আন্দোলনে যারা নিহত হয়েছে তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোসহ আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা, যা রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব বলে মনে করি...
একটি সমাজ বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাধীনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ধূমায়িত অসন্তোষের বহির্প্রকাশ ঘটে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। জুলাই-২০২৪ এর বাংলাদেশে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণআন্দোলন তা থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু ছিল না। সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে তা ধীরে ধীরে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে। বিগত সরকারের আমলে নির্বাচনের নামে প্রহসন, দুর্নীতি, বিদেশে টাকা পাচার, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সরকারি ছাত্র সংগঠন ও প্রশাসনের ছত্রছায়ায় তাদের তল্পিবাহকদের টেন্ডারবাজি, নিয়োগবাণিজ্যসহ উপাচার্য, উপউপাচার্য ও ট্রেজারার নিয়োগেও হয়েছে আর্থিক লেনদেন। এসব কিছু ছাত্র, শিক্ষক ও সাধারণ জনগণের সরকারবিরোধী মনোভাব ও বিক্ষুব্ধ হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করেছিল। আর কোটা আন্দোলনকারী ও বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা আন্দোলনকে বিপ্লবের পথে ধাবিত করেছিল, যেখানে উল্লিখিত বিক্ষুব্ধ শ্রেণির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন ও সহযোগিতায় একটা সফল বিপ্লব সংঘটিত হয়।
বিশেষ করে ১৫ জুলাই, ২০২৪ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদী মিছিল বের করলে তাদের ওপর ছাত্রলীগ ও বহিরাগত সন্ত্রাসীদের হামলায় ফুঁসে উঠে ছাত্রছাত্রীরা।
এ ঘটনায় অনেক ছাত্রীকে সন্ধ্যায় বিভিন্ন স্থানে আটকে রাখার সংবাদে আমি নিজে ওইদিন মাগরিবের নামাজের পরে প্রফেসর মাফরুহী সাত্তার, প্রফেসর জামাল উদদীন রুনুসহ আটকেপড়া ছাত্রীসহ কিছু আহত ছাত্রকে উদ্ধার করে চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠাই। এ সময় সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ফাইজা, ইতিহাস বিভাগের আয়শা সিদ্দিকা বৃষ্টিসহ বেশকিছু ছাত্রী সন্ত্রাসী বাহিনী কর্তৃক অবরুদ্ধ হলেও তাদের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধে তারা পালিয়ে যায়। একই সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান হলের সামনে থেকে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে দিই, যাতে আরও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা না ঘটে। ইতোমধ্যে শিক্ষক সমিতির ওই সময়ের সহসভাপতি প্রফেসর সোহেল আহমেদ (বর্তমান উপউপাচার্য, শিক্ষা) আমাদের সঙ্গে যুক্ত হন। রাত ৯টার দিকে শিক্ষার্থীরা শহীদ মিনারে জড়ো হয়ে হামলার প্রতিবাদে মিছিল সহকারে উপাচার্যের বাসভবনের দিকে অগ্রসর হতে থাকলে আমরা শিক্ষকরা নতুন কলা ভবনের সামনে থেকে যার যার বাসায় চলে যাই।
তবে আমি বিভাগীয় অফিস রুমে আমার গবেষণার কিছু কাজ করি। রাত ১০টার দিকে আমার সহকর্মী ও স্নেহাস্পদ প্রফেসর মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী আমাকে ফোন করে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে হামলার বিচারের দাবিতে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ান। রাত ১১.৪৫টায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সম্পাদক নোমান বিন হারুন আমাকে ফোন করে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হতে যাচ্ছে এ অবস্থায় আমার সাহায্য কামনা করলে আমি তার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনে উপাচার্যের বাসভবনের ভিতরে আশ্রয় গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে আমাদের শিক্ষক ঐক্য পরিষদসহ শিক্ষকদের আরেকটি গ্রুপে উপাচার্যের বাসভবনে সন্ত্রাসী বাহিনী কর্তৃক শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার আশংকা করে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে আসার জন্য মেসেজ দিয়ে আমি রিকশাযোগে উপাচার্যের বাসভবনের দিকে অগ্রসর হই।
কিন্তু চৌরঙ্গীতে গিয়ে আটকে যাই। সামনে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ জনের মতো সন্ত্রাসী, যাদের বেশির ভাগের মাথায় হেলমেট পরা, হাতে ধারালো রামদা, চাপাতি ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে উপাচার্যের বাসভবনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আমি রিকশা থেকে নেমে তাদের পেছনে পেছনে হাঁটতে শুরু করতেই সামনে থেকে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা শুরু করলে তারা উপাচার্যের বাসভবনের ভিতরে আশ্রয় নেয়। উপাচার্যের বাসভবনের দুই গেট ভেঙে সন্ত্রাসীরা ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করে ও পেট্রলবোমা, ইট, কাচের বোতল ছুড়তে থাকে। এতে ভিতরে আশ্রয় গ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের অনেকেই আহত হয়। শিক্ষার্থীরা বাঁচার জন্য তৎকালীন উপাচার্য প্রফেসর নূরুল আলমের বাসার বৈঠকখানার দরজা খুলে দেওয়ার অনুনয় বিনয় করলেও তিনি তখন ভিতরে ২৫/৩০ জন শিক্ষক পরিবেষ্টিত অবস্থায় থেকেও দরজা না খুলে অবরুদ্ধ শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর মুখোমুখি ফেলে দিয়েছিলেন। আমি আবারও আক্রমণের কথা জানিয়ে মেসেজ দিয়ে শিক্ষকদের উপাচার্যের বাসভবনের সামনে আসার আহ্বান জানাই এবং অনেককে ফোন করে প্রফেসর ড. মো. কামরুল আহসান (বর্তমান উপাচার্য), প্রফেসর মাফরুহী সাত্তার, প্রফেসর মো. নজরুল ইসলামসহ আমরা পাঁচজন শিক্ষক উপাচার্যের বাসভবনে গিয়ে অবরুদ্ধ শিক্ষার্থীদের নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার দাবি জানাই।
উপাচার্যের বাসভবনে প্রফেসর গোলাম রব্বানী, আত্মরক্ষার জন্য লাঠি হাতে ইতিহাসের শিক্ষার্থী আয়শা সিদ্দিকা বৃষ্টি, মালিহাসহ অনেকেই আমাদের আগমনে কিছুটা দুশ্চিন্তামুক্ত হলেও অল্প সময়ের মধ্যে প্রশাসনের ইন্ধনে গেট থেকে পুলিশ সরিয়ে দিয়ে সন্ত্রাসীদের বাসার ভিতরে প্রবেশ করে আক্রমণের সুযোগ করে দেয়। রাত ১টার দিকে সন্ত্রাসীদের একাংশ উপাচার্যের বাসভবনে অবরুদ্ধ শিক্ষার্থীসহ আমাদের শিক্ষকদের ওপর ৭/৮ হাত দূরত্ব থেকে প্রায় ২০/২৫ মিনিট ধরে পেট্রলবোমা, কাচের বোতল, ইট দিয়ে আঘাত করতে থাকলে আমরা শিক্ষার্থীদের সামনে থেকে তাদের রক্ষার চেষ্টা করি এবং হাতে ধারালো অস্ত্রধারীরা যাতে সরাসরি কোপাতে না পারে তার চেষ্টা করি, যার ভিডিও সবাই দেখেছেন। এ সময় ৪০/৫০ জন শিক্ষার্থী ভীষণভাবে আহত হয়। ওই ভিডিও দেখে বিভিন্ন হল থেকে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী এসে জড়ো হয়ে আমাদের রক্ষা করলেও পুলিশ ও প্রশাসন নিশ্চুপ থেকে আমাদের সবাইকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল।
আহত শিক্ষার্থীদের অনেকেই বের হয়ে গেলেও উপাচার্যের বাসভবনের সামনে আবারও সংঘর্ষ শুরু হলে আমরা অবরুদ্ধ শিক্ষার্থীদের নিয়ে বাসা থেকে বের হওয়ার জন্য অগ্রসর হলে পুলিশ উপাচার্যের বাসভবনের ভিতরে এলোপাতাড়ি গুলি ও টিয়ার শেল ছুড়তে থাকে। এসময় পরিচয় জানার পরও পুলিশের শটগানের গুলির আঘাতে আমি ভীষণভাবে আহত হই ও আমার ডান চোখসহ শরীরে ৭০টির মতো স্পিøন্টার বিদ্ধ হয়। ওই সময়ই আমার ডান চোখের রেটিনা ভেদ করায় আমার ডান চোখ দৃষ্টিহীন হয়ে পড়ে। আমি রক্তাক্ত অবস্থায় কোনোভাবে বের হয়ে পুলিশকে আর গুলি চালাতে নিষেধ করে সিকিউরিটি অফিসার সজলের সহায়তায় হেঁটে প্রান্তিকে যাই। সেখান থেকে আমাকে দুজন ছাত্র মোটরসাইকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্রে পৌঁছে দিলে শিক্ষার্থীদের সহায়তারত প্রফেসর এজাহার ও সহযোগী অধ্যাপক পলাশ সাহা আমাকে অ্যাম্বুলেন্সে এনাম মেডিকেল কলেজে আসতে সহায়তা করে। আমি এনাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে পরের দিন জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ১০ দিন চিকিৎসা শেষে থাইল্যান্ডে অপারেশন করালেও এখনো পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাইনি। এ মাসেই থাইল্যান্ডে আবারও অপারেশনের ডেট রয়েছে। জানি না ফিরে পাব কি না হারানো দৃষ্টিশক্তি।
উল্লেখ্য, ১৫ জুলাই শেষ রাত ও ১৬ জুলাই প্রথম প্রহর থেকেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রলীগ বিতাড়িত হওয়ার মধ্য দিয়ে জাহাঙ্গীরনগরের পথ ধরে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিজয় ছিল ৫ আগস্ট সফল বিপ্লবের মাইলফলক।
আর বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রের যে সংস্কার প্রয়োজন তা হলো প্রথমত সবার আত্মশুদ্ধি। আন্দোলনে যারা নিহত হয়েছে তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোসহ আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা, যা রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব বলে মনে করি।
এর পরই যেটা বড় প্রয়োজন ছিল, দেরি হলেও এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নি, তা হলো দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ। প্রশাসন, বিচার ও পুলিশ বাহিনীর সংস্কার। একই সঙ্গে বিপ্লবে ছাত্র-জনতার হত্যাকারী ও মদতদাতাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। এরপর একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। আর এভাবেই একটি জবাবদিহিমূলক প্রশাসন ও সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে জুলাই বিপ্লবের যথার্থতা প্রতিপন্ন হোক। একই সঙ্গে এক নতুন দিগন্তের পথে অগ্রসর হোক বাংলাদেশ- সেই কামনায় সব শহীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও আহতদের সুস্থতা কামনাসহ নতুন সূর্যোদয়ের প্রত্যাশা নিরন্তর।
লেখক : অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়