জাফর ইকবাল-ববিতা-সোনিয়া, ত্রিভুজ প্রেমের দহনে পোড়া তিনটি নাম। ঢাকাই চলচ্চিত্রের ফ্যাশন আইকন খ্যাত নায়ক জাফর ইকবাল পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন প্রায় ৩৩ বছর হয়ে গেল; কিন্তু দীর্ঘদিন পরও এ নায়কের প্রতি তাঁর দর্শক-ভক্তের আগ্রহ কিংবা ভালোবাসা কোনোটি এক রত্তিও কমেনি। তারা তাদের প্রিয় নায়কের স্মৃতিচারণা ও তাঁর জীবনের অন্তরালের গল্প নিয়ে প্রায়শই বিষাদমাখা হৃদয়ে আলোচনায় মুখর হয়ে ওঠেন। এমনকি আজকাল ভক্তদের ফেসবুক পেজেও তারা পোস্ট করেন তাদের আইডল নায়ক জাফর ইকবালের জীবনের নানা অন্তরালের গল্প। এমনই একটি ফেসবুক পেজ যার শিরোনাম- ‘ডেমোক্র্যাসি উইথ মনজুর’, এতে জাফর ইকবাল ও তাঁর স্ত্রী সোনিয়া এবং অভিনেত্রী ববিতাকে নিয়ে গত ৩০ জানুয়ারি একটি পোস্ট দেওয়া হয়। এ পোস্ট পড়ে জাফর ইকবাল-সোনিয়ার জীবনের বেদনাবিধুর কিছু ঘটনার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। পোস্টটি পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো- ‘সোনিয়াকে ভালোবেসেই বিয়ে করেছিলেন জাফর ইকবাল। তবে এটাকে এক অর্থে ভালোবাসা বলা যায় না। তাঁদের ভালোবাসার মধ্যে ববিতা দণ্ডায়মান ছিলেন। যদিও ববিতা তা স্বীকার করেন না। সোনিয়া স্মার্ট আকর্ষণীয় ছিলেন, মডেলিং করতেন। তাঁর বাবা ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম বিলেতফেরত মুসলিম ইঞ্জিনিয়ার। বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে স্মার্ট ও ফ্যাশন আইকন জাফর ইকবালকে বিয়ের পর স্বামীর মধ্যে প্রচুর বেখেয়ালি আচরণ দেখেছেন সোনিয়া। গভীর রাতে মদ্যপ অবস্থায় জাফর ইকবালের বাড়ি ফেরা, ফ্ল্যাটের কলাপসিবল গেট খুলতে দেরি হওয়ায় তীব্র শব্দে গাড়ির হর্ন বাটন উপর্যুপরি ধরে রাখা, দারোয়ানকে গালাগাল করে মারতে উদ্যত হওয়া। এসব দেখে আশপাশের মানুষ অবাক হতেন, তাদের মনে প্রশ্ন জাগত- ‘এই জাফর ইকবাল কি পর্দার সেই সুন্দর মানবিক চরিত্রের জাফর ইকবাল?’ জাফরের স্ত্রী সোনিয়া দেখেছেন তার দাম্পত্য জীবনে ববিতার বিশাল প্রভাব। যে প্রভাবের জন্য তাঁদের দাম্পত্য জীবন সুখের হয়নি। তাঁদের এক ম্যারেজ ডেতে সকালে শুটিংয়ে এফডিসিতে যাওয়ার আগে ব্রেকফাস্ট করছিলেন জাফর ইকবাল। সোনিয়া ছুরি দিয়ে পাউরুটিতে মাখন লাগিয়ে ছেলেকে খাইয়ে দিচ্ছিলেন। তখন জাফর ইকবাল তাঁর পকেট থেকে জুয়েলারির একটা বক্স বের করে স্ত্রীর দিকে ধরে বললেন, ‘কাল রাতে নিউমার্কেট থেকে কিনেছি। তোমার পছন্দ হয় কি না দেখ। পছন্দ না হলে রিটার্ন দিয়ে নিজের পছন্দমতো কিনে নিও।’ এতে সোনিয়া ভীষণ সারপ্রাইজড হলেন। খুশিও হলেন জাফর ইকবালের কাছ থেকে ম্যারেজ ডের গিফট পেয়ে। উপহারটি ছিল এক জোড়া সোনার কানের দুল। বহু অমনোযোগিতা উদাসীনতার মধ্যেও জাফর তাদের জীবনের বিশেষ দিনটি ভোলেননি। এটা দেখে সেদিন সোনিয়া আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু সোনিয়াকে দেখতে হয়েছে তার স্বামী কীভাবে ববিতার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছেন। জাফর ইকবালের মৃত্যুর জন্য অনেকেই সোনিয়াকে দোষারোপ করেছেন। কিন্তু এটা অনেকে জানেন না যে, সোনিয়া ভিকটিম ছিলেন। তাঁকেও সইতে হয়েছে মানসিক নিপীড়ন। তাঁদের দাম্পত্য অশান্তিতে কোনো না কোনোভাবে ববিতা ‘ম্যাটার’ হয়েছিলেন।
১৯৯২ সালের ৮ জানুয়ারি যখন জাফর ইকবালের মৃত্যু হয় তখন মাইকে জাফরের কণ্ঠে গাওয়া বদনাম ছবির গান- ‘হয় যদি বদনাম হোক আরও, আমিতো এখন আর নই কারো’ বাজছিল। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির প্রায় সব চিত্রতারকা ছুটে এসেছিলেন মৃত জাফরকে একনজর দেখতে। ববিতাকে দেখা যাচ্ছিল শোকে কাঁদতে। কিছুক্ষণ পরপর মাথা হেলিয়ে দিচ্ছিলেন ববিতা। সবাই জানতেন ববিতার সঙ্গে জাফরের প্রেমের কথা। শোনা গিয়েছিল সেদিন একজনই শুধু ভীষণ মনঃক্ষুণ্ন ছিলেন ববিতার প্রতি। তিনি জাফর ইকবালের একমাত্র বোন বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ। ভাইয়ের মৃত্যুর জন্য তিনি ববিতার ওপর ক্ষ্যাপা ছিলেন। ‘সুখে থাকো ও আমার নন্দিনী, হয়ে কারো ঘরণী, প্রাসাদেরও বন্দিনী, জেনে রেখো প্রেম কভু মরেনি...’ ভাঙা হৃদয়ে বড্ড অভিমান নিয়ে বেঁচে থাকতে গানটি কণ্ঠে তুলেছিলেন জনপ্রিয় নায়ক জাফর ইকবাল। ১৯৭৫ সালে ইবনে মিজান পরিচালিত ‘এক মুঠো ভাত’ ছবিতে জুটি বাঁধলেন জাফর ইকবাল ও ববিতা। তখনই পাঠকপ্রিয় সিনে পত্রিকা চিত্রালীতে দুজনের ঢাউস রোমান্টিক ছবি ছেপে প্রকাশ করা হলো তাদের প্রেম কাহিনির খবর। ধীরে ধীরে দুজনের সম্পর্ক আর গুঞ্জনে সীমাবদ্ধ থাকেনি। জল গড়ায় বহুদূর। কিন্তু বিধিবাম! এ প্রেম আর পরিণতি পায়নি। কিন্তু কেন এ মধুর সম্পর্ক বিষাদে গড়ায়। একসময় আলাদাভাবে সংসারী হন দুজন। জাফর ইকবালের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে প্রশ্ন করতেই ববিতা স্মৃতিকাতর হয়ে অকপটে স্বীকার করেন- ‘জাফর ইকবালকে ভীষণ পছন্দ করতাম। খুবই স্মার্ট, গুড লুকিং ছিল সে। আমি তাঁকে ভালোবাসতাম, সেও আমাকে ভালোবাসত। শুটিংয়ের অবসরে অথবা নানা আড্ডায় আমাকে গান শেখাত। আমরা দুজন গিটার বাজিয়ে ইংরেজি গানের চর্চা করতাম।’ ববিতা আরও বলেন, ‘অনেক বড় বড় অভিনেতার সঙ্গে কাজ করেছি। অনেকের অভিনয়ে আজও মুগ্ধ আমি। কিন্তু আমার পছন্দের নায়ক ছিল জাফর ইকবাল। তাঁর কিছু জিনিস আমাকে বরাবরই মুগ্ধ করত। তিনি সুদর্শন ছিলেন। তাঁর অভিনয় সাবলীল। তাঁর কণ্ঠ, ব্যক্তিত্ব, ফ্যাশন সচেতনতা, রুচিবোধ চমৎকার। খুব ভালো ইংরেজি গান গাইতে পারতেন। গিটার বাজিয়ে ওর মুখে ইংলিশ গান শোনাটা আমাদের সময়কার যে কোনো মেয়ের জন্য স্বপ্নের একটি মুহূর্ত। ওর মতো পরিপূর্ণ কোনো নায়ক আমাদের চলচ্চিত্রে আসেনি।’ ববিতা আরও বলেন, ‘ও খুব অভিমানী এবং আবেগপ্রবণ ছিলেন। কিছুটা বোহেমিয়ান স্বভাবের। জীবনযাপন ছিল কিছুটা অগোছালো। নিজের সময়ে তো বটেই, পরবর্তী সব প্রজন্মকেই প্রভাবিত করেছেন তিনি। শুধু অভিনয় বা গান দিয়ে নয়, ব্যক্তিত্বের আবেদন, পোশাক, স্টাইল সব মিলিয়ে জাফর ইকবাল যেন ছিলেন এক গল্পের রাজকুমার। নিজস্বতা ছিল অভিনয়ে। সাবলীল, তবে চিত্তহরণে অনন্য।’ বাংলা চলচ্চিত্র তাঁকে মনে রাখবে অনন্তকাল। দুজন দুই ভুবনের বাসিন্দা হলেন কেন? এমন প্রশ্নে ববিতা অনেকটা আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে বললেন, ‘একটা সময় আমার মনে হলো আমরা সহকর্মী হিসেবেই ভালো আছি। এ মধুর সম্পর্কটা আজীবন টিকিয়ে রাখতে হলে বিয়ের বন্ধনে না জড়ানোই ভালো। এখন দেখছি আমার ভাবনাটাই সঠিক ছিল। ওকে আমৃত্যু ভুলতে পারব না।