রাষ্ট্র সংস্কার ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সরকার এককভাবে জরুরি অবস্থা জারি করতে পারবে না। এজন্য আগের বিধান থেকে সরে এসে প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। তবে মন্ত্রিসভায় আলোচনাকালে সেখানে প্রধান বিরোধীদলীয় নেতার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। বিরোধীদলীয় নেতার অনুপস্থিতিতে উপনেতা উপস্থিত থাকবেন। এ ছাড়া জ্যেষ্ঠতম বিচারককে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের প্রস্তাবে একমত হয়েছে দলগুলো।
গতকাল রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে দ্বিতীয় দফা সংলাপের ১২তম দিনের আলোচনায় এ সিদ্ধান্ত হয়। ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজের সভাপতিত্বে ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দারের সঞ্চালনায় সংলাপে উপস্থিত ছিলেন ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. বদিউল আলম মজুমদার, সফর রাজ হোসেন ও ড. মো. আইয়ুব মিয়া। সংলাপে ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি অংশ নেন।
সংলাপ শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা সংক্রান্ত সংবিধানের বিদ্যমান অনুচ্ছেদ ১৪১(ক) এ সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয় যুক্ত করার প্রস্তাবে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা হয়েছে। বিষয়গুলো হলো- অনুচ্ছেদ ১৪১(ক) সংশোধনের সময় ‘অভ্যন্তরীণ গোলযোগের’ শব্দগুলোর পরিবর্তে ‘রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার প্রতি হুমকি বা মহামারি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত হবে। জরুরি অবস্থা ঘোষণার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতিস্বাক্ষরের পরিবর্তে মন্ত্রিসভার অনুমোদন যুক্ত করতে হবে। আর জরুরি অবস্থা ঘোষণা সম্পর্কিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে বিরোধীদলীয় নেতা অথবা তার অনুপস্থিতিতে বিরোধীদলীয় উপনেতাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এ ছাড়া জরুরি অবস্থা চলাকালীন অনুচ্ছেদ ৪৭(ক) এর বিধান মতে কোনো নাগরিকের জীবনের অধিকার এবং বিচার ও দণ্ড সম্পর্কে বিদ্যমান সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৌলিক অধিকারসমূহ খর্ব করা যাবে না।
এর আগে ৭ জুলাইয়ের আলোচনায় অতীতে এই বিধান অপপ্রয়োগের বিষয় তুলে ধরে বিদ্যমান সংবিধানের ১৪১(ক) অনুচ্ছেদ সংশোধন এবং জরুরি অবস্থা ঘোষণা যেন রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে অপব্যবহার না হয় সে বিষয়ে সবকটি রাজনৈতিক দল এবং জোট একমত হয়েছিল।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, রাজনৈতিক দল এবং জোটসমূহ প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৫-এ সুস্পষ্টভাবে কিছু বিষয় যুক্ত করার প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়েছে। এ ক্ষেত্রে যুক্ত করতে হবে- রাষ্ট্রপতি আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দান করবেন। অবশ্য কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখ করে যদি জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করে তবে তারা সংবিধানে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম দুজন বিচারপতির মধ্য থেকে যে কোনো একজনকে রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দান করবেন- এমন বিধান সংযোজন করতে পারবে। তবে এতে শর্ত রয়েছে। তা হলো- অসদাচরণ ও অসামর্থ্যরে অভিযোগের কারণে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৬ এর অধীন কোনো বিচারপতির বিরুদ্ধে তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান থাকলে তাকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দান করা যাবে না।
জরুরি অবস্থা জারির বিধান পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, অতীতে এই বিধানের অপব্যবহার হওয়ায় আগামীতে কেউ তা করবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। জরুরি অবস্থা জারিসংক্রান্ত মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত গ্রহণ বৈঠকে বিরোধীদলীয় নেতা উপস্থিত থাকবেন। অধিকাংশ রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে। ফলে এ আইনের অপব্যবহার হলেও প্রতিবাদ করতে পারবেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতি নিয়োগের বিষয়ে রাষ্ট্রপতির সীমাহীন ক্ষমতা কমিয়ে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম দুজনের মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। যদি সিনিয়র মোস্ট দুর্নীতিগ্রস্ত বা জুডিশিয়ারির নানান সাজার দায়ে অভিযুক্ত থাকেন তাহলে দ্বিতীয়জন হবেন। ১ না ২ জনের মধ্যে এ বিষয়ে সমাধান না হওয়ায় কোনো রাজনৈতিক দল যদি জনগণের ভোটে ম্যান্ডেট প্রাপ্ত হয়, তবে জ্যেষ্ঠতম দুজনের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে পারবে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এসব বিষয় নিয়ে আগামীতে জাতীয় সংসদে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, জরুরি অবস্থা জারিতে মন্ত্রিপরিষদ ও প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি বিরোধীদলীয় নেতা বা উপনেতার মতামত নিতে হবে। এরপর অধ্যাদেশ জারি করবেন রাষ্ট্রপতি। এ বিষয়ে বেশির ভাগ দলই একমত হয়েছে। তিনি বলেন, বিদ্যমান আইনে জরুরি অবস্থা জারি করেন প্রেসিডেন্ট। এতে শুধু স্বাক্ষর করেন প্রধানমন্ত্রী। আমরা বলেছি, এ ক্ষেত্রে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক ডেকে বিরোধীদলীয় প্রধানেরও মতামত নিতে হবে। কোনো কারণে তিনি অনুপস্থিত থাকলে বিরোধীদলীয় উপনেতার মতামত নিতে হবে। আর যদি তখন সংসদ কার্যকর না থাকে, তাহলে সর্বশেষ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের সংসদের সরকার ও প্রধান বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। অর্থাৎ সবার সম্মিলিত সিদ্ধান্ত থাকতে হবে। তিনি আরও বলেন, জামায়াত চায় আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতিই হবেন প্রধান বিচারপতি। যদিও কয়েকটি দলের মতামত দুজন বা তিনজনের প্যানেল থেকে একজনকে বাছাই করা হবে। আমরা মনে করি, এতে ফ্যাসিবাদের সমর্থকদের ঢুকে পড়ার সুযোগ হয়ে যেতে পারে। অথবা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে নিয়োগ হতে পারে। তিনি জানান, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত একমত হওয়া যায়নি। আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আলোচনা সম্পন্ন না হলেও আমরা চাই এটি যেন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
জরুরি অবস্থা যেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার না হয় এমন আইন করার জন্য ঐকমত্য কমিশনকে বলেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য জাবেদ রাসিন বলেন, আমরা জরুরি অবস্থাকে তিনটি ভাগ করতে বলেছিলাম, যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মহামারি এবং অভ্যন্তরীণ গোলযোগের ক্ষেত্রে। অভ্যন্তরীণ গোলযোগের পরিবর্তে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব বা ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রশ্নে যদি জরুরি অবস্থা জারির মতো পরিস্থিতি দেখা দেয় সে ক্ষেত্রে সরকার জরুরি অবস্থা জারি করতে পারবে। জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রে আগে যেমন রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর অনুস্বাক্ষরে জরুরি অবস্থা জারি করতে পারতেন, সেখানে সেটা মন্ত্রিসভায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কলেবর একটু বর্ধিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে এনসিপি একমত পোষণ করেছে। তিনি বলেন, জরুরি অবস্থা যেহেতু একটা জরুরি বিষয় এবং এই সময়ে সরকারকে তড়িৎ সিদ্ধান্ত নিতে হয় সেক্ষেত্র এটি এক্সিকিউটিভের কাছে থাকাই বাঞ্ছনীয়। বিরোধী দলের সিদ্ধান্তের বিষয়ে কথা হয়েছিল, আমরা বলেছি বিরোধী দলের প্রধান এ বৈঠকে উপস্থিত হতে পারেন, তার মতামত তিনি দিতে পারেন।
যদি বিরোধীদলীয় প্রধানের কথা জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষেত্রে মূল্যায়ন না করা হয় সেক্ষেত্রে কী হবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, জরুরি অবস্থা ঘোষণার বৈঠক থেকে বের হয়ে বিরোধীদলীয় নেতা যদি জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন, তাহলে এর প্রভাব পড়বে এবং প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকার দ্বার উন্মুক্ত হবে। প্রধান বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে জাবেদ রাসিন বলেন, প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে কর্মে প্রবীণতম আপিল বিভাগের বিচারপতিকেই রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ করবেন। কিন্তু বৈঠকে কর্মে প্রবীণতম দুজন না একজন সেটা নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দেয়। পরে কমিশন সিদ্ধান্ত নেয় কর্মে প্রবীণতমকেই প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেবেন, কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় গিয়ে জ্যেষ্ঠ দুজনের মধ্যে একজন সেটা সংবিধান সংশোধন করে করতে পারবেন। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে অর্থাৎ শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের একটা রূপরেখা এনসিপি দিয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে এই বিচারাঙ্গনে নিয়ে আসার কারণে যে রাজনীতিকীকরণ করা হয়েছে আমরা সেটার ঘোরবিরোধী।