বাংলাদেশে ভ্যাট ব্যবস্থার প্রবর্তন, তৈরি পোশাক খাতে ব্যাক টু ব্যাক এলসি, বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা চালুসহ অর্থনীতিতে ব্যক্তি খাতের বিকাশ ও নীতি প্রণয়নে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মরণোত্তর সম্মাননা পেলেন প্রয়াত অর্থ, পরিকল্পনা ও বাণিজ্যমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। গতকাল রাজধানীর রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত বণিক বার্তা ও বিআইডিএসের যৌথ উদ্যোগে ‘গুণিজন সংবর্ধনা’য় সাইফুর রহমানের তিন দৌহিত্র নাবিল ইলহান রহমান, এম সাফির রহমান ও এ এম বাশির রহমানের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট ও সাইফুর রহমানের পোর্ট্রেট তুলে দেন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান।
‘গুণিজন সংবর্ধনা’র সপ্তম আয়োজনে সাইফুর রহমানের জীবন ও কর্মের ওপর আলোকপাত করে স্মৃতিচারণ করেন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, সাইফুর রহমানের মতো এমন চমৎকার মানুষ আর দেখিনি। গভর্নর থাকাকালে আমি তিনজন অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। সাইফুর রহমান সাহেব বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাপারে কখনোই কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করেননি। তার মতো রাজনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারক পাওয়া কঠিন। কর্মজীবনে সাইফুর রহমানের সঙ্গ সব সময় উপভোগ্য ছিল উল্লেখ করে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যুরোক্রেসিতে একটা কথা আছে, বসের কাছে যেও না, ঘোড়ার কাছেও যেও না। ঘোড়ার কাছে গেলে লাথি খাবে আর বসের কাছে গেলে ধরা খাবে। কিন্তু সাইফুর রহমান ছিলেন এমন একজন বস, যার কাছে যেতে কোনো দ্বিধা সংকোচ কাজ করত না। তিনি সবার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে তারপর সিদ্ধান্ত দিতেন। ব্যক্তি হিসেবে, রাজনীতিবিদ হিসেবে তথা বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে তিনি ছিলেন একজন সুন্দরতম মানুষ। স্মৃতিচারণ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অর্থনীতির স্বাভাবিক অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য একজন চ্যাম্পিয়নের দরকার হয়।
সাইফুর রহমান ছিলেন তেমন একজন চ্যাম্পিয়ন। বাজার ব্যবস্থাপনা, বেসরকারি খাত, রপ্তানি খাত, সংরক্ষণ নীতির চ্যাম্পিয়ন তিনি। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন- ‘মুক্তবাজার অর্থনীতির’ যাত্রা শুরু হয়েছিল সাইফুর রহমানের মাধ্যমে। সাধারণ মানুষের স্বার্থও দেখতেন তিনি। অনেক সময় ব্যবসায়ীরা উনার সিদ্ধান্তে হতাশ হতেন, অভিযোগ করতেন। কিন্তু তিনি দেশের স্বার্থ সবার আগে দেখতেন। বৈদেশিক ঋণের ওপর তিনি খুব বেশি নির্ভরতা চাননি।
বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন বিআইডিএসের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. কাজী ইকবাল। অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান, এমডি, এম সাইফুর রহমানের পরিবারবর্গ ও সহকর্মীসহ প্রায় পাঁচ শতাধিক অতিথি উপস্থিত ছিলেন।
এম সাইফুর রহমান ১৯৭৬ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ সরকারের অর্থ, বাণিজ্য ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ভ্যাট, পোশাক খাতে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি, বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা চালুসহ অর্থনীতিতে ব্যক্তি খাতের বিকাশ ও নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৯৭৬-১৯৮০ পর্যন্ত বাণিজ্যমন্ত্রী, ১৯৮০-১৯৮২ পর্যন্ত অর্থমন্ত্রী, ১৯৯১-১৯৯৬ পর্যন্ত টেকনোক্র্যাট অর্থমন্ত্রী এবং ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।