হয় পুনরাবৃত্তি, না হয় প্রতিশোধ। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির আজকের ফাইনালের চিত্র!
দীর্ঘ ২৫ বছর পর ভারত ও নিউজিল্যান্ড ফের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনাল খেলবে। ২০০০ সালে কেনিয়ার নাইরোবির সেই ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল নিউজিল্যান্ড। এরপর কয়েকটি আইসিসি ট্রফির ফাইনাল খেলেছে ভারত। এবার দীর্ঘ দুই যুগ পর আইসিসির কোনো ওয়ানডে টুর্নামেন্টের ফাইনালে নিউজিল্যান্ডের প্রতিপক্ষ হয়েছে ভারত। যদিও ২০২১ সালে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল খেলেছিল দুই দল এবং শিরোপা জিতেছিল নিউজিল্যান্ড। পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, আইসিসির কোনো টুর্নামেন্টের ফাইনাল মানেই নিউজিল্যান্ড ফেবারিট। ২৫ বছর আগের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালে হারের প্রতিশোধ নেওয়ার ম্যাচ ভারতের। বিপরীতে নিউজিল্যান্ডের দ্বিতীয় ওয়ানডে শিরোপা উৎসবের দিন আজ। বাংলাদেশ সময় দুপুর ৩টায় চ্যাম্পিয়নস ট্র্রফির শিরোপা জিততে মুখোমুখি হবে ভারত ও নিউজিল্যান্ড। প্রতিশোধের ম্যাচটি আবার রোহিত বাহিনীর চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে তৃতীয় শিরোপা জয়ের ফাইনাল। মিচেল স্যান্টনারের নিউজিল্যান্ডের দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের ফাইনাল।
টুর্নামেন্টের শিডিউলে ফাইনালের ভেন্যু ছিল দুটি। পাকিস্তানের লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়াম। যেখানে ১৯৯৬ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনাল হয়েছিল। আরেক ভেন্যু ‘মরুশহর’ দুবাই। দুই শহরে ফাইনালের ভেন্যু ঠিক রাখার কারণ ভারত। পাকিস্তানের মাটিতে খেলতে রোহিত বাহিনীর অনীহায় আইসিসি ‘হাইব্রিড’ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির আয়োজন করে। যেখানে ভারত ফাইনালে উঠলে খেলবে দুবাইয়ে, এমন করেই ফিকশ্চার তৈরি করা হয়। রোহিত বাহিনী গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচ ছাড়াও সেমিফাইনাল খেলেছে মরুশহরে। ফাইনালও খেলবে। এমন বিচারে ভারতের হোম ভেন্যুই বলা যায় দুবাইকে! নিউজিল্যান্ডও দুবাইয়ে খেলেছে। গ্রুপপর্বে ভারতের বিপক্ষে ৪৪ রানে হেরেছিল।
১৯৯৮ সালে বাংলাদেশে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি শুরু হয় আইসিসি নকআউট বিশ্বকাপ নামে। দুই বছর পর ২০০০ সালে দ্বিতীয় আসর আয়োজন করে কেনিয়া। সেবার ফাইনালে মুখোমুখি হয় ভারত ও নিউজিল্যান্ড। ১৯৮৩ সালে ওয়ানডে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আইসিসির কোনো টুর্নামেন্টের ফাইনালে ওঠে ভারত। নিউজিল্যান্ড প্রথমবারের মতো আইসিসির কোনো টুর্নামেন্টের ফাইনালে ওঠে। প্রথমবার খেলতে নেমে বাজিমাত করে ট্রান্স তাসমান সাগর পাড়ের দেশটি। সৌরভ গাঙ্গুলির সেঞ্চুরির জবাবে ব্ল্যাক ক্যাপসদের শিরোপা উৎসবে মাতান ক্রিস কেয়ার্নস সেঞ্চুরি করে। ভারত দুবার চ্যাম্পিয়নস ট্রফির শিরোপা জিতেছে। ২০০২ সালে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে যুগ্মভাবে এবং ২০১৩ সালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। ২০১৭ সালে পাকিস্তানের কাছে ফাইনালে হেরে যায়। ভারত এবার নিয়ে টানা তৃতীয়বার চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনাল খেলছে। রোহিত বাহিনী গত দুই বছরে আইসিসির চারটি টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলছে। ২০২৩ সালে ঘরের মাঠে ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালে হেরেছিল অস্ট্রেলিয়ার কাছে। ২০২৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে টি-২০ বিশ্বকাপের শিরোপা জেতে। ২০২৩ সালে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ফাইনালে হেরে যায়।
নিউজিল্যান্ড ২০১৫ ও ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠেও হেরে যায়। ২০২১ সালে ভারতকে হারিয়ে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতেছিল। মিচেল স্যান্টনারের নেতৃত্বে ব্ল্যাক ক্যপসরা দুর্দান্ত খেলছে। গ্রুপপর্বে ভারতের কাছে হারলেও পাকিস্তানকে ৬০ রানে এবং বাংলাদেশকে ৫ উইকেটে হারায়। এরপর সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৫০ রানে হারায়। রোহিত বাহিনী ফাইনালে উঠেছে শতভাগ সাফল্য নিয়ে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে ৬ উইকেট এবং নিউজিল্যান্ডকে ৪৪ রানে হারায়। সেমিফাইনালে ৪ উইকেটে হারায় অস্ট্র্রেলিয়াকে।
আজকের ফাইনাল হবে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের উইকেটে। ম্যাচে ব্যাটারদের চেয়ে স্পিনাররা বাড়তি সহায়তা পেয়ে থাকেন। ভারতের চার স্পিনার রবীন্দ্র জাদেজা, বরুণ চক্রবর্তী, অক্ষর প্যাটেল ও কুলদ্বীপ যাদব ট্রামকার্ড হতে পারেন আজ। পিছিয়ে নেই নিউজিল্যান্ডও। অধিনায়ক স্যান্টনার ও মিচেল ব্রেসওয়েল দুই স্পিনার দলটির ভরসা। ভারতের ব্যাটিংয়ের মূল ভরসা বিরাট কোহলি। পাকিস্তানের বিপক্ষে সেঞ্চুরি ছাড়াও সেমিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৮৪ রানের ইনিংস খেলেন। ছন্দে নেই অধিনায়ক রোহিত। শুভমান গিল, শ্রেয়াস আইয়ার, লোকেশ রাহুল, হার্দিক পান্ডিয়ারা দারুণ ব্যাটিং করছেন। বোলিংয়ে অভিজ্ঞ মোহাম্মদ শামি ও পান্ডিয়া ভরসা। ইনজুরি কাটিয়ে নিউজিল্যান্ড একাদশে ফিরছেন ১০ উইকেট নেওয়া ফাস্ট বোলার ম্যাট হেনরি। দলের ব্যাটিং ভরসা রাচিন রবীন্দ্র, উইল ইয়াং, কেন উইলিয়ামসন, টম ল্যাথাম, ডেভন কনওয়ে। রাচিন ৩ ম্যাচে দুই সেঞ্চুরি করেছেন।
দুই দল এখন পর্যন্ত পরস্পরের বিপক্ষে মুখোমুখি হয়েছে ১১৯ বার। ভারতের ৬১ জয়ের বিপরীতে নিউজিল্যান্ডের জয় ৫০টি। টাই একটি এবং পরিত্যক্ত ৭ ম্যাচ। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে দুই দল খেলেছে দুবার এবং জয় একটি করে।
ভরসার নাম বিরাট কোহলি
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের বিপক্ষে ভীষণ ক্যালকুলেটিভ ক্রিকেট খেলেন বিরাট কোহলি। সেঞ্চুরি করেন বাউন্ডারি মেরে। জিততে দলের প্রয়োজন তখন ২ রান এবং কোহলির দরকার ৪ রান। খুশদিল শাহকে কাভার ড্রাইভে সীমানা ছাড়া করে ক্যারিয়ারের ৫১তম সেঞ্চুরি তুলে নেন। সেমিফাইনালে তিনি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪ উইকেটে জয়ী ম্যাচে খেলেন ৮৪ রানের ইনিংস। বয়স ৩৬।
অথচ কোহলি ভারতীয় ক্রিকেট দলের ফিটনেসে সেরা ক্রিকেটার। দলে রোহিত শর্মা, শ্রেয়াস আইয়ার, লোকেশ রাহুলের মতো ম্যাচ উইনার রয়েছেন। তার পরও কোহলিই ভরসা। তিনি উইকেটে থাকা মানে যে কোনো পরিস্থিতিতে দল জয়ের স্বপ্ন দেখে। ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে ভারতকে ফাইনালে টেনে নিয়ে যান একা। সেঞ্চুরি করেন একাধিক। সেরা ব্যাটার হন। টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতকে চ্যাম্পিয়ন করে অবসরে যান। আজ হয়তো ওয়ানডে ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ খেলবেন কোহলি। তার সঙ্গে হয়তো রোহিত শর্মাও অবসরের ঘোষণা দেবেন। কোহলি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির চারটি ম্যাচই খেলেন দুবাইয়ে। পাকিস্তানের বিপক্ষে সেঞ্চুরি, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হাফ সেঞ্চুরি করেন। বাংলাদেশের বিপক্ষে ২২ ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১১ রান করেন। আজ ফাইনালে ব্ল্যাক ক্যাপসদের বিপক্ষে নিজেকে রাঙিয়েই হয়তো অবসরের ঘোষণা দেবেন বিরাট কোহলি।
ব্যাটিং ভরসা রাচিন রবীন্দ্র
রাচিন রবীন্দ্র ‘বিগ টুর্নামেন্ট প্লেয়ার’। আইসিসির টুর্নামেন্ট মানেই সেঞ্চুরি। ২০২৩ সালের মার্চে আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে অভিষেক। ক্যারিয়ারের ৩২ ম্যাচে ২৮ ইনিংসের শুরুর ৮ ইনিংসে ব্যাটিং করেছেন লেট ও মিডল অর্ডারে। ওয়ানডে বিশ্বকাপে তিনি কখনো ওয়ানডাউন, কখনো ওপেন করেছেন। বাঁহাতি ফিঙ্গার স্পিনার কাম ব্যাটার রাচিন বিশ্বকাপে ৩টি সেঞ্চুরি করে চমকে দেন ক্রিকেটপ্রেমীদের। তখনই ক্রিকেট বিশ্লেষকরা বলতে থাকেন, রাচিন রবীন্দ্র ‘বিগ টুর্নামেন্ট প্লেয়ার।’ ওয়ানডে ক্যারিয়ারে সেঞ্চুরি করেছেন ৫টি।
যার ৩টি ওয়ানডে বিশ্বকাপে এবং শেষ দুটি চলমান চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে। আজ ভারতের বিপক্ষে ফাইনাল খেলবে নিউজিল্যান্ড। ২০০০ সালের পর ফাইনাল খেলবে ব্ল্যাক ক্যাপসরা। ২০১৫ ও ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছে দলটি। ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলেছে। কিন্তু সাদা বলে শিরোপা জিতেনি। এবার মিচেল স্যান্টনারের নেতৃত্বে দলটি স্বপ্ন দেখছে ২৫ বছর পর দ্বিতীয় কোনো ট্রফি জয়ের। দলে কেন উইলিয়ামসন, টম ল্যাথামদের মতো ক্রিকেটার থাকার পরও নিউজিল্যান্ডের ভরসা রাচিন। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ৩ ম্যাচ খেলে সেঞ্চুরি করেছেন ২টি। রাওয়ালপিন্ডিতে বাংলাদেশের বিপক্ষে ১১২ ও লাহোরে সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১০৮ রান করেন।