মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান, মাথাপিছু আয় ও শহরে মানুষের বসবাসের প্রবণতা বাড়ার সঙ্গে কনজিউমার ইলেকট্রনিকসের বাজারের প্রবৃদ্ধি ওতপ্রোত জড়িত। গত দেড় দশকে সরকারের নীতিসহায়তায় বর্তমানে দেশিবিদেশি ১৩টি কোম্পানি দেশে ফ্রিজ উৎপাদন করে বাজারজাত করছে। দেশে ফ্রিজের বাজার ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে...
একসময়ের বিলাসী পণ্য এয়ারকন্ডিশনার-ফ্রিজ এখন প্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। শহরের পাশাপাশি গ্রামেও এসি-ফ্রিজের চাহিদা বাড়তে থাকায় দেশি উদ্যোক্তারা এ খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছেন। মূল্য সাশ্রয়ী ও উন্নত পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে এখন দেশের এসি-ফ্রিজের বাজারের ৮৫ শতাংশের মতো দখলে রয়েছে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর। একসময় সব ধরনের ফ্রিজই বিদেশ থেকে আমদানি করা হতো। শুল্কছাড়সহ সরকারের নানা ধরনের নীতিসহায়তার ফলে সাশ্রয়ী দামে দেশের মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে ফ্রিজ-এসি ও টেলিভিশন। এতে অনেক বিদেশি কোম্পানিও বাংলাদেশে এসি-ফ্রিজ সংযোজন বা উৎপাদন শুরু করেছে। এসি-ফ্রিজের বাজার দখলে স্থানীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে ওয়ালটন, মিনিস্টার-মাইওয়ান, ভিশন, সনি-স্মার্ট উল্লেখযোগ্য। বিদেশি এসির মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড চীনা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘গ্রি’। এই ব্র্যান্ডের এসি এখন বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে দেশীয় কোম্পানি ইলেক্ট্রো মার্ট উৎপাদন করে। এছাড়াও স্যামসাং, সিঙ্গার, এলজি-বাটারফ্লাই, র্যাংস ইলেকট্রনিকস, যমুনা, জেনারেল, হিটাচি, প্যানাসনিক, শার্প এসি-ফ্রিজ বাজারজাত করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস প্রতিবেদনে (২০২৩) বলা হয়েছে, দেশে মোট পরিবার বা খানার সংখ্যা ৪ কোটি ১০ লাখ। এর মধ্যে ৫৩ দশমিক ৪০ শতাংশ পরিবারে অন্তত একটি ফ্রিজ রয়েছে; অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি পরিবারে ফ্রিজ ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২১ সালে এই হার ছিল ৪৫-এর কিছু বেশি। গরম থেকে স্বস্তি পেতে বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজছেন অনেকেই। ফলে বেড়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) চাহিদা। তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশের ২ দশমিক ২৮ শতাংশ পরিবার (খানা) এসি ব্যবহার করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকসে (বিএসভিএস) এ তথ্য উঠে এসেছে। ২০২২ ও ২০২১ সালের তুলনায় এসি ব্যবহার বেড়েছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে বলে এসির ব্যবহারও বেড়েছে।
এ বিষয়ে ইলেক্ট্রো মার্ট গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নুরুল আফছার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গ্রীষ্মের শুরুতে, রমজান, ঈদ, পূজা-পার্বণ ইত্যাদি ঘিরে এসি-ফ্রিজের চাহিদা অনেক গুণ বৃদ্ধি পায়। দুটি বড় উৎসব ঈদ ঘিরে বার্ষিক চাহিদার প্রায় ২৫ শতাংশ ফ্রিজ বিক্রি হয়। প্রতি বছর ফ্রিজের চাহিদা প্রায় ১০-১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। বাজারে কনকা ও হাইকো ব্র্যান্ডের চাহিদা ভালো। ঈদ ঘিরে আমাদের যথেষ্ট প্রস্তুতি রয়েছে এবং গ্রাহকদের চাহিদা বিবেচনায় রেখে এ সময়ে প্রতিটি পণ্যে ছাড় দেওয়া হয়। ওয়ালটন রেফ্রিজারেটরের চিফ বিজনেস অফিসার তাহসিনুল হক বলেন, ঈদ কেন্দ্র করে ওয়ালটন বাজারে ছেড়েছে অসংখ্য নতুন মডেলের পণ্য। রয়েছে ফ্রিজ, টিভি, এসি, স্মার্টফোনসহ হাজারো ইলেকট্রনিকস, ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রিক্যাল পণ্য। আগের মতোই এ ঈদেও ওয়ালটনের ফ্রিজ, টিভি, এসিসহ অন্যান্য পণ্য বিক্রি হচ্ছে চোখে পড়ার মতো। শোরুমের বিক্রয় প্রতিনিধিরাও এ বাড়তি ক্রেতাসমাগম ভালোভাবেই সামাল দিচ্ছেন। ওয়ালটন পণ্যের সাশ্রয়ী দাম, উচ্চ গুণগতমানের পাশাপাশি সর্বোচ্চ বিক্রয়োত্তর সুবিধা থাকায় ঈদের আগে শোরুমগুলোতে বিভিন্ন পণ্য বিক্রির উৎসব চলছে বলে জানিয়েছে ওয়ালটন।
বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশের ইলেকট্রনিকসের বাজার গত ১০ বছরে গড়ে ১৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। চলতি বছর এর আকার ৬ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান, মাথাপিছু আয় ও শহরে মানুষের বসবাসের প্রবণতা বাড়ার সঙ্গে কনজিউমার ইলেকট্রনিকসের বাজারের প্রবৃদ্ধি ওতপ্রোত জড়িত। বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের (বিসিজি) পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২০ লাখ, যা ২০২৫ সালে ৩ কোটি ৪০ লাখে দাঁড়াবে। প্রতি বছর এ শ্রেণিতে গড়ে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ যোগ হচ্ছে সক্ষমতার তালিকায়। একসময় দেশে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি ব্র্যান্ডের দাপট ছিল। গত দেড় দশকে সরকারের নীতিসহায়তায় বর্তমানে দেশিবিদেশি ১৩টি কোম্পানি দেশে ফ্রিজ উৎপাদন করে বাজারজাত করছে। দেশে ফ্রিজের বাজার ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।