কুমিল্লার লালমাই উপজেলার শ্রীপুরের বাবা মায়ের বড় সন্তান খাদিজা আক্তার (১২)। জন্মগত ত্রুটির কারণে দৃষ্টিহীন হওয়ায় জন্মের পর থেকেই তাকে নিয়ে বিপাকে পড়ে পরিবার। দৃষ্টিশক্তি ফেরাতে তাকে দেশের পাশাপাশি ভারতের চেন্নাইয়েও চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো চিকিৎসকই তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারেননি। তবে চিকিৎসকরা তার অভিভাবকদের জানিয়েছিলেন, আল্লাহ তায়ালা রহমত করলে ১৫ বছরের পর অপারেশনের মাধ্যমে খাদিজা দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেতে পারেন।
সেই সময়ে খাদিজার মা বাবা নিয়ত করেন, মেয়েকে পবিত্র কোরআনের হাফেজা ও আলেমা হিসেবে গড়ে তুলবেন। কিন্তু মফস্বলে অনেক বেসরকারি মাদরাসা থাকলেও দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের কোরআন হিফজের কোনো ব্যবস্থা নেই। মেয়েকে নিয়ে বিভিন্ন হিফজ মাদরাসায় ঘুরে হতাশ হয়ে সর্বশেষ গত বছরের রমজানে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়ক সংলগ্ন লালমাই উপজেলার বাগমারা সৈয়দপুরস্থ ‘আল ইসরা মাদরাসাতে (বালিকা শাখা) যান। সেই মাদরাসার অধ্যক্ষ খাজিদার দৃষ্টিহীনতা ও তার মা বাবার কোরআন হিফজ করানোর নিয়তকে গুরুত্ব দিয়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বালিকা শাখায় পৃথক ব্যবস্থা চালু করেন। সেই থেকে খাদিজার কায়দা, আমপারা ও কোরআন শিক্ষা শুরু। গত বছরের নভেম্বরে খাদিজা হিফজ ছবক নেয়। শুনে শুনে সাড়ে তিন মাসে সে প্রায় ৭ পারা কোরআন মুখস্থ করে।
বিষয়টি জানতে পেরে বসুন্ধরা শুভসংঘ, লালমাই উপজেলা শাখার সদস্যরা শুক্রবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে আল ইসরা মাদরাসায় গিয়ে খাদিজার কোরআন হিফজের খোঁজখবর নেন। তার হিফজের গতি বাড়াতে ও উৎসাহ দিতে তাকে একটি কোরআন শরীফ, নামাজ পড়ার জন্য একটি জায়নামাজ, চলাফেরার সুবিধার জন্য একটি ছরি ও রমজানে ইফতার করার জন্য এক বক্স খেজুর উপহার হিসেবে দেন।
উপহার দেওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন দৈনিক কালের কণ্ঠের কুমিল্লা সদর দক্ষিণ ও লালমাই প্রতিনিধি জহিরুল ইসলাম, আল ইসরা মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মাছুম বিল্লাহ মুহাজির, বসুন্ধরা শুভসংঘের লালমাই উপজেলা শাখার সভাপতি মোহাম্মদ মফিজুল ইসলাম মুন্না, সাধারণ সম্পাদক কাজী ইয়াকুব আলী নিমেল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক রিফাত, আল ইসরা মাদরাসার হিফজ বিভাগের প্রধান হাফেজ ইসমাইল হোসেন শামীম, শিক্ষক মাওলানা মোজাম্মেল ইবনে মুসলিম ও মাওলানা মুদ্দাস্সির বিল্লাহ।
উপহার গ্রহণকালে খাদিজা আক্তার বলেন, আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন। আমি যেন পুরো কোরআন শরীফ মুখস্থ করতে পারি। দুইটা না হোক, অন্তত আল্লাহ যেন আমার একটা চোখ সুস্থ করে দেন। আমি দেখে দেখে কোরআন শরীফ পড়তে চাই। নিজের মা বাবাকে দেখতে চাই।
খাদিজার মা নাজমা আক্তার বলেন, জন্মের পর থেকেই খাদিজা চোখে দেখে না। তাকে কোরআন হিফজ পড়ানোর জন্য আমি এলাকার অনেক মাদরাসায় গিয়েছিলাম। কোনো মাদরাসার শিক্ষকরা তাকে পড়াতে রাজি হয়নি। আল ইসরা মাদরাসা শুধু খাদিজার জন্যই পৃথক শাখা করেছে এবং তার জন্য একজন নারী কোরআনে হাফেজ নিয়োগ দিয়েছে। আমার মেয়ে সাড়ে তিন মাসে প্রায় ৭ পারা কোরআন মুখস্থ করেছে। প্রথমত আল্লাহ তায়ালার কাছে আমি শুকরিয়া জানাই। খাদিজাকে হিফজ পড়ানোর দায়িত্ব নেওয়ায় আল ইসরা মাদরাসার শিক্ষককের কাছেও আমরা কৃতজ্ঞ। মেয়েকে উপহার দিয়ে উৎসাহ দেওয়ায় বসুন্ধরা শুভসংঘকেও ধন্যবাদ।
আল ইসরা মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মাছুম বিল্লাহ মুহাজির বলেন, কিছুটা ঝুঁকি নিয়েই খাদিজার মা বাবার অনুরোধে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য পৃথক হিফজ বিভাগ চালু করেছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমাদের রহম করতেছেন। হিফজ বিভাগের প্রধান ও সংশ্লিষ্ট নারী হিফজ শিক্ষকের আন্তরিক প্রচেষ্টায় ছবক গ্রহণের সাড়ে তিন মাসে প্রায় ৭ পারা কোরআন মুখস্থ করতে পেরেছে দৃষ্টিশক্তিহীন খাদিজা। আশা করি এ বছরেই খাদিজার হিফজ শেষ হবে। আমি চাই, খাদিজার মতো দৃষ্টিশক্তিহীনদের কোরআন হিফজের দায়িত্ব নিতে। বর্তমানে খাদিজাসহ আমার মাদরাসায় সাত শতাধিক বালক-বালিকা (পৃথক ব্যবস্থাপনায়) পড়তেছে। গত কয়েক বছরে এই মাদরাসা থেকে অর্ধশত নারী শিক্ষার্থী কোরআন হিফজ শেষ করেছে। দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ-৫ সহ উপজেলার শীর্ষস্থান অর্জন করেছে। এ বছর থেকে আলিম শ্রেণিতে অধ্যয়ন চলছে। আমার প্রচেষ্টার সহায়ক হয়ে খাদিজাকে উপহার দেওয়ায় বসুন্ধরা গ্রুপ ও বসুন্ধরা শুভসংঘকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
বসুন্ধরা শুভসংঘ, লালমাই উপজেলা শাখার উপদেষ্টা ও শিক্ষানুরাগী মো. কামাল হোসেন বলেন, সমাজের পিছিয়ে পড়াদের সামনের পথে এগিয়ে নিতে সহায়ক হিসেবে কাজ করছে বসুন্ধরা শুভসংঘ। দৃষ্টিশক্তিহীন খাদিজাকে আল্লাহ পুরো কোরআন মুখস্থ করার তাওফিক দান করুক এবং তার অন্তত একটি চোখে আল্লাহ দৃষ্টিশক্তি দান করুক। আমিন।
বিডি প্রতিদিন/এমআই