মহাকাশ বিজ্ঞানীদের নজর কাড়া এক বিরল ঘটনা ঘটেছে। দুটি বিশাল কৃষ্ণগহ্বরের (সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল) সংঘর্ষের ফলে তৈরি হওয়া এক বৃহৎ কৃষ্ণগহ্বর তীব্র গতিতে ছিটকে গেছে তার নিজস্ব ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ঘটনা মহাজাগতিক বিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে।
জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী মার্কো চিয়াবেরগে ও তার দল আবিষ্কার করেছেন, ‘3C 186’ নামের একটি গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল বেরিয়ে গেছে, যার গতিবেগ ঘণ্টায় এক হাজার কিলোমিটারের বেশি!
কীভাবে ঘটল এই বিরল ঘটনা?
হাবল স্পেস টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণে বিজ্ঞানীদের প্রথম সন্দেহ হয়। কারণ, গ্যালাক্সির উজ্জ্বল কোয়াসার (একটি তীব্র আলো বিচ্ছুরণকারী ব্ল্যাক হোল) তার স্বাভাবিক অবস্থানে নেই। পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা যায়, কৃষ্ণগহ্বরটি তার নিজস্ব গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩৩,০০০ আলোকবর্ষ দূরে সরে গেছে।
এই রহস্য উদ্ঘাটনে বিজ্ঞানীরা চিলির ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ এবং হাওয়াইয়ের সুবারু টেলিস্কোপ ব্যবহার করেন। বিশ্লেষণে দেখা যায়, কৃষ্ণগহ্বরটির চক্রপথে (অ্যাক্রিশন ডিস্ক) ঘূর্ণায়মান পদার্থ থেকে নির্গত আলো নীলাভ হয়ে উঠেছে (ব্লু-শিফটেড), যা ইঙ্গিত দেয় যে এটি পৃথিবীর দিকে উচ্চ গতিতে এগিয়ে আসছে। অপরদিকে, কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশের গ্যাসের নীলাভ প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম, যা প্রমাণ করে যে এটি পুরো গ্যালাক্সির তুলনায় অনেক দ্রুতগতিতে ছুটে চলেছে।
বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা
গবেষকরা ধারণা করছেন, দুটি গ্যালাক্সির সংঘর্ষের ফলে তাদের কেন্দ্রস্থল কৃষ্ণগহ্বর দুটি একত্রিত হয়ে আরও বৃহৎ এক ব্ল্যাক হোলে পরিণত হয়। এই সংমিশ্রণের ফলে প্রচণ্ড শক্তির মহাকর্ষীয় তরঙ্গ (Gravitational Waves) নির্গত হয়, যা একদিকে প্রবাহিত হলে বিপরীত দিকে নতুন কৃষ্ণগহ্বরটি প্রচণ্ড গতিতে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ে।
বিজ্ঞানী আলেসিয়া গুয়ালান্দ্রিস বলেন, এই ঘটনা মহাকর্ষীয় প্রতিক্রিয়ার এক শক্তিশালী প্রমাণ। যদিও মহাকাশ গবেষণায় নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ কম, তবে আমাদের বিশ্লেষণ যথেষ্ট দৃঢ়।
তবে ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষক লুক জোল্টান কেলি সতর্কতা অবলম্বন করছেন। তার মতে, কিছু সময় সক্রিয় গ্যালাকটিক নিউক্লিয়াস (AGN) বা কৃষ্ণগহ্বর কেন্দ্রিক আলোর বিকিরণ ভিন্নভাবে প্রতিফলিত হতে পারে, যা কখনো কখনো মিথ্যা গতির ইঙ্গিত দেয়। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন।
কৃষ্ণগহ্বর গবেষণায় নতুন দিগন্ত
এই ঘটনা শুধু মহাকর্ষীয় তরঙ্গের বাস্তব প্রভাব দেখাচ্ছে না, বরং গ্যালাক্সির বিবর্তন ও কৃষ্ণগহ্বরের গতিশীলতা সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী টেলিস্কোপের সাহায্যে এই ধরনের ঘটনা আরও বিশদভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
বিডিপ্রতিদিন/কবিরুল