নাহমাদুহু ওয়ানুসাল্লি আলা রাসুলিহিল কারিম- কোরআনুল কারিমের শবেকদরের তাৎপর্য বর্ণনায় যে সুরাটি নাজিল হয়েছে, সেটি হচ্ছে সুরা কদর। এতে ইরশাদ হচ্ছে : ‘আমি তা অর্থাৎ কোরআনুল কারিম নাজিল করেছি শবেকদরে। শবেকদর সম্বন্ধে আপনি কী জানেন? শবেকদর হলো, হাজার রাত্রি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এতে প্রত্যেক কাজের জন্য ফেরেস্তাগণ ও রুহ অবতীর্ণ হয়, তাদের প্রভুর নির্দেশক্রমে। এটি ফজরের উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।’
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত; নবী করিম (সা.) একবার বনি ইসরাইলের জনৈক মুজাহিদ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বললেন, তিনি অনবরত এক হাজার মাস পর্যন্ত জেহাদে লিপ্ত থাকেন, সাহাবিগণ এ কথা শুনে হতবাক হলেন। তখন সুরা কদর নাজিল হলো এবং এতে লাইলাতুল কদরের তাৎপর্য বর্ণনা করে ইরশাদ হলো, ‘লাইলাতুল কাদরি খাইরুম মিন আলফিশাহর’। শবেকদর এক হাজার রাত্রি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। অর্থাৎ এক হাজার মাস এবাদত করার যে সওয়াব, শবেকদরের এক রাত্রির ইবাদতের সওয়াব তার চেয়েও বেশি।
লাইলাতুল কদরের অর্থ মহাত্ম বা সম্মানিত রাত। আল্লামা কুরতরী (রহ.) এই রাতকে লাইলাতুল কদর বলার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বড় চমৎকারভাবে বলেন। এ রজনীকে শবেকদর এজন্য নামকরণ করা হয়েছে, এ রাতে আল্লাহতায়ালা সম্মানিত কিতাব কোরআনুল কারিম সম্মানিত রসুল (সা.)-এর ওপর সম্মানিত উম্মতের জন্য অবতীর্ণ করেছেন। কদরের আরেক অর্থ তকদির এবং হুকুমও হয়ে থাকে। এই রাতে পরবর্তী এক বছরের তকদির সম্পর্কে সার্বিক দায়িত্ব চারজন ফেরেস্তার কাছে সোপর্দ করা হয়। কোরআনুল কারিমে সুস্পষ্টভাবে শবেকদরের মাস রমজানুল মোবারক বলা হলেও সঠিক তারিখ সম্পর্কে কিছু না বলাতে এর নির্দিষ্ট তারিখ সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত দেখা যায়। সহিহ বোখারির এক রেওয়ায়েতে ইরশাদ হচ্ছে : ‘রমজানের শেষ দশকে শবেকদর অন্বেষণ কর।’ মুসলিম শরিফের রেওয়ায়েতে আছে, ‘শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে শবেকদর তালাশ কর।’
বান্দারা যাতে শবেকদরের অনুসন্ধানে রমজানের শেষ দশ দিনে বিজোড় পাঁচটি রাতের প্রত্যেক রাতেই ইবাদতে মশগুল থাকে, তজ্জন্য শবেকদর অনির্দিষ্ট রাখা হয়েছে। তবে অধিকাংশ সাহাবি এবং ইমামগণের মতামত এমনকি হজরত উবাইবিন কাব (রা.) তো কসম করেই বলতেন, শবেকদর ২৭ তারিখেই। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ইরশাদ করেন, ‘আমি শেষ দশ দিনের বিজোড় রাতের ওপর গবেষণা করে সপ্তম রাতকেই অধিক যৌক্তিক পেয়েছি। কেননা আসমান সাতটি এবং জমিনও সাতটি, সমুদ্র সাতটি, ছাফা মারওয়ার মাঝখানে সাতবার ছাঈ। কাবা শরিফের তাওয়াফ সাতবার। কঙ্কর নিক্ষেপও সাতটি, কোরআনুল কারিমের কেরাত সাত প্রকার। সেজদার সময়ও সাতটি অঙ্গ ব্যবহার হয়। মোট কথা সাতের ব্যবহারিক এ তাৎপর্য আমাদের শবেকদর ২৭ তারিখ হওয়ার প্রতি ইঙ্গিতকর। শবেকদরের তাৎপর্য এবং ফজিলত অপরিসীম, আয়াতে তো এ এক রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়ে অধিক বলা হয়েছে। এক হাজার মাস ৮৩ বছর থেকে কিছু বেশি হয়। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, যে ব্যক্তি ইমান এবং এখলাস সহকারে এই রাতে ইবাদতে মশগুল থাকবে, তার অতীতের সব গুনাহ (তওবার কারণে) মাফ হয়ে যাবে।’ হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) ইরশাদ করেন, ‘শবেকদর সিদরাতুল মুনতাহায় অবস্থানকারী সব ফেরেস্তা হজরত জিবরাইল (আ.)-এর সঙ্গে দুনিয়ায় অবতরণ করে মদ্যপায়ী ও শূকরের গোশত ভক্ষণকারী ব্যতীত প্রত্যেক মুমিন নরনারীকে সালাম করেন।’ ফেরেস্তাগণের এ আগমন আল্লাহর আদেশেই হয়ে থাকে।
তাই হজরত আয়েশা ছিদ্দিক (রা.) ইরশাদ করেন : হুজুর আকরাম (সা.)-এর এ নিয়ম ছিল, যখন রমজানের শেষ দশ দিন শুরু হতো, তিনি একাকিত্ব গ্রহণ করতেন এবং রাতগুলোকে ইবাদত দ্বারা জিন্দাহ রাখতেন এবং এতেকাফ গ্রহণ করতেন, অন্যদের এভাবে উপদেশ দিতেন।
হজরত আয়েশা (রা.) একবার হুজুর আকরাম (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রসুলুল্লাহ! যদি আমি শবেকদর পাই, কী দোয়া করবেন? প্রিয় নবী (সা.) উত্তরে বললেন, তুমি এ দোয়া কর, ‘হে আল্লাহ আপনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, ক্ষমা আপনি ভালোবাসেন, অতএব আমার গুনাহসমূহ মাফ করুন।’
অতএব উম্মতে মুহাম্মদির উচিত এ মহান রাতের বরকত এবং ফজিলত গ্রহণ করত জীবনকে ধন্য করা। বস্তুত সারা রাত নামাজ, তেলাওয়াতে কালামে পাক, জিকির-আসকার, তাসবিহ, তাকদিস, দরুদ শরিফ, কবর জিয়ারত ইত্যাদি বিভিন্নমুখী ইবাদতের মধ্য দিয়ে এ রাতের মহিমা রক্ষা করত আমাদের জিন্দেগিকে আল্লাহর বন্দেগিতে কাটাবার শপথ নিতে হবে। খোদার ইবাদতে খোদার রাহে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করতে এ রাতের শিক্ষা ধারণ করে।
♦ লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক