের তাজা রক্ত মিশে এতটা টকটকে লাল হয়েছে এ বাংলাদেশ। ওই বাংলাদেশ আমাদের চোখে নেশা জাগিয়েছিল। আমাদের নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছিল নিজের সম্পর্কে।
আমার শিক্ষক পরিচয়ের আড়ালে হারিয়ে যেতে থাকা একজন বাবা তখন চিৎকার দিয়ে ডাকছিল। বিবেক আমাকে বাধ্য করেছিল সেই ডাকে সাড়া দিতে। যদি কাপুরুষ না হই আমার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য একটা মুক্ত স্বাধীন দেশের হাতছানি উপেক্ষা করি সেই সাধ্য ছিল না। তাই তো শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিলেমিশে আমিও বলেছিলাম ‘ক্ষমতা না জনতা’!! জনতা জনতা। দালালি না রাজপথ!! রাজপথ!! রাজপথ!!’।
টেলিভিশন টকশোতে নিয়মিত গিয়ে পতিত স্বৈরাচারের গোষ্ঠী উদ্ধার করে চলেছি তখনো। আবার আত্মীয়স্বজন আর শুভানুধ্যায়ীদের শত নিষেধ উপেক্ষা করেও আমি যুক্ত থেকেছি বিভিন্ন অনলাইন সংলাপে। ফ্যাসিস্টের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে যখন গিয়েছি বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে তখন এক অর্থে মাথায় কাফন বেঁধেই নেমেছিলাম। পরিবারের কাছে যতটাই আশার বাণী উচ্চারণ করি, আমি ঠিকই জানতাম আজকের টকশো শেষ হওয়ার পর কোনো একটা কালো কাচঘেরা গাড়িতে তুলে নিতে পারে। তারপর আমার ঠিকানাটাও হতে পারে আয়নাঘরের অন্ধ কুঠুরিতে। কিংবা তারা আয়নাঘরে নেওয়ার বিলাসিতা না করে আমার গাড়িটার উপর একটা ভারী ট্রাক তুলে দিলেই ঝামেলা শেষ। আর সে জন্যই কারফিউ উপেক্ষা করে রাস্তায় নামাটা আমার জন্য ছিল ডাল-ভাত।
আবার ফিরে যাই সেই মুরুব্বির বক্তব্যে। উনি জানতে চেয়েছিলেন প্রফেসর মানুষ এভাবে গলা ফাটিয়ে সেøাগান দেয় নাকি? আমি বিশ্বাস করি আগে মানুষ তারপর প্রফেসর আর এ জন্যই চল্লিশ বছর আগের স্মৃতি হঠাৎ ফিরে এসেছিল আমার অজান্তেই। তখন রাজপথের নানা সংগ্রামে বন্ধুদের মাঝে আমি বেশ ভালো সেøাগান দিতাম। তাই তারা যে কোনো মিছিল সমাবেশ হলেই জোর করে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিত মাঝখানে। কিন্ত সেটা আমার জীবনে হারিয়ে যাওয়া এক গল্প ছিল।
ঝাঁ চকচকে ছুরি কোথাও ফেলে রাখলে সেটা একটা সময় জং ধরে যায়। আর সেখানে এতদিন আগের সেই অভ্যাস ভুলে যাওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হওয়ার পর পরিবেশটা হঠাৎ করে বদলে গিয়েছিল আমাদের সবার জন্য। আমি দেখলাম অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী একজন স্বৈরাচার ক্ষমতায় চেপে বসেছে ভূতের মতো। সে তার খুনি বাহিনী লেলিয়ে দিয়ে আঘাত করছে আমার সন্তানের গায়ে। আমার মেয়ের বয়সি অনেকে যখন খুনি হাসিনার পেটোয়া বাহিনীর কাছে নিগ্রহের শিকার তখন চুপ থাকতে পারিনি। আমার সন্তানদের যখন নির্বিচার রাজাকার বলে অপমান করা হলো, আমি তাদের প্রতিবাদ করতে দেখলাম অন্যভাবে। তারা যখন চিৎকার দিয়ে বলছে- ‘তুমি কে আমি কে? রাজাকার রাজাকার। কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার স্বৈরাচার।’ তখন মনে হয়েছে এতদিনে ভোট ডাকাতটাকে কেউ উপযুক্ত জবাব দিতে পারছে। তাদের সেই সেøাগান আর দ্রোহ আরও অনেকের মতো আমারও রক্তে আগুন লাগিয়েছিল। তাই তো ছাত্রদের ঘোষিত প্রতিটি আন্দোলনে আমি গিয়েছি ঠিক তাদের নির্দেশনা মেনে। আমি চোখ বন্ধ করলে এখনো স্পষ্ট দেখতে পাই জুলাইয়ের আগুনঝরা সেই সময়। ডামি ইলেকশনের পর ফুরফুরে মেজাজে থাকা অবৈধ প্রধানমন্ত্রীর সেই বিশ্রী মন্তব্য। তারপর তার তীব্র প্রতিক্রিয়া হিসেবে আন্দোলনকারীদের ফুঁসে ওঠা। শিক্ষার্থীরা বিরক্ত হয়ে ব্যঙ্গ করে বলছে ‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার; কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার’ এবং ‘চেয়েছিলাম/চাইতে গেলাম অধিকার; হয়ে গেলাম রাজাকার।’ তারা একটা একটা করে স্লোগান দেয় আর আমি গুনতে শুরু করি স্বৈরাচারী হাসিনার ক্ষমতা থেকে একটা একটা ইট খুলে নিচ্ছে আমার সন্তানরা। এবার তার পরাজয় সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর তখন থেকেই আমি আমার সন্তানের সঙ্গে পথে নেমেছি।
সেই ভয়াল ১৫ জুলাই। আওয়ামী লীগের দালাল সরকারি কর্মকর্তা ও ভোট ডাকাত মন্ত্রীদের অনেকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কটাক্ষ করে। তারা তাদের বিরুদ্ধে সেই ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নষ্ট করার ধিকৃত অভিযোগ আনে। হাসিনার নব্য রক্ষীবাহিনী ছাত্রলীগের হায়েনারা ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার অসহায় সন্তানদের ওপর। তারা যখন আমার সন্তানদের ওপর রড, লাঠি, হকিস্টিক, রামদা, আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা করে তখন তাদের প্রতিবাদ ও প্রতিহত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব হয়ে গিয়েছিল। আমি অবাক হয়ে দেখি যে, পুলিশের দায়িত্ব জনগণের নিরাপত্তা বিধান করা, সেই পুলিশও লাঠি, টিয়ারশেল, রাবার বুলেট এমনকি সরাসরি স্টিল বুলেট দিয়ে হামলা শুরু করে। শুরুতে শান্তিপ্রিয় শিক্ষার্থীদের ওপর তারা মনের সুখে আক্রমণ করে গিয়েছে। আমার সন্তান আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে মহান বীরের মতো জীবন দিয়ে প্রমাণ করে যায় আমাদের আর নিরস্ত্র থাকার সুযোগ নেই। আমাদের আর নীরবে সব সহ্য করার দিন শেষ হয়ে গেছে। তাই হায়েনা বাহিনীর হামলার প্রতিবাদে আমার ছেলেমেয়েরাও তখন তাদের দিকে ইটের টুকরা ছুড়তে থাকে।
আমি খেয়াল করে দেখি ১৬ জুলাই থেকে আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। আমাদের বীর সন্তানরা হায়েনা বাহিনীকে রাজপথ থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছে। ১৬ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ আবু সাঈদ যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল তার সামনে দাঁড়ানোর সাহস ফ্যাসিস্ট হাসিনার ছিল না। তার পুলিশের গুলিতে আমাদের সন্তানদের মৃত্যুসংবাদ প্রতিটি অভিভাবকের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে। তার হম্বিতম্বি করে ক্ষমতায় টিকে থাকার সক্ষমতা পুরো নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল সেই ভয়ানক আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গের সামনে।
আমি খেয়াল করে দেখছি পুরো দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ছে বিপ্লবের সুবাতাস। ভয়ে কথা না বলা মানুষগুলো সেøাগান দিচ্ছে ‘বুকের ভিতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’। আমি খেয়াল করছি ১৯ জুলাই পর্যন্ত ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সংগঠন রাস্তায় তাণ্ডব সৃষ্টি করে বেড়ালেও ধীরে ধীরে লেজ গুটিয়ে পালাচ্ছে। বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ দিয়ে সরাসরি গুলি করিয়ে আর কতক্ষণ টিকে থাকবে ফ্যাসিস্ট হাসিনা! সেই পরিস্থিতি যাতে সবাই বুঝতে না পারে সে জন্য ইন্টারনেট বন্ধ করে রেখেছিল সে। তারপরও আমার বিশ্বাস এ আন্দোলন থামাতে কার্যত ব্যর্থ হবে ফ্যাসিস্ট হাসিনা। তারপর আমার বিশ্বাসকে সত্য করে দিয়ে সরকার দেশজুড়ে কারফিউ জারি করে।
শেখ হাসিনা সব চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে যেদিন মাঠে সেনাবাহিনী নামায় আমি একটা টেলিভিশন টকশোতে যাচ্ছিলাম। পথের মধ্যে কথা হয় বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও লেখক আদনানের সঙ্গে। আমি বেশ জোরের সঙ্গে তাকে বলি- ‘তোরা কী ভাবছিস, আমি জানি না, তবে আমার হিসেবে এই সেনাবাহিনী আর সহজে ব্যারাকে ফিরবে না। আর হাসিনাও ক্ষমতায় থাকবে না।’ জবাবে আদনান বলল, গাজীপুরের পরস্থিতিও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে। রুয়েটের সামনে থেকে পোলাপান এতবড় মিছিল দিয়েছে যেটা কস্মিনকালেও রাজশাহীবাসী চোখে দেখেনি। ওদিকে চৌরাস্তা, কোনাবাড়ি, শফিপুর, শিববাড়ি সবখানে উত্তাল পরিস্থিতি।
আমি ফোনে কথা বলছি বাংলাদেশের নানা প্রান্তে সবার সঙ্গে। উত্তরার জনতার প্রতিরোধের গল্প শুনলাম আমার আরেক ছোটভাই অধ্যাপক হাসনাত শামীমের কাছে। শামীম জানাল প্রচণ্ড গোলাগুলির তাণ্ডবে বাসায় থাকা দায়। তারপরও ছেলেমেয়েরা রাস্তা থেকে সরছে না। পুলিশ পুলিশের মতো গুলি করছে, তারা তাদের মতো ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে যাচ্ছে। তাদের ভিতর থেকে মরার ভয় পুরোপুরি চলে গেছে। এবার তাদের ভয় দেখানোর ক্ষমতা হাসিনার বাহিনীর নেই।
ঢাকার যাত্রাবাড়ীর ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে জানতে পারি আমার আরেক ছোট ভাইয়ের কাছে। তার কথা শুনেও আমি অনুমান করি পুরো দেশে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে আওয়ামী লীগ। ১৬ তারিখে জনতার দ্রোহকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে কাউয়া কাদের খ্যাত আওয়ামী লীগের নেতা ওবায়দুল কাদের যখন বলল, ‘এইসব আন্দোলন ঠেকাতে ছাত্রলীগই যথেষ্ট’, তখন চরম বিরক্ত হয়েছিলাম। কিন্তু পরে বুঝতে পারলাম মানুষ চরম বিপদে পড়লে ফাঁকা আওয়াজ দেয়। ওবায়দুল কাদের আসলে ঠিক সেই কাজটা করেছে। অনেকটা গ্রামগঞ্জে রাত-দুপুরে কেউ প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গেলে ভূতের ভয়ে যেভাবে গান গায়, আমার কাছে ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে ঠিক তাই। সে আসলে অন্য সবাইকে ভয় দেখাচ্ছে, নাকি চরম ভয় পেয়ে নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছে সেটা তখন স্পষ্ট ছিল না।
আমি আমার আশপাশের সবাইকে বলেছি কাদের ফাঁকা আওয়াজ দিচ্ছে। ১৯ জুলাই রাতে ফোন করলাম আদনানকে। নানা কথার ফাঁকে ওকেও বলছি এই কথা যে ওবায়দুল কাদের আসলে সে নিজেও হাসিনার পতনের শব্দ শুনতে পাচ্ছে। ১৯ তারিখে আমি আমার বিশ্বাসের পক্ষে আরও শক্ত যুক্তি পেয়ে যাই। খবরে দেখতে পাই কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলা হয়েছে। কারাগারে অগ্নিসংযোগ করার পর ভিতরে ঢুকে সেলের তালা ভেঙে কয়েদিদের বের করে নেওয়ার পাশাপাশি অস্ত্র-গোলাবারুদ ও খাদ্যপণ্যও লুট করেছে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। তারা সেখানে ব্যাপক ভাঙচুর করে। টিভিতে দেখায় সেই হামলা ও ভাঙচুরের দৃশ্য। কারাগারের পুরো চত্বরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ইটপাটকেল আর বিভিন্ন স্থাপনার ভাঙা অংশ। আমি টিভিতে এ দৃশ্য দেখে সবাইকে বলেছিলাম হাসিনার শাসনের অবস্থাও এরকম হয়েছে। সবদিক থেকে তার চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। আর যাই হোক সে আর ক্ষমতায় থাকতে পারবে না।
আমার ট্যাক্সের টাকা দিয়ে কেনা অস্ত্র ব্যবহার করে পুলিশ আমার সন্তানকে হত্যা করছে। ভাগ্য ভালো তখন ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। সেসব ভয়াবহ দৃশ্য আমার দেখার সুযোগ হয়নি। হঠাৎ করে ফেসবুক খুলে দিলে নিজের চোখকে অবিশ্বাস করতে হয়েছিল। আমি ভাবতে পারিনি একটা সরকারপ্রধান সে যত নিকৃষ্টও হোক শুধু ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য এতটা বর্বর হতে পারে। সে গুলি করে মেরেছে শিশু, কিশোর, নারী, পুরুষ এমনকি বৃদ্ধকেও। গুলি খেয়ে আহত একটা মানুষ যখন কাতরাচ্ছে তাকেও রেহাই দেওয়া হয়নি গুলির মুখ থেকে।
চব্বিশের পরাজিত শক্তি এখন বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্র প্রমাণ করতে তৎপর। আমাদের সন্তানদের রক্তের বিনিময়ে আমরা যে নতুন বাংলাদেশকে পেয়েছি তাকে পুরোপুরি বাসযোগ্য করে তুলতে হলে আমাদের এখনো পাড়ি দিতে হবে অনেকটা পথ। সে দীর্ঘপথে জুলাইয়ের শহীদ আর বীরেরা অনুপ্রেরণা হোক আমাদের। আমি জুলাই-আগস্ট গণ অভ্যুত্থানের প্রতিটি বীর শহীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি তাদের বিপ্লবী অবদানকে।
লেখক : উপাচার্য, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়।