দেশে কার্যরত কোনো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হলে ওই ব্যাংকের আমানতকারীরা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পাবেন। আমানত সুরক্ষা তহবিল থেকে এ অর্থ দেওয়া হবে। তহবিল গঠনের জন্য ‘আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫’ জারি করবে সরকার। আমানত সুরক্ষার মাধ্যমে জনগণের আস্থা বাড়াতে এবং দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক তহবিল গঠন ও হিসাব পরিচালিত হবে বাংলাদেশ ব্যাংকে। ফলে ‘ব্যাংক আমানত বীমা আইনের-২০০০’ অধীনে প্রতিষ্ঠিত ‘আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল’ রহিত এবং ট্রাস্টে জমাকৃত অর্থ আমানত সুরক্ষা তহবিলে প্রাথমিক জমা হিসেবে স্থানান্তর হবে। এ ছাড়াও সদস্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অথবা অন্য কোনো উৎস থেকে নিয়মিত অর্থ সংগ্রহ, প্রিমিয়াম, বিনিয়োগ থেকে আয় এবং নতুন ব্যাংকের ক্ষেত্রে পরিশোধিত মূলধনের দশমিক ৫ শতাংশ প্রাথমিক জমা দিতে হবে।
এবিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের খসড়ায় বলা হয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠান অবসায়নের ক্ষেত্রে আমানতকারীদের সুরক্ষিত আমানত পরিশোধের নিশ্চয়তা প্রদান এবং ‘আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থা’ মানে আমানত সুরক্ষার জন্য কার্যকরী পদ্ধতি। তবে সরকারের আমানত, সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের আমানত, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান-স্বশাসিত সংস্থা ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের আমানত, সদস্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানত, সদস্য প্রতিষ্ঠানের বৈদেশিক শাখায় সংগৃহীত আমানত; বিদেশি সরকারের আমানত, বিদেশি সরকারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের আমানত ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আমানত এ অধ্যাদেশের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। আমানত সুরক্ষা তহবিলের প্রাথমিক কাজ হবে- কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের ক্ষেত্রে আমানতকারীদের ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করা। তবে প্রদেয় সুরক্ষিত আমানতের মোট পরিমাণের তুলনায় আমানতকারীদের প্রদেয় আর্থিক সহায়তার পরিমাণ কোনোক্রমেই বেশি হবে না। সদস্য প্রতিষ্ঠানের গৃহীত ঋণ পরিশোধেও এ অর্থ ব্যয় করা যাবে। এ তহবিল বা এর কোনো অংশ কোনো বিশেষ ঋণের বিপরীতে লিয়েন হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক অধ্যাদেশ বাস্তবায়ন করবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাংগঠনিক কাঠামোর অধীনে ‘আমানত সুরক্ষা বিভাগ’ নামে স্বতন্ত্র বিভাগ গঠন করা হবে। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালক। সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো এ বিভাগ থেকে জারিকৃত বিধি-বিধান, নির্দেশনা ও নীতিমালা অনুসরণ করবে। তহবিলের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হবেন গভর্নর। সাত সদস্যের পর্ষদে এ ছাড়াও অর্থসচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সচিব, আমানত সুরক্ষা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডেপুটি গভর্নর থাকবেন। এ ছাড়া ইসলামী শরিয়াভিত্তিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনে পৃথক উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা যাবে। অনুমোদিত পর্ষদ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি নির্ধারণ এবং সে অনুযায়ী শ্রেণীকরণের ভিত্তিতে সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক প্রিমিয়াম নির্ধারণ করবে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের মধ্যেই অধ্যাদেশটি জারি করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে আমানতকারী অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ১৫ কোটি ৭১ লাখ ২০ হাজার ২২৭টি। এর মধ্যে ২ লাখ বা তার নিচে অর্থ আছে ১৪ কোটি ৭১ লাখ ৩৩ হাজার ৭৩৩টিতে। অর্থাৎ আমানত বীমা বৃদ্ধির কারণে দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ আমানতকারীর অর্থই নিরাপদ হয়ে গেছে। কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হলে ২ লাখ টাকার বেশি থাকা অ্যাকাউন্টের মালিকরা বিপদে পড়বেন। এ ক্ষেত্রে তাদের দেওয়া হবে মাত্র ২ লাখ টাকা।
প্রসঙ্গত, ব্যাংকের আমানতের সুরক্ষা দিতে ১৯৮৪ সালে সর্বপ্রথম একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। অধ্যাদেশকে ২০০০ সালে ব্যাংক আমানত বীমা আইন ২০০০-এ পরিণত করা হয়। সেই আইন অনুযায়ী, গ্রাহকরা যে পরিমাণ অর্থই জমা রাখেন, তার বিপরীতে ব্যাংকগুলো আমানত বীমার আওতায় সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা দিতে পারে।