১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধ কমান্ড কাউন্সিল স্থাপিত হয়। সেসব অফিসের সাইনবোর্ডে একটি লোগো রয়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা একটি বেয়নেটধারী রাইফেল ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। নিচে লেখা রয়েছে- সদা জাগ্রত বাংলার মুক্তিবাহিনী। দুঃখজনক হলেও সত্য, শাসককুল ক্ষমতার স্বার্থে তাদের ব্যবহার করার কারণে তারা সদা জাগ্রত থাকতে পারেননি। কমান্ড কাউন্সিল শাসকদের দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপশাসনের বিরুদ্ধে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছে- এমন ঘটনা চোখে পড়েনি। কিন্তু নতুন প্রজন্ম একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে থেমে থাকেনি। ধর্ষণের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন বিক্ষোভ করে প্রমাণ করেছে তারা সদা জাগ্রত। ৬ মার্চ মাগুরা জেলা শহরে আট বছর বয়সি আছিয়া নামে এক শিশু ভগ্নিপতির বাড়িতে বেড়াতে এসে ধর্ষণের শিকার হয়। মেয়েটিকে ধর্ষণ শেষে হত্যার চেষ্টা করা হয়। তাকে মরণাপন্ন অবস্থায় বর্তমানে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনাটি সামাজিক মিডিয়ায় প্রচারিত হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা মধ্যরাতে রাস্তায় নেমে এসে বিক্ষোভ করতে থাকেন। তাঁদের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে যুক্ত হন। আছিয়া ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উত্তাল অবস্থা বিরাজ করছে। যদিও আগে থেকেই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও দেশের বিভিন্ন স্থানে মেয়েদের প্রতি যৌন নির্যাতনসহ মব জাস্টিসের ঘটনা ঘটায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত ছিল। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ ও ১৫ দিনের মধ্যে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়াসহ ৯ দফা দাবি পেশ করেছে। নতুন রাজনৈতিক দল ‘এনসিপি’ বলেছে, নারীর প্রতি সহিংসতা জুলাই গণ অভ্যুত্থানবিরোধী। ইতোমধ্যে এ ঘটনায় জড়িত চারজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। আছিয়ার মা বলেছেন, অভাবের তাড়নায় তিনি তার ১৪ বছর বয়সি বড় মেয়েকে বিয়ে দিতে বাধ্য হন। আছিয়া দ্বিতীয়। বড় মেয়ে এর আগে নালিশ করেছিল, তার শ্বশুর তাকে যৌন নিপীড়ন করে। আছিয়া তার বোনের বাড়িতে যেতে চায়নি। তিনি জোর করে মেয়ের বাড়িতে আছিয়াকে পাঠিয়েছিলেন। সেজন্য তার দুঃখের শেষ নেই। বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দাবি উঠেছে অপরাধীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার। কেউ কেউ প্রকাশ্যে ফাঁসির দাবি তুলেছেন। এরকম ঘটনা ও শাস্তির দাবি এবারই প্রথম নয়, আধুনিক বিশ্বে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রয়োগ দেখা যায় না। সৌদি আরবসহ কয়েকটি কর্তৃত্ববাদী দেশে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উদাহরণ রয়েছে। শাস্তি সাধারণত চার প্রকার; দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, প্রতিশোধমূলক শাস্তি, প্রতিরোধমূলক শাস্তি ও সংশোধনমূলক শাস্তি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থেও বিভিন্ন শাস্তির কথা বলা আছে যেমন মনু সংহিতায় চার ধরনের শাস্তির কথা বলা আছে; যথা বাক দণ্ড (উপদেশ), ধিক দণ্ড (নিন্দা), ধন দণ্ড (জরিমানা), বধ দণ্ড (মৃত্যুদণ্ড)। ইসলাম ধর্মেও অনুরূপ শাস্তির কথা বলা আছে; দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, সংশোধনমূলক শাস্তি, প্রতিশোধমূলক শাস্তি ও ইনসাফভিত্তিক শাস্তি (স্থানাভাবে ব্যাখ্যা দেওয়া হলো না)। যখন কোনো অপরাধ ভয়াবহভাবে ঘটতে দেখা যায়, প্রচলিত আইনে ঠেকানো সম্ভব হয় না, তখনই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রয়োগ করা হয় (দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি সব সময় বহাল থাকলে প্রমাণ হয়, দেশের মানুষ সংশোধন হচ্ছে না)। প্রতিশোধমূলক শাস্তি হলো, অপরাধের সমানুপাতিক শাস্তি। জীবনের বদলে জীবন, চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাঁত ইত্যাদি। প্রতিরোধমূলক শাস্তির বেলায় বলা আছে, যে ব্যক্তি সমাজের জন্য বিপজ্জনক। সাজা ভোগ করার পরে মুক্তি পেলে অনুরূপ অপরাধ করতে পারে, সেরকম ব্যক্তিকে এ আইনে আটক রাখা যেতে পারে। উল্লেখ্য নরওয়ে ২০১১ সালের ২২ জুলাই এন্ডার্স বেহরিং ব্রেইভিক ৭৭ জনকে গুলি করে হত্যা করে এবং দুই শতাধিক ব্যক্তিকে আহত করে। সে দেশে মৃত্যুদণ্ড না থাকায় তাকে এ আইনে ২১ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সংশোধনমূলক শাস্তিতে অপরাধীকে সংশোধন ও পুনর্বাসনের কথা বলা আছে। বর্তমান গণতান্ত্রিক বিশ্বে সংশোধনমূলক শাস্তির প্রয়োগ বেশি (এ দেশের কারাগারগুলোকে সংশোধনাগার নাম দেওয়া হয়েছে)। এ শাস্তির দর্শন হলো, অপরাধীকে কঠোর শাস্তি দেওয়া সমাধান নয়। রাষ্ট্রের কাজ হলো, অপরাধ করার কারণগুলো দূর করা। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মানুষ বিভিন্ন কারণে অপরাধ করে থাকে। যেমন যখন অপরাধ করে ধরা পড়ার ঝুঁকির চেয়ে অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত সুবিধা বেশি দেখে, তখন সে অপরাধ করে। যখন অপরাধের মাধ্যমে অন্যকে সুবিধা পেতে দেখে, তখন সে অপরাধ করতে উৎসাহী হয়। আবার কেউ কেউ অপরাধের জিনগত প্রস্তুতি নিয়ে জন্মায়। কারোর মস্তিষ্কে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণকারী অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়লে সে সহজেই আক্রমণকারী ভূমিকায় নেমে পড়ে। তা ছাড়া সমাজে অস্থিরতা বৃদ্ধি পেলে এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ, নৈতিক মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, সর্বোপরি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা হারালে মানুষ অপরাধপ্রবণ হয়ে পড়ে।
লেখক : গণতন্ত্রায়ন ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারবিষয়ক গবেষক