বাংলা মায়ের ভাষা, প্রাণের ভাষা। বায়ান্নতে রক্ত দিয়ে কিনতে হয়েছে বাংলা ভাষাকে। যার আবেগ মিশে আছে আমাদের চেতনা ও সংস্কৃতিতে। সেই বাংলা বর্ণ ও শব্দমালার প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ ঘটেছে পোশাকে; নানা রঙে আর নানা ঢঙে
অমর একুশে বাঙালি জাতির এক অনন্য অর্জন। বাঙালির এই অর্জন লাভ করেছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। ১৯৯৯ সাল থেকে অমর একুশে সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। সেই থেকে ভাষা আন্দোলন ও ভাষাশহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হচ্ছে। কেননা, বাঙালির কাছে এটি অহংকার। আর বাংলা বর্ণমালা প্রাণের চেয়ে প্রিয়। কারণ- এটি মায়ের ভাষা। আর একুশের প্রধান বিষয় হচ্ছে শোকের সঙ্গে শহীদদের শ্রদ্ধা জানানো। এটি বৈশাখ বা অন্য দিবসের মতো নয়, এটি ভাবগম্ভীর বিষয়। সেটিকে বোঝাতেই কালো সংযুক্ত হয়েছে। আর সাদার অর্থ হচ্ছে শুদ্ধতা ও শ্রদ্ধা। ৫২-এর ভাষা আন্দোলনের দিনেও আমরা সাদা পোশাকের ব্যবহার দেখেছি। তখন থেকেই শুদ্ধ সাদা। এর সঙ্গে শোক যুক্ত হয়েছে। এ দুটি রং ছাড়া একুশকে কোনোভাবেই বোঝানো সম্ভব নয়। আর যেহেতু আমাদের আত্মত্যাগ আর লড়াই ছিল ভাষার জন্য, সেহেতু ভাষা ও বর্ণমালা এখানে অনেক বেশি সংযুক্ত।
একুশে ফেব্রুয়ারি বহুমাত্রিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আমরা উদযাপন করি। এসব আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি একুশের গৌরবগাথা ফুটে ওঠে পোশাকেও। আর এই দিনের পোশাকে রং-ঢঙে থাকে কেবলই শোক ও প্রতিবাদের ভাষা। আর থাকে মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার্থে প্রাণ বিলিয়ে দেওয়া ভাষাশহীদদের প্রতি ভালোবাসা। তাই তো একুশের পোশাকের জমিনে ফুটে ওঠে মাতৃভাষার বর্ণমালা অ আ ক খ। বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস ও বুটিকগুলো একুশের চেতনা নিয়ে তৈরি করছে নতুন নতুন ডিজাইনের বর্ণমালার পোশাক। রং, কাপড় এবং ডিজাইন সবকিছুতেই রয়েছে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা আর অকৃত্রিম ভালোবাসা। ফলে পোশাকে বর্ণমালার ব্যবহার যেন বাঙালির চেতনারই অংশ। আর পোশাকের ক্যানভাসে রচিত নানা রং ও ডিজাইন। ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা নিয়ে সেজে ওঠে দেশি ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো।
পোশাকে ইতিহাস ও ঐতিহ্য
শোক, শ্রদ্ধা ও গৌরবের দিনটির নানা আয়োজনের সঙ্গে একুশের দৃঢ় চেতনা অনেক আগের। ভাষার প্রতি বাঙালির ভালোবাসা, একুশের মাধ্যমে উঠে আসে লেখায়, রেখায় এবং দৈনন্দিন জীবন যাপনে; পোশাক-আশাকে। ১৯৮২ বা ’৮৩ সালে বর্ণমালার নকশা দিয়ে পোশাক ডিজাইন করেছিলেন ডিজাইনার ও গবেষক চন্দ্র শেখর সাহা। শাড়ি, শার্ট ও পাঞ্জাবিতে ব্যবহার করেছিলেন বাংলা বর্ণমালা। ধীরে ধীরে পোশাকের জমিন ভরে উঠছে বর্ণমালায়। নানা সময়ে ফ্যাশন ডিজাইনাররা বাংলা কবিতা, গান বা একুশের স্লোগানে সাজান পোশাকের নকশা। থাকে শহীদ মিনার, মানচিত্র, পতাকাসহ একুশের চিত্র।
রঙের ব্যবহার
রং দিয়েও প্রকাশ করা যায় অনুভূতি। তাই একুশের পোশাকের রঙের ব্যবহারেও আছে নানা ফিউশন। পবিত্রতা আর পূর্ণতা- সাদা রঙের পাশাপাশি আছে শোক ও প্রতিবাদের রং কালোর ব্যবহার। তবে এখন আর একুশ কেবলই দুটি রঙে আবদ্ধ নেই। একুশের পোশাকে এখন থাকে সর্বজনীন রঙের ব্যবহার। সাদা ও কালোর আধিক্যতার পাশাপাশি আছে অ্যাশ, অফ হোয়াইট, লাল, সবুজ, হলুদ, নীল তামাটেসহ সব রং।
পোশাকের নকশা
একুশে পোশাকের জমিনে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে গর্বিত বর্ণমালার সাজ। বিশেষ দিবস উপলক্ষে পোশাকে ব্লক প্রিন্ট, স্ক্রিন প্রিন্ট, মেশিন ও হ্যান্ড অ্যামব্রয়ডারিতে করা হয়েছে জমিন অলংকরণ। আর প্রতিটি পোশাকের ডিজাইনকে মাত্রা দিতে ব্যবহার করা হয় নানা অনুষঙ্গ। প্যাটার্ন ভেরিয়েশনে আছে দেশি ঐতিহ্যের ছাপ। সাদাকালোর সমন্বয়ের পোশাকের কাপড়ে সুতির প্রাধান্য থাকলেও তাঁত, মসলিন, সিল্কের ব্যবহারও অনেক। ভাষার মাসকে কেন্দ্র করে কয়েক বছর ধরেই দেশি বুটিক হাউসগুলো তাদের পোশাকে পরিবর্তন নিয়ে আসছে। পোশাকে কালো রঙের ব্যবহারের কারণ বাংলা বর্ণমালা কালো কালিতে লিখি, আবার শোক হিসেবেও আছে এর ব্যবহার। আর একুশের ইতিহাস রক্তক্ষয়ী, তাই লালও আসে। আর শুদ্ধতার প্রতীক সাদা রং তো থাকেই। একুশের আয়োজনে মেয়েদের শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, সিঙ্গেল কামিজ, টপস, আনস্টিচ, সিঙ্গেল ওড়না, ব্লাউজ তো আছেই! পাওয়া যাচ্ছে ছেলেদের পাঞ্জাবি, পায়জামা, ফুলহাতা ও হাফহাতা শাট, টি-শার্ট, পোলো-শার্ট এবং উত্তরীয়। শিশুদের জন্যও আছে একুশের পোশাক।