ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসে বাণিজ্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্যের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্ব একদিকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছে, অন্যদিকে ইসলামের শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং ভাষার প্রচারও করেছে। প্রাচীনকালে মুসলমান ব্যবসায়ীরা তাঁদের সততা, বিশ্বস্ততা ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে অমুসলিম সমাজের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন। এখানে ভাষা ও সংস্কৃতির প্রসার এবং ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মুসলিম বাণিজ্যের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হলো—
বাণিজ্য ও ইসলামী সভ্যতা
ইসলামী শাসনের অধীনে বাণিজ্য ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও ব্যাপক।
মুসলিম শাসকরা মুক্তবাজার ব্যবস্থা ও শুল্কমুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আন্তর্দেশীয় বাণিজ্যকে সহজতর করেছেন। মধ্যযুগে মুসলিম বণিকরা ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যবসা পরিচালনা করতেন। মক্কা, বাগদাদ, কায়রো, করাচি, দিল্লি এবং সমরকন্দের মতো শহরগুলো বাণিজ্য ও জ্ঞানের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল।
মুসলিম ও খ্রিস্টান শাসকদের মধ্যে বহু বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, এমনকি ক্রুসেডের সময়ও মুসলিম ও ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা বাণিজ্য চালিয়ে গেছেন।
এ ধরনের অর্থনৈতিক লেনদেন উভয় পক্ষের জন্য উপকারী ছিল এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে সাহায্য করেছিল।
বাণিজ্যের মাধ্যমে আরবি ভাষার প্রসার
আরবি ভাষা শুধু ধর্মীয় কারণেই নয়, বাণিজ্যের কারণে আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিভিন্ন অঞ্চলের বণিক ও ব্যবসায়ীরা আরব ব্যবসায়ীদের সঙ্গে লেনদেন করতে গিয়ে ধীরে ধীরে আরবি ভাষা গ্রহণ করতে শুরু করেন। ফলে বহু আরবি শব্দ বিভিন্ন ভাষায় প্রবেশ করে এবং বহু জাতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে আরবি ভাষা শিখতে আগ্রহী হয়।
মধ্যযুগীয় ভূগোলবিদ ইবন হাওকাল উল্লেখ করেন, আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার বেশির ভাগ মানুষের ভাষা ফারসি হলেও সেখানে আরবি ভাষার ব্যাপক ব্যবহার ছিল। তিনি আরো জানান, পাকিস্তানের মানসুরা ও মুলতানে আরবি এবং সিন্ধি ভাষার প্রচলন ছিল, যা প্রমাণ করে যে বাণিজ্যের মাধ্যমে আরবি ভাষা দক্ষিণ এশিয়ায়ও প্রভাব ফেলেছিল। (ইবন হাওকাল, সুরত আল-আর্দ)।
দক্ষিণ এশিয়ার সিন্ধু, গুজরাট ও মালাবার উপকূলে আরবি ভাষার ব্যাপক প্রভাব দেখা যায়। ১১ শতকের ভ্রমণকারী আল-বেরুনী উল্লেখ করেছেন যে ‘সিন্ধু অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা আরবি ও সংস্কৃত ভাষায় দক্ষ ছিলেন, যাতে তাঁরা আরবদের সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারেন।’
(আল-বেরুনী, কিতাব আল-হিন্দ)।
ইসলামের প্রসার ও বাণিজ্যের ভূমিকা
ইসলামের ইতিহাসে ব্যবসায়ীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, পশ্চিম আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইসলামের প্রসারে ব্যবসায়ীদের বিশেষ অবদান রয়েছে। তাঁরা শুধু ব্যবসার উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করেননি, বরং তাঁদের নৈতিকতা, আচার-ব্যবহার এবং ব্যাবসায়িক সততার কারণে বহু মানুষ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে।
ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ইওন মেরডিন লুইস তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে বাণিজ্যের সঙ্গে ইসলামের সম্পর্কই আফ্রিকার বহু জাতির ইসলাম গ্রহণের মূল কারণ। তিনি বলেন, পশ্চিম আফ্রিকায় বারবার ব্যবসায়ীদের বিশাল কাফেলা সাহারা মরুভূমির মধ্য দিয়ে যাতায়াত করত, যা ইসলাম প্রচারে সহায়ক হয়েছিল। একইভাবে, উত্তর-পূর্ব আফ্রিকায় সোমালি যাযাবর ব্যবসায়ীরা ইসলামের বার্তা বহন করেছিলেন।
মধ্য এশিয়ায় ইসলামের বিস্তারও মূলত ব্যবসায়ীদের মাধ্যমেই ঘটেছে। এখানে ব্যবসার পাশাপাশি সুফি সাধক ও দাঈরা ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন, যা বহু মানুষকে ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়ও ইসলাম প্রধানত ব্যবসায়ীদের মাধ্যমেই ছড়িয়েছে। ইওন মেরডিন লুইস উল্লেখ করেন যে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় ইসলাম প্রথমে বাণিজ্যের মাধ্যমেই প্রবেশ করেছিল এবং পরে এটি রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
ইসলামের বিস্তারে ব্যবসায়ীদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে আফ্রিকায়। ব্রিটিশ নৃতাত্ত্বিক ইয়ান লুইস তাঁর গবেষণায় বলেছেন, ‘ইসলামের সঙ্গে বাণিজ্যের সংযোগই আফ্রিকার বহু জনগোষ্ঠীকে মুসলমান করেছে।’ পশ্চিম আফ্রিকার মালির সম্রাট মানসা মুসার সময়ে ব্যবসায়ীরা ইসলামের প্রচারে মূল ভূমিকা পালন করেন।
ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের দক্ষিণ অংশে ইসলামের প্রচার মূলত ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে হয়েছিল। এই অঞ্চলগুলোর মানুষ মুসলিম ব্যবসায়ীদের ন্যায়পরায়ণতা ও সততায় মুগ্ধ হয়ে স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছিল। ১৩ শতকের আরবি ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন লিখেছেন, ‘ইন্দোনেশিয়ায় ইসলামের বিস্তার বাণিজ্যের মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছিল।’ (ইবন খালদুন, মুকাদ্দিমা)
বাণিজ্যের মাধ্যমে ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ
জ্ঞান ও শিক্ষা প্রসার : ইসলামী সভ্যতায় ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ ছিল জ্ঞানী ও সাহিত্যিক। বিখ্যাত লেখক আল-জাহিজ লিখেছেন, ‘অনেকে মনে করেন যে ব্যবসা বিদ্যার পরিপন্থী, কিন্তু ইতিহাস বলে যে ব্যবসায়ীরাই বহু জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র তৈরি করেছেন।’ (আল-জাহিজ, রিসালাহ)। মুসলিম ব্যবসায়ীরা তাঁদের আয়ের একটি বড় অংশ মসজিদ, মাদরাসা ও গ্রন্থাগার তৈরিতে ব্যয় করতেন।
বণিকদের দান-সদকা ও জনকল্যাণমূলক কাজ : বহু মুসলিম ব্যবসায়ী জনকল্যাণমূলক কাজে যুক্ত ছিলেন। তাঁরা হাসপাতাল, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, সেতু ও আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে সাহায্য করতেন। ১৪ শতকের ঐতিহাসিক আল-মাকরিজি উল্লেখ করেছেন যে ‘মিসরের ব্যবসায়ীরা অসহায়দের সাহায্যের জন্য প্রচুর অর্থ দান করতেন।’ (আল-মাকরিজি, খিতাত)
ইসলামী বাণিজ্যের বিস্তার ও প্রভাব : ইসলামী বাণিজ্যের বিস্তার এতটাই গভীর ছিল যে এটি শুধু মুসলিম বিশ্বকেই নয়, বরং ইউরোপীয় অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলেছিল। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ উইল ডুরান্ট তাঁর বইতে উল্লেখ করেছেন, ইসলামী বাণিজ্য চীন, ভারত, পারস্য, শাম (সিরিয়া ও নিকটবর্তী এলাকা), মিসর এবং ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলকে সংযুক্ত করেছিল। এর ফলে মুসলিম বণিকরা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, স্ক্যান্ডিনেভিয়া, জার্মানি, এমনকি ফিনল্যান্ড পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন।
উইল ডুরান্ট আরো বলেন, ইসলামী বাণিজ্য দশম শতকে চূড়ান্ত বিকাশ লাভ করে, যখন ইউরোপ অবনতির চরম পর্যায়ে ছিল। ইসলামী সাম্রাজ্যের ব্যবসায়ীরা ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে ব্যবসা করেছিলেন এবং সেখানে ইসলামী সংস্কৃতির প্রভাব ফেলেছিলেন। এ সময় ইসলামী অর্থনীতি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে এটি ইউরোপীয় অর্থনীতিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বাধ্য করেছিল।
এ ছাড়া মুসলিম ব্যবসায়ীরা দাস প্রথার বিরুদ্ধে এবং দরিদ্রদের কল্যাণে কাজ করেছিলেন। তাঁরা যুদ্ধবন্দিদের মুক্ত করতে এবং অসহায়দের সহায়তা করতে অর্থ ব্যয় করতেন। তাঁদের মানবিক গুণাবলির কারণে বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায়ের মধ্যে তাঁদের প্রতি আস্থা বৃদ্ধি পায়।
মুসলিম বাণিজ্য চীন, ভারত, আফ্রিকা ও ইউরোপের মধ্যে অর্থনৈতিক সংযোগ স্থাপন করে এবং মুসলিম বিশ্বে কূটনৈতিক সম্পর্ক গঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
মুসলিম ব্যবসায়ীদের সততা ও ন্যায়পরায়ণতা বহু জাতিকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিম ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে ইসলাম প্রচারিত হয়েছিল।
বিডি-প্রতিদিন/সালাহ উদ্দীন