বণিক বার্তা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের যৌথ উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী অষ্টম নন-ফিকশন বইমেলা শেষ হয়েছে। ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ প্রাঙ্গণে গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী এ মেলার সমাপনী অনুষ্ঠান ছিল আজ সোমবার।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে আসিফ নজরুল বলেন, আমাদের নন-ফিকশন বই আরো অনেক বেশি পড়া দরকার। ক্রমান্বয়ে আমরা ফেসবুকের তথ্যনির্ভর জাতিতে পরিণত হয়েছি। নন-ফিকশন বই না থাকলে আমাদের জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে উঠবে না। গত ১৫ বছরে আমাদের জ্ঞানের রাজ্যে যে অনাচার চলেছে, সেটি নিয়ে আমরা বলতে পারি জ্ঞানের রাজ্যে জেনোসাইড (গণহত্যা) হয়েছে। আমি কিছুদিন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালে গ্রন্থ কেন্দ্রে গত দুই বছরের ক্রয় করা বইয়ের তালিকা চাইলাম। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় কী কী বই রাখে, ঘুরে দেখলাম। আশ্চর্যজনকভাবে দেখলাম, সেখানে কেনা বইগুলোর মধ্যে ৯৫ শতাংশই নন-ফিকশন। এ ৯৫ শতাংশের ৯৫ শতাংশই হচ্ছে বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা বা তাদের পরিবারকে নিয়ে। এমনকি বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের ওপরও প্রায় ২০-২৫টা বই আছে। এখানে একটা অনাচার চলেছে। জঘন্য অকথ্যমানের বই কেনা হয়েছে, যেখানে কোনো ধরনের গবেষণা নেই।
ভালো গবেষণামূলক বইগুলোকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে উল্লেখ আইন উপদেষ্টা বলেন, অনেক লেখকের বই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি উচ্চ আদালতের বিচারক উপন্যাসের ভাষা পরিবর্তন করে দিয়ে বলেছেন যে, এভাবে উপন্যাস লেখা যাবে না। উপন্যাস ছাপা হয়ে যাওয়ার পর ভাষা পরিবর্তন করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় সর্বাধিনায়ক এ কে খন্দকারের একটা কথাকে কেন্দ্র করে একটি প্রকাশনা উনার বই পুনঃমুদ্রণের সাহস করেনি ৫-৬ বছর। এই যে অনাচার চলেছে জ্ঞানের রাজ্যে, এটিকে মুক্ত করার এক অপূর্ব সুযোগ এনে দিয়েছে আমাদের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, ছাত্রনেতা, যুবক, তাদের অভিভাবক ও সর্বস্তরের মানুষ। আমরা যেন এটিকে খুব ভালোমতো ব্যবহার করি। আমাদের এখানে যেন অনেক ভালো মানের গবেষণা ও এ ধরনের বইমেলা হয়, সেই আশা রাখি।
এবারের মেলায় দেশের মোট ৩৯টি প্রকাশনা ও গবেষণা সংস্থা অংশ নিয়েছে। অংশ নেওয়া প্রকাশকদের মনোনীত বই থেকে বিচারক প্যানেল ২০২৪-এর চারটি নন-ফিকশন বই নির্বাচিত করে ‘নন-ফিকশন গ্রন্থ সম্মাননা ২০২৪’ প্রদান করা হয় সমাপনী অনুষ্ঠানে। সম্মাননাপ্রাপ্ত বিজয়ী গ্রন্থ ও লেখকরা হলেন, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘সাতচল্লিশের দেশভাগে গান্ধী ও জিন্নাহ’; সিরাজ উদ্দিন সাথীর ‘বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতি: মওলানা ভাসানী ও বেহাত বিপ্লব’; অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের ‘অর্থশাস্ত্র: ইতিহাস দর্শন রাষ্ট্রনীতি’ এবং প্রয়াত হায়দার আকবর খান রনোর ‘সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদ: ইতিহাসের পাণ্ডুলিপি’।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘বইয়ের এখন মর্যাদা ও আকর্ষণ কমেছে— সবই সত্য। কিন্তু এটাও সত্য যে, বই ছাড়া মানুষের চলবে না। বই মানুষের মনুষ্যত্ব বিকাশ, চর্চা ও অনুশীলনে সহযোগী। আমরা দেখছি, নন-ফিকশন বই ক্রমাগত মূল্যবান হয়ে উঠছে। এখন অনেক বাণিজ্য বেড়েছে। কিন্তু বাণিজ্যের মধ্যে যে মানবিকতার চর্চা দরকার, এই বইয়ের মেলা আমাদের সে কথাটাই মনে করিয়ে দেয়।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, বইয়ের ক্ষেত্রে লেখকদের প্রধান অনুপ্রেরণা হচ্ছে পাঠক। পাঠকরা যদি বই না পড়ে তাহলে লেখকদের কোনো উৎসাহ থাকে না। লিখতে গেলেও অনেক সমস্যা হয়। পাঠকদের কাছে পৌঁছানোটা অনেক কঠিন। বিশেষ করে নন-ফিকশন বই নিয়ে পত্রপত্রিকায় আলোচনা খুব কম হয়। রিভিউ তো হয়ই না। গ্রন্থ পর্যালোচনা বলে বাংলাদেশে এখন কিছুই হয় না। সব মিলিয়ে এক জটিল পরিস্থিতি। এখানে মিডিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, যেটি পালন করা দরকার।
প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজ উদ্দিন সাথী বলেন, আমার বই ‘মওলানা ভাষানী ও বেহাত বিপ্লব’ বইটি বিচারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, এটি আমার জন্য খুশির বিষয়। আমার এই বইটি লেখা বোধয় স্বার্থক হলো। এই বই লেখার অনুপ্রেরণায় ছিলেন অধ্যপাক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করে এবং পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরা পড়া একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সেই সময়টাকে যেভাবে দেখেছি এবং মওলানা ভাষানীর জীবন ইতিহাসকে আমি যেভাবে অধ্যায়ন করেছি; এই দেশে একটা বিপ্লব হতে পারতো। মোক্ষম সে সুযোগটি আমাদের হাতছাড়া হয়েছে। সে জন্য ‘বেহাত বিপ্লব’ শব্দটা আমি ব্যবহার করেছি।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বণিক বার্তার প্রধান প্রতিবেদক মো. বদরুল আলম। সূচনা বক্তব্য রাখেন বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মাহমুদ ওসমান ইমাম।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ এবং আয়োজনের প্রধান সহযোগী আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিওও কাজী মাহমুদ করিম।
বিডি প্রতিদিন/কেএ