বর্ষায় যেখানে অথৈ পানি, শুকনা মৌসুমে সেখানে সবুজ ধানের খেত। বিস্তীর্ণ ধানের খেতের পাশে মাঝে মাঝে দেখা মিলবে ছোট ছোট কুঁড়েঘর। অস্থায়ী এসব ঘর বানিয়ে বসবাস করেন জিরাতিরা। বোরো মৌসুম সামনে রেখে জিরাতিরা হাওরে এসব অস্থায়ী ঘর বানিয়ে বোরো আবাদ করেন। ছোট ছোট এসব ঘরের ভিতর বাঁশের মাচা বেঁধে জিরাতিরা থাকেন মাচার ওপর। আর গরু রাখা হয় নিচে। হাওরে কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে নেই কোনো গাছপালা কিংবা কোনো ছায়া। এসব ঘরই তাদের আশ্রয়। হাওরে জিরাতিদের জন্য নেই বিশুদ্ধ পানীয়জলের ব্যবস্থা, নেই স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট। বিরূপ পরিবেশকে মানিয়ে নিয়েই বছরের সাতটি মাস তাঁরা কাটিয়ে দেন হাওরে। কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলী এই চারটি হাওর উপজেলা। মূলত বোরো ধানের ওপরই নির্ভর হাওরের মানুষ। বোরো আবাদের জন্য কার্তিক মাস থেকে হাওরে ছুটে আসেন জিরাতিরা। তৈরি করেন অস্থায়ী ছোট ছোট কুঁড়েঘর। জমি চাষাবাদ থেকে শুরু করে পরিচর্যা, সার ও কীটনাশক ছিটানো সব কাজই করেন তাঁরা। বৈশাখে ধানকাটা শেষে এসব ঘর ভেঙে ফিরে যাবেন তাঁরা।
কুয়াশাভেজা ভোর থেকে শুরু হয় জিরাতিদের কর্মব্যস্ততা। চলে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। ভোরের কনকনে ঠান্ডা হাওয়া আর দুপুরের প্রখর রোদে পুড়ে জমিতে নিরবচ্ছিন্ন শ্রম দিতে হয় তাদের। জিরাতিদের ভাগ্যে জোটে না পুষ্টিকর খাবার। কাজের ফাঁকে তারা নিজেরাই খাবার রান্না করেন। বেশির ভাগ সময় থাকে মোটা চালের ভাত আর মরিচ ভর্তা। নয়তো পান্তা ভাত। পুরো সময়টাতে তাদের খোলা স্থানে প্রাকৃতিক কর্ম সারতে হয়। বছরের সাত মাস অবর্ণনীয় কষ্ট করে মাঠে পড়ে থাকেন হাজার হাজার জিরাতি। এত কষ্টের পরও নিরাপদে ফসল ঘরে তুলতে পারলে তাদের চোখে-মুখে থাকে আনন্দের ঝিলিক। আগাম বন্যায় ফসল তলিয়ে গেলে কষ্টের সীমা থাকে না। বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ এভাবেই চলছে তাঁদের জীবন। ইটনা উপজেলার আলালের হাওরে জমি চাষ করতে আসা তাড়াইল উপজেলার কাজলা গ্রামের জিরাতি কৃষক আছাব উদ্দিন বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেকেই আমরা হাওরে জিরাতি করে আসছি। ছোট ছোট কুঁড়েঘরে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। এটা তেমন সমস্যা হয় না। তবে বিশুদ্ধ খাবার পানি ও টয়লেটের সমস্যার কারণে কষ্ট হয়। এ ছাড়া হঠাৎ অসুস্থ হলে সহজে চিকিৎসা মিলে না।’ করিমগঞ্জ উপজেলার সাকুয়া পশ্চিমপাড়া গ্রামের কৃষক আবুল কালাম বলেন, ‘কার্তিক মাসে আমরা হাওরে এসে কুঁড়েঘর বান্ধি। জমিতে বোরো আবাদ করি। শুকনো মৌসুমে হাওরে প্রচুর ঘাস থাকায় এখানে গরু লালন-পালন করি। এতে করে নির্জন হাওরে আমরা দুধ পাই। গরু বিক্রিও করি। বৈশাখে ধানকাটা শেষে সবকিছু নিয়ে বাড়ি ফিরে যাই।’ কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক আবুল কালাম আজাদ জিরাতিদের দুর্ভোগের কথা স্বীকার করে জানান, তাদের জন্য মানসম্মত স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করার জন্য উচ্চমহলে কথা বলেছেন। ভবিষ্যতে তাদের কষ্ট লাঘব হবে বলে আশা করছেন তিনি।