দীর্ঘদিনের অপচর্চা, বিশেষ করে দেড় দশকের স্বৈরশাসনে, দুর্নীতি-দূরাচারে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সব প্রতিষ্ঠানই ভেঙে পড়েছিল। প্রশাসনও ভেসে গিয়েছিল অনিয়মের স্রোতে। আলোচনায় এসেছে প্রশিক্ষণের নামে অপচয়ের প্রসঙ্গ। কর্মকর্তাদের দক্ষতা-অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ আবশ্যক। কিন্তু যথাযথ ব্যবস্থাপনায়, প্রয়োজন ও প্রাসঙ্গিকতার বিচার ছাড়াই দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থের অপচয় হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, সরকারি কর্মচারীদের প্রশিক্ষণে ফি-বছর বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও তার সুফল মিলছে না। কর্মকর্তা যে বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে এলেন, তাকে বদলি করা হলো ভিন্ন কর্মক্ষেত্রে, যেখানে ওই প্রশিক্ষণে অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগানোর সুযোগ বা প্রয়োজন নেই। কদিন পর অবসরে যাবেন, এমন মানুষকেও প্রশিক্ষণ দিয়ে আনা হচ্ছে। ভাবখানা এমন যে ‘সরকারি মাল দরিয়ায় ঢাল’। চলতি অর্থবছরে প্রশিক্ষণের জন্য সোয়া পাঁচ হাজার কোটি টাকারও বেশি বরাদ্দ রয়েছে। প্রায় প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পে দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণ থাকে। এ কার্যক্রমগুলোকে গালভরা অভিধায় শিক্ষাসফর বলা হয়। মধ্যম ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা শিক্ষাসফরের জন্য মুখিয়ে থাকেন। বড় প্রকল্পের জন্য প্রতিষ্ঠান বা পণ্য পছন্দ করার জন্যও কর্মকর্তারা দলবেঁধে ‘আনন্দভ্রমণ’ করেন! এ ক্ষেত্রে দুর্নীতির দ্বিমুখী চর্চা হয়। পণ্য যাচাইবাছাইয়ের জন্য সশরীর পরিদর্শনের দিন আর নেই। ডিজিটাল মাধ্যমেই তা সম্ভব। নেহাত জরুরি হলে একজন বিশেষজ্ঞ সফর করতে পারেন। জনগণের টাকায় পাঁচ-সাতজনের বিদেশভ্রমণ অপরাধ গণ্য হওয়া উচিত। এই দেখাদেখির মাধ্যমেই বিক্রেতার সঙ্গে ক্রেতাপক্ষের অনৈতিক লেনদেনের সুযোগ তৈরি হয়। এমন অনেক নজির নিয়ে অতীতে আলোচনা হয়েছে, এখনো হচ্ছে। এভাবেই দেশের লাখ লাখ কোটি টাকা লোপাট ও পাচার হয়েছে। এটা এখন বন্ধের সময় হয়েছে। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর প্রশিক্ষণে ব্যয় এবং তার মাধ্যমে জাতির প্রাপ্তির হিসাব বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কেন একজন কর্মচারীর, কোন বিষয়ে বিদেশে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন এবং তাতে দেশের কোন ক্ষেত্রে কী লাভ হবে, বাস্তব বিবেচনার মাধ্যমে নির্মোহভাবে সেই কর্মী নির্বাচন করতে হবে। চাকরির প্রথম দিন থেকেই সরকারের প্রতিটি কর্মচারীকে সততা-সদাচারের প্রশিক্ষণ থাকা জরুরি।