আল কোরআন কোনো ইতিহাস গ্রন্থ নয়; কিন্তু এতে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ইতিহাসের তথ্য ও তত্ত্ব। আল কোরআন কোনো সাহিত্যকর্ম নয়; কিন্তু এতে রয়েছে সাহিত্যের সব রসদ। আল কোরআন কোনো গল্প-উপন্যাস নয়; কিন্তু এতে রয়েছে জগতের শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক কাহিনি। আল কোরআন কোনো কাব্যগ্রন্থ নয়; কিন্তু এতে রয়েছে কালোত্তীর্ণ অমর মহাকাব্যের সব ধরনের উপাদান। আল কোরআন জীবন্ত মোজেজা। মানুষের জীবন চলার পথে পরিবেশ ও প্রতিবেশকে ইতিবাচক ও কল্যাণকর রূপে ব্যবহারের পরিশীলিত সুবিন্যস্ত জ্ঞানই হলো বিজ্ঞান। আল কোরআন শ্রেষ্ঠতম মহাবিজ্ঞান। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা কোরআনে কারিমে বলেন, ‘শপথ বিজ্ঞানময় কোরআনের (সুরা ইয়াসিন-২)।’
কোরআনে হাকিমের প্রথম অবতীর্ণ পঞ্চ আয়াতেও তার সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে, ‘পড় তোমার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন; যিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্তপিণ্ড থেকে। পড়; আর তোমার রব মহীয়ান; তিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষাদান করেছেন, মানুষকে তা শিখিয়েছেন, যা সে জানত না (সুরা আলাক ১-৫)।’
বিজ্ঞানীরা তাদের নানা আবিষ্কারে কোরআন থেকে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত হয়েছেন; তাদের তথ্য ও তত্ত্বগুলো কোরআনিক সূত্রের অনুকূলে এসেছে। বিশ্বের বহু সেরা সেরা বিজ্ঞানী কোরআন পড়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। যেমন বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী ড. মরিস বুকাইলি, যিনি ‘বাইবেল, কোরআন ও বিজ্ঞান’ নামক একটি বই লিখেছেন। আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারগুলো ও কোরআন পরস্পর সংগতিপূর্ণ। এত কাল যেসব আয়াতের ব্যাখ্যা করা কঠিন ছিল, আধুনিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞান আমাদের সেসবের অর্থ বোঝার ব্যাপারে সাহায্য করেছে।
আল কোরআনে রয়েছে জ্ঞানবিজ্ঞানের সব মৌলিক বিষয়। যেমন জ্যোতিষশাস্ত্র, বিশ্ব সৃষ্টি ও মহাবিস্ফোরণ (বিগ ব্যাং) প্রসঙ্গ, ছায়াপথ সৃষ্টির আগে প্রাথমিক গ্যাসপিণ্ড, পৃথিবীর আকার গোল। আছে পদার্থবিজ্ঞান, পানিবিজ্ঞান, পানিচক্র, বাষ্পে পরিণত হওয়া। আছে ভূতত্ত্ব বিজ্ঞান, পাহাড়-পর্বতের রহস্য, মহাসাগর, মিষ্টি ও লবণাক্ত পানির বিবরণ এবং রয়েছে উদ্ভিদবিজ্ঞান। রয়েছে প্রাণিবিজ্ঞান, পাখির উড্ডয়ন, মৌমাছির দক্ষতা, মাকড়সার জাল, পিপীলিকার জীবনধারা ও যোগাযোগ। আছে চিকিৎসাবিজ্ঞান, ওষুধ ও পথ্য। রয়েছে শরীরতত্ত্ব, রক্ত চলাচল, দুগ্ধ ও ভ্রƒণতত্ত্ব এবং সাধারণ বিজ্ঞান ও আঙুলের ছাপ ইত্যাদি।
ভ্রƒণতত্ত্ব আধুনিক বিজ্ঞানের জটিলতম একটি বিষয়। আল কোরআনে ভ্রƒণ সৃষ্টি ও এর বিকাশসম্পর্কিত যথাযথ বর্ণনা রয়েছে। ‘আমি তো মানুষকে মাটির উপাদান থেকে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর আমি তাকে শুক্রবিন্দুরূপে এক নিরাপদ আধারে স্থাপন করি, পরে আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি জমাট রক্তে, অতঃপর জমাট রক্তকে পরিণত করি পিণ্ডে এবং পিণ্ডকে পরিণত করি অস্থিপিঞ্জরে, অতঃপর অস্থিপিঞ্জরকে মাংস দ্বারা ঢেকে দিই, অবশেষে তাকে রূপদান করি। সুনিপুণ স্রষ্টা আল্লাহ কত মহান! এরপর তোমরা অবশ্যই মৃত্যুবরণ করবে। অতঃপর কেয়ামতের দিন তোমাদের পুনরুত্থিত করা হবে। আমি সপ্ত আকাশ স্তরে স্তরে সাজিয়েছি, আমি সৃষ্টির বিষয়ে বেখবর নই (সুরা মুমিনুন ১২-১৭)।’
কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনাটমি বিভাগের প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, শীর্ষস্থানীয় ভ্রƒণতত্ত্ববিদদের অন্যতম কিথ মুর, কোরআনের এসব বক্তব্য ও সহিহ হাদিসের বিবরণ সম্পর্কে বলেন, ‘উনিশ শতক পর্যন্ত, মানবীয় বিকাশের ধাপগুলো সম্পর্কে কিছুই জানা ছিল না। উনিশ শতকের শেষদিকে বর্ণমালার প্রতীকের ওপর ভিত্তি করে মানব ভ্রƒণের বিকাশের বিভিন্ন ধাপ চিহ্নিত করা হয়।
ফিলাডেলফিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এনাটমি বিভাগের প্রফেসর ও চেয়ারম্যান এবং ফিলাডেলফিয়ার টমাস জেফারসন বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্যানিয়েল বাও ইনস্টিটিউটের পরিচালক মার্শাল জনসন বলেন, ‘বিজ্ঞানী হিসেবে আমি ভ্রƒণতত্ত্ব এবং ডেভেলপমেন্টাল বায়োলজি বুঝতে পারি। আমাকে যদি আমার আজকের জ্ঞান ও বর্ণনার যোগ্যতাসহকারে সেই যুগে স্থানান্তর করা হয়, কোরআনে যে বর্ণনা রয়েছে সেভাবে বর্ণনা করতে পারব না।’
আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম সাফল্য মহাকাশ বিজ্ঞান। এ বিষয়ে আল কোরআনে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। ‘অবিশ্বাসীরা কী ভেবে দেখে না যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী ওতপ্রোতভাবে মিশেছিল; অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম এবং জীবন্ত সবকিছু পানি থেকে সৃষ্টি করলাম; তবু কি তারা বিশ্বাস করবে না?’ (সুরা আম্বিয়া-৩০)। এটি আধুনিক বিজ্ঞানের ‘বিগ-ব্যাং’ তত্ত্বের অনুরূপ। মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কারের পর আজকের বিজ্ঞান প্রমাণ করে, প্রতিটি জীবের কোষের ৯০ শতাংশ পানি দিয়ে গঠিত। অথচ কোরআন ১৪০০ বছর আগেই সে তথ্য আমাদের জানিয়েছে। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন : ‘এবং প্রাণবন্ত সবকিছু আমি পানি থেকে সৃষ্টি করলাম (সুরা আল আম্বিয়া-৩০)।’
লেখক : খতিব, আমলীগোলা জামে মসজিদ, লালবাগ, ঢাকা
বিডি প্রতিদিন/এমআই