ভয় আর আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে রাঙামাটির দুর্গম বন্দুকভাঙা ও আশপাশের এলাকা। আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে বিপর্যস্ত সেখানকার জনজীবন। সেনাবাহিনীর অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে অস্থিরতা কিছুটা প্রশমিত হলেও সম্প্রতি তারা এলাকাটি ত্যাগের পর থেকে বন্দুকভাঙা আবার পরিণত হয়েছে রণক্ষেত্রে। গত শুক্রবার আবারও দুটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে বন্দুকভাঙা এলাকায় গোলাগুলি হয়েছে। এতে সেখানে নতুন করে নেমে এসেছে আতঙ্ক। এর আগেও বিভিন্ন সময় এ এলাকায় পার্বত্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের জেরে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে।
নিরাপত্তা বাহিনী ও স্থানীয় সূত্র জানান, দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন জেএসএস ও ইউপিডিএফ রাঙামাটির বন্দুকভাঙা এলাকাকে সন্ত্রাসের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করে রেখেছিল। গত ২ জানুয়ারি ওই এলাকায় সেনাবাহিনী অবস্থান নেয় এবং সন্ত্রাস দমনে অভিযান চালায়। অভিযানে উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ। ধ্বংস করা হয় সন্ত্রাসীদের একাধিক ঘাঁটি ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। সেনাবাহিনীর কঠোর পদক্ষেপে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে স্থানীয় জনগণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১টার দিকে সেনাবাহিনী তাদের অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করে মারিচুক এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর পরই বন্দুকভাঙায় আবার শুরু হয় সন্ত্রাসীদের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। সেনাদের এলাকা ত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। বন্দুকভাঙা ও যমচুক এলাকায় শুরু হয় গোলাগুলি। ৫ ফেব্রুয়ারির পর গোলাগুলির একাধিক ঘটনা ঘটেছে। আবারও সশস্ত্র গোষ্ঠী গোলাগুলিতে জড়িয়ে পড়ছে। রাঙামাটি, লংগদু ও বরকল উপজেলার সীমানাসংলগ্ন হওয়ায় বন্দুকভাঙা কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ। তাই ওই এলাকায় আধিপত্য বজায় রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে পার্বত্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। সূত্রমতে, গত শুক্রবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকালে বন্দুকভাঙায় দুই সশস্ত্র সংগঠনের মধ্যে গোলাগুলি হয়। তবে এতে কেউ হতাহত হয়েছে কি না জানা যায়নি। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো হতাহতের বিষয়ে বরাবরই গোপনীয়তা বজায় রেখে চলে। কোন দুই পক্ষে এই গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে সূত্র তাও নিশ্চিত করতে পারেনি। তবে ওই এলাকায় আগে থেকে ইউপিডিএফ ও জেএসএস-এর তৎপরতা রয়েছে বলে জানা গেছে।
রাঙামাটি জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) ড. এস এম ফরহাদ হোসেন শনিবার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমাদের কাছে এখনো গোলাগুলির কোনো তথ্য আসেনি। সাধারণত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ওই এলাকায় এ ধরনের কার্যক্রমের তদারকি করা হয় বা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এলাকাটি খুবই দুর্গম। স্থলপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই। নৌপথে যেতে হয়। তাও খুব জটিল ও কঠিন। রাঙামাটি শহর থেকে কেউ সেখানে যেতে চাইলে কয়েকদিন ধরে প্রস্তুতি নিয়ে যানবাহন ঠিক করে তবেই রাওনা দিতে হবে। স্থানীয় সূত্র জানান, বন্দুকভাঙা এলাকাবাসী সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে কিছুদিন নিরাপত্তা অনুভব করলেও সেনারা চলে যাওয়ার পর পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়। সাধারণ জনগণ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অনেকেই এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক পরিবার জীবন বাঁচাতে তাদের সন্তানদের শহরে পাঠিয়ে দিয়েছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর গোলাগুলি ও হামলা-পাল্টা হামলায় শুধু তাদের কর্মীরাই নয়, প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালিরাও। স্থানীয় লোকজন জীবন বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন। যারা এখনো এলাকায় রয়ে গেছেন, তারা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। খাবার সংকটও প্রকট হয়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন পরিবার থেকে খাবারও লুট করছে। সন্ত্রাসী কর্তৃক দখলকৃত বাড়ি ঘরের লোকজনদের নির্ধারিত স্থানের বাইরে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।