১৯৭০ সালে মুক্তি পেল নায়করাজ রাজ্জাক ও সুচন্দা অভিনীত আমির হোসেন পরিচালিত ‘যে আগুনে পুড়ি’। চলচ্চিত্রটি যতটা না সাফল্য পেয়েছে তার চেয়ে বেশি সফল হয়েছে এর ‘চোখ যে মনের কথা বলে’ গানটি। এটি আজও কালজয়ী হয়ে আছে। এ গান সৃষ্টির নেপথ্য কথা জানিয়েছেন অভিনেত্রী সুচন্দা। তাঁর বলা কথা তুলে ধরেছেন- আলাউদ্দীন মাজিদ
‘চোখ যে মনের কথা বলে, চোখে চোখ রাখা শুধু নয়, চোখের সে ভাষা বুঝতে হলে, চোখের মতো চোখ থাকা চাই...’ চোখ নিয়ে লেখা অপূর্ব এবং শাশ্বত এ বাংলা গানটি ক্যারিয়ারের শুরুতেই ১৯৭০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘যে আগুনে পুড়ি’ চলচ্চিত্রে সুর দেওয়ার পাশাপাশি গেয়েছিলেন খোন্দকার নূরুল আলম। তাঁর জাদুকরী কণ্ঠে গানটি আজও অনেককেই মুগ্ধ করে। মার্জিত ভাষা আর মিষ্টি সুরের এমন রোমান্টিক গানের আবেদন বাংলা চলচ্চিত্রে খুব কমই এসেছে। গানটিকে ধরা হয় বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বকালের সেরা গানগুলোর একটি। গানটির নেপথ্যের গল্প শোনা গেছে নন্দিত চলচ্চিত্র অভিনেত্রী সুচন্দার কণ্ঠে। কারণ এ গানটি সুচন্দার হরিণী চক্ষুযুগল দেখেই রচনা করেছিলেন গীতিকার কাজী আজিজ আহমেদ। জানা যায়, ‘যে আগুনে পুড়ি’ ছবির শুটিং চলাকালীন গীতিকার তাঁকে উদ্দেশ করেই তাৎক্ষণিকভাবে গানটি লিখে ফেলেছিলেন। অভিনেত্রী সুচন্দার কথায় জেনে নেওয়া যাক গানটির নেপথ্যের গল্প- এই গানটি শুনলে স্মৃতিবিজড়িত তারুণ্যের সময়কালটায় আমি ফিরে যাই। আজও আমি গানটির সৃষ্টির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ফিরে যাচ্ছি তারুণ্যের সেই মুহূর্তগুলোতে। নায়করাজ রাজ্জাক এবং আমার একটি ছবির শুটিং ছিল সেদিন। শট রেডি, চিত্রায়িত হতে যাচ্ছে একটি রোমান্টিক দৃশ্য। এরই মাঝে হঠাৎ দেখলাম লম্বা এবং পাতলামতো এক ভদ্রলোক পান চিবোচ্ছেন আর আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। আমি এতে বিব্রতবোধই করছিলাম। তাই পাশে বসা সহকারী পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম ভাইকে জানালাম যে, এভাবে তাকিয়ে থাকলে তো আমি রোমান্টিক শট ঠিকমতো দিতে পারব না। আপনি উনাকে একটু অন্য জায়গায় গিয়ে বসতে বলুন। চাষী ভাইয়ের কাছে ভদ্রলাকের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে শুধু বললেন, আপনি এ ভদ্রলোকের উপস্থিতির কথাটা ভুলে গিয়েই শট দিন। একটু পরেই আপনাকে উনার পরিচয় জানানো হবে। সেই মোতাবেক আমি আর কোনো উচ্চবাচ্য না করে রাজ্জাকের সঙ্গে রোমান্টিক দৃশ্যের শট দিতে প্রস্তুতি নিলাম। এরপর আরও অনেক দৃশ্যের শুটিং চলছিল। এরই ফাঁকে চাষী ভাই হাতে লেখা একটি কাগজের পৃষ্ঠা আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। কাগজে লেখা কবিতা পড়তে গিয়ে আমার চোখ মুগ্ধতায় আটকে গেল। প্রথম চারটি লাইন ছিল এরকম- ‘চোখ যে মনের কথা বলে, চোখে চোখ রাখা শুধু নয়, চোখের সে ভাষা বুঝতে হলে, চোখের মতো চোখ থাকা চাই।’ পুরো কবিতাটি পড়ার পর এবার উনার দিকেই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকার পালা শুরু হলো আমার। পরে জানতে পারি ইনি হলেন প্রখ্যাত চিত্রনাট্যকার, কাহিনিকার, চিত্র পরিচালক, সংলাপ রচয়িতা এবং গীতিকার কাজী আজিজ আহমেদ।’ গানটি লেখা হয়েছিল ১৯৬৮ সালে। দুই বছর পরে ১৯৭০ সালে ‘যে আগুনে পুড়ি’ চলচ্চিত্রের জন্য এ গানটিতে সুর ও কণ্ঠ দিয়েছিলেন প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক খন্দকার নূরুল আলম। নায়করাজ রাজ্জাক ছবিতে নায়িকা সুচন্দার চোখের দিকে তাকিয়েই গানটি গেয়েছিলেন। এ গানটি দিয়েই জনমানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন গীতিকার কাজী আজিজ আহমেদ।