বিএনপি দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। এ দলের প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও বীর উত্তম খেতাবের অধিকারী তিনি। রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে জিয়াউর রহমান অমরতার অনুষঙ্গ বলে বিবেচিত হবেন অনন্তকাল ধরে। বাংলাদেশে একদলীয় শাসনের অবসান ঘটিয়ে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক শাসনের প্রবর্তক তিনি। বিএনপি এ পর্যন্ত গণতান্ত্রিকভাবে পাঁচবার দেশের শাসনক্ষমতায় এসেছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তাতে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে এমনই বিশ্বাস রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।
বিএনপি বীর উত্তম জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল। মুক্তিযুদ্ধের এই মহান সৈনিকের আদর্শে গড়ে ওঠা দল বারবার ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে। জিয়াউর রহমানের আদর্শকে ধ্বংস করার জন্য তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু জনগণের হৃদয়ে যার স্থান। তাঁকে যে মুছে ফেলা যায় না, এটি আজ প্রমাণিত সত্য। প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও বিএনপি জনগণের দলে পরিণত হয়েছে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে এ দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মানুষের হৃদয়রাজ্যে ঠাঁই করে নিয়েছেন দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে।
মহান মুক্তিযুদ্ধ জিয়াউর রহমানকে জাতীয় ইতিহাসের মহানায়কে পরিণত করে। সেনা অফিসার হিসেবে যিনি দেশবাসীর কাছে ছিলেন অপরিচিত, তিনি জাতীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু করলে জিয়াউর রহমান তাঁর রেজিমেন্ট নিয়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। পরদিন ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাঁর ঘোষণাটি ছিল : ‘আমি মেজর জিয়া, বাংলাদেশ লিবারেশন আর্মির অস্থায়ী সর্বাধিনায়ক, এত দ্বারা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি। আমি আরও ঘোষণা করছি, আমরা ইতোমধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানের অধীনে একটি সার্বভৌম ও বৈধ সরকার গঠন করেছি। এই সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় আইন এবং শাসনতন্ত্র মেনে চলায় অঙ্গীকারবদ্ধ। নতুন গণতান্ত্রিক সরকার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জোট নিরপেক্ষ নীতির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। এ সরকার সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের প্রত্যাশী এবং আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য চেষ্টা করবে। আমি সব সরকারের কাছে আবেদন করছি তারা যেন বাংলাদেশে নৃশংস গণহত্যার বিরুদ্ধে তাদের নিজ নিজ দেশে জনমত গড়ে তোলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের অধীনে গঠিত সরকার বাংলাদেশের সার্বভৌম ও বৈধ সরকার এবং এই সরকার পৃথিবীর সব গণতান্ত্রিক দেশের স্বীকৃতি লাভের অধিকার সংরক্ষণ করে।’
জিয়াউর রহমান নিজের দেশপ্রেম এবং সাহসিকতায় একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের পুরোভাগে চলে আসেন। মেজর জিয়া অস্থায়ী মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র বাহিনী বেশ কয়েক দিন চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে রাখে। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সর্বাত্মক অভিযানের মুখে তারা সীমান্ত অতিক্রম করে নিজেদের সংগঠিত করার কৌশল অবলম্বন করেন।
মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় জিয়াউর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মুক্তিযুদ্ধকালে প্রতিষ্ঠিত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের আস্থার পাত্র হিসেবে বিবেচিত হতেন তিনি। ১৯৭১ সালের জুন মাস পর্যন্ত ১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন জিয়াউর রহমান। পরে তাঁর নামাঙ্কিত ‘জেড’ ফোর্সের প্রধান হিসেবে জিয়াউর রহমান নিজেকে সাহসী যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত করে তোলেন। মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসিকতার জন্য তাঁকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর স্বাধীন বাংলাদেশে সশস্ত্র বাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ পদে উন্নীত করা হয় বীর উত্তম জিয়াউর রহমানকে। ১৯৭৫ সালের ২৫ আগস্ট জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনী প্রধান নিযুক্ত হন। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা ব্রিগেডের সহায়তায় ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এক সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করেন। যা সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে জনমনে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়। সেনাবাহিনীতে দেখা দেয় প্রচণ্ড ক্ষোভ। ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবে মুক্তিলাভ করেন তিনি। এই মহান বিপ্লব স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানকে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। সেনানায়কের পাশাপাশি দেশনায়ক হিসেবেও আভির্ভূত হন তিনি। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে দেশকে গণতন্ত্রের পথে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল তিনি এ উদ্দেশ্যে ঘোষণা করেন তাঁর ঐতিহাসিক ১৯ দফা। এর ভিত্তিতে গঠিত হয় জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগ দল) নামের রাজনৈতিক সংগঠন।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠনের ঘোষণা দেন। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি প্রতিষ্ঠাকালে জাতি ছিল বহুধাবিভক্ত। এই বিভক্তি শুধু ডান, বাম রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তিতেই সৃষ্টি হয়নি, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন বা করেননি অথবা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ও বিপক্ষের শক্তি হিসেবেও তা প্রকট হয়ে উঠেছিল। এই বিভক্তি জাতীয় পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়ে। বিএনপির লক্ষ্য ছিল এই বিভাজন দূর করা এবং সমগ্র জাতি যেন একক সত্তা হিসেবে কাজ করতে পারে, সেজন্য বিবদমান সামাজিক শক্তিগুলোকে একত্রকরণ। প্রতিষ্ঠাকালে বিএনপির নেতৃত্বে ছিলেন তরুণ ও মধ্যবয়সিরা। তাই তরুণদের কাছে এ দলটির আবেদন প্রচুর। ব্যবসাবাণিজ্যে বেসরকারি উদ্যোগকে সম্পৃক্ত করার জন্য দেশের ব্যবসায়ী এবং শিল্পপতিরাও এই দলের প্রতি আকৃষ্ট হন। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের ফলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে দেশের বুদ্ধিজীবী মহল। ইসলামি মূল্যবোধের জন্য দেশের মানুষের মন জয় করে বিএনপি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির অর্জন অনেক। রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ প্রশস্ত হয়। দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়। দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে পেশাদারির সূচনা নতুনভাবে অনুভূত ও কার্যকর হতে থাকে। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন নতুন কর্মসূচি গৃহীত হতে থাকে। জাতীয় অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চারের লক্ষ্যে বেসরকারি উদ্যোগকে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত করা হয় উৎপাদনব্যবস্থায়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় পারস্পরিক সহযোগিতার সূত্র প্রতিষ্ঠার সূচনাও হয় এই সময়কালে।
১৯৭৮ সালের ৩ জুন জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে কিছু বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হলে বিচারপতি আবদুস সাত্তার বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং সরকার গঠন করে। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৯৩টি আসন লাভ করে পুনরায় ক্ষমতাসীন হয়। বিএনপির জন্য আবারও বিশাল জয়ের হাতছানি দিচ্ছে আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় নির্বাচন। যে নির্বাচনের জন্য অপেক্ষায় দেশের ১৮ কোটি মানুষ।
লেখক : বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব,
সাবেক সংসদ সদস্য ও ডাকসুর জিএস