তৃতীয় হিজরির রমজান মাস। দিনটি ছিল ১৫ রমজান। মদিনার এক জীর্ণ কুটিরে আনন্দের ঢেউ উঠেছে। সে ঢেউ এসে লেগেছে সরকারে কায়েনাত মুহাম্মদের (সা.) মনবাগানে। দীর্ঘ কষ্টের জীবনে এক পশলা সুখের বৃষ্টি তাঁর মনকে রাঙিয়ে দিয়েছে নতুন সজীবতায়। খবর এসেছে, হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বড় মেয়ে, আদরের দুলালি মা ফাতেমার কোল আলোকিত করে জান্নাত থেকে এক চাঁদমুখ রাজপুত্র এসেছে।
খবর নয় কানে যেন কেউ মধু ঢেলে দিল হজরতের। খোদার দরবারে শোকরিয়া আদায় করতে করতে গিয়ে হাজির হলেন প্রিয় মেয়ে ফাতেমার ছোট্ট ঘরে। চাঁদের মতো ফুটফুটে শিশুকে কোলে নিয়ে বাম কানে আজান এবং ডান কানে একামত শুনিয়ে দিলেন তিনি।
খাতুনে জান্নাত মা ফাতেমা ও মাওলায়ে কায়েনাত শেরে খোদা আলীর বড় পুত্রের নাম কী হবে? হুজুরের কাছে নাম জানতে চাইলে হুজুর (সা.) বলেন এ বিষয়ে আমি আল্লাহর সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছি। কিছুক্ষণ না যেতেই আসমান থেকে নাম নিয়ে নামলেন ফেরেশতাকুল শিরোমণি হজরত জিবরাইল (আ.)। রসুলের দিকে তাকিয়ে আনন্দ গদগদে কণ্ঠে বললেন, হে নবী! আপনার বড় নাতির নাম আল্লাহ ঠিক করে দিয়েছেন। এ শিশুর নাম হবে হাসান। রসুল (সা.) শিশুর নাম ঠিক করে তার মাথায় হাত বুলালেন। একটি দুম্বা কোরবানি করে নাতির আকিকা করলেন। নির্দেশ দিলেন, শিশুর মাথার চুল ফেলে দিয়ে চুলের সমপরিমাণ ওজন রূপা সদকা করার জন্য। আকিকার মতো দামি সুন্নাত এভাবেই পেয়ে যায় উম্মতে মুসলিমা।
ছেলেবেলা থেকেই ইমাম হাসান ছিলেন খোদায়ি মেধার অধিকারী। কোনো কিছু একবার শুনলেই স্মৃতিপটে গেঁথে যেত গভীরভাবে। হুজুর (সা.) যখন নাজিল হওয়া ওহি সাহাবিদের সামনে আলোচনা করতেন, তখন ইমাম হাসান নানার মুখ থেকে শুনেই তা মুখস্থ করে ফেলতেন। ঐতিহাসিকরা বলেন, এমন অনেকবার হয়েছে- হুজুর (সা.) মা ফাতেমার কাছে নতুন নাজিল হওয়া ওহির আয়াত শোনাতে এসেছেন, নবীজি বলার আগেই মা ফাতেমা সে আয়াতগুলো মুখস্থ শুনিয়ে দেন। নবীজি জিজ্ঞাসা করলে মা ফাতেমা জবাবে বলেন, আপনার নাতি হাসান থেকে আমি এ আয়াতগুলো শুনেছি। (শানে আহলে বাইত, ২৯১ পৃষ্ঠা।)
হুজুরের কাছে ইমাম হাসানের মর্যাদা ছিল অনন্য। বয়সে শিশু হওয়া সত্ত্বেও ইমাম হাসানকে রসুল (সা.) সাক্ষী হওয়ার মর্যাদা দিয়েছেন। ঐতিহাসিক ওয়াকেদি বর্ণনা করেন, বনু সাকিফের সঙ্গে নবীজি (সা.) একটি চুক্তি করেন। সে চুক্তিতে শিশু হাসানকে সাক্ষী রাখা হয়। (শানে আহলে বাইত, ২৯২ পৃষ্ঠা।)
হাসান ও হোসাইন (রা.) ছিলেন রসুলের কলিজার টুকরো। এ দুজনকে ভালোবাসা কেবল নাতির প্রতি নানার ভালোবাসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি বরং নবীজির (সা.) ঘোষণা থেকে স্পষ্ট হয়েছে, এদের ভালোবাসা ইমান পূর্ণতারও দাবি। একবার দুবার নয় অসংখ্যবার এ কথা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন রসুল (সা.)। বুখারি শরিফের কিতাবুল আম্বিয়ার বাবে মানাকিবে হাসান ওয়াল হুসাইনে এসেছে, হজরত বারা ইবনে আজেব (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, আমি হাসানকে দেখেছি নবীজির কাঁধে চড়ে খেলা করছেন। আর নবীজি খুশি হয়ে বলছেন, ‘হে আল্লাহ! আমি একে ভালোবাসি। তুমিও একে ভালোবাসো।’
হজরত আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, একবার রসুল (সা.) মিম্বরে দাঁড়িয়ে খুতবা দিচ্ছিলেন। হজরতের পাশে ছিলেন ছোট্ট হাসান। হঠাৎ করে যেন কী হল! রসুল (সা.) একবার শিশু হাসানের দিকে তাকান, আরেকবার সমবেত মুসল্লিদের দিকে তাকান। এভাবে কয়েকবার করার পর রসুল (সা.) হাসানের দিকে তাকিয়ে বলেন, আমার এ নাতি তোমাদের নেতা হবে। আল্লাহতায়ালা তার মধ্যস্থতায় বিবদমান দুই দলের মধ্যে আপস করে দেবেন।’ (বুখারি শরিফ, কিতাবুল আম্বিয়া, বাবে মানাকিবে হাসান ওয়াল হুসাইন।)
হজরত উসামা ইবনে জায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, ‘রসুল (সা.) আমাকে ও হাসানকে একসঙ্গে কোলে তুলে নিয়ে বলেন, হে আল্লাহ! আমি এদের দুজনকে ভালোবাসি। তুমি এদের ভালোবাসো।’ (বুখারি শরিফ, কিতাবুল আম্বিয়া, বাবে মানাকিবে হাসান ওয়াল হুসাইন।)
হজরত উকবা ইবনে হারেস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি সিদ্দিকে আকবর আবু বকরকে (রা.) দেখেছি, তিনি শিশু হাসানকে কোলে নিয়ে বলছেন, এ শিশু তো দেখতে হুবহু রসুলের মতো। একে তো কোনোভাবেই আলীর মতো দেখাচ্ছে না। এ কথা শুনে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আলী মুচকি মুচকি হাসছিলেন।’ (বুখারি শরিফ, কিতাবুল আম্বিয়া, বাবে মানাকিবে হাসান ওয়াল হুসাইন।)
লেখক : প্রিন্সিপাল, সেইফ এডুকেশন ইনস্টিটিউট
পীর সাহেব, আউলিয়ানগর, www.selimazadi.com