আমাদের পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, প্রাকৃতিক, যত রকমের বিপদ-আপদ ঝড়ঝঞ্ঝাই দেখা দিক না কেন, প্রথম ধাক্কাটাই ঠিক ঠিক পড়ে গিয়ে মেয়েদের ওপরে। সেই যে হাওড়ে বিপন্ন হয় প্রায় দুই কোটি মানুষ, অবর্ণনীয় কষ্ট সবারই হয়, কিন্তু সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ যে পোহাতে হয় মেয়েদেরই, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এনজিও ঋণ মহাজনী ঋণের চেয়ে কম দুর্বিষহ নয়। সেটা তো জানাই আছে আমাদের। কিন্তু ঘরের মানুষটি যে তার চেয়েও নির্মম হতে পারে সে-ও সত্য। জেনেছিল তা বগুড়ার সেই গৃহবধূটিও, স্বামী যাকে ঘরের ভিতরে জ্যান্ত পুঁতে ফেলার আয়োজন করেছিল। উদ্ধার করে এনজিওর লোক।
তারা ত্রাণকার্যে আসেনি, এসেছিল ঋণের কিস্তি উশুলের জন্য। মেয়েটি ঋণ করেছে এনজিও থেকে, সেই টাকা বিনিয়োগ করে আয়-উপার্জনের কিছু করত নিশ্চয়ই। কিন্তু স্বামী সন্তুষ্ট ছিল না, স্বামী চাপ দিত বাপের বাড়ি থেকে টাকা আনার। এনেছেও। বার কয়েক এনেছে। শেষে আর পারবে না বলায় স্বামী তাকে প্রহার করেছে, অজ্ঞান করে ফেলেছে এবং নিশ্চিহ্ন করে ফেলে দেবার জন্য ঘরের ভিতরে মাটিতে জ্যান্ত কবর দেওয়ার ব্যবস্থা সুসম্পন্ন করেছিল। সুদের টাকা আদায়ওয়ালারা সময়মতো উদিত না হলে ঘরের ভিতরই কবর হতো। অন্ধকারে। মৃতেরা কবর দাবি করে, কিন্তু জীবিতদেরও অনেকেই কবরেই থাকে, বিশেষ করে মেয়েরা।
অর্থের দাপট দেখেছেন, সেই দাপটের সঙ্গে পুরুষতান্ত্রিকতা যুক্ত হয়ে মেয়েদের জীবন কীভাবে দুর্বিষহ করে তুলেছে সেটা লক্ষ করেছেন? ক্ষমতাবানদের হাতে তারা কেমনভাবে সামগ্রী হিসেবে ব্যবহৃত, তা দেখে তার হৃদয়-পীড়ার কোনো সীমা ছিল না। সময় বদলেছে। আমাদের সমাজে মেয়েরা অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু এখনো তারা পুরুষের সমান অধিকার ও সুযোগ পায়নি। মূল ক্ষমতা পুরুষের হাতেই। সম্পত্তি অর্থবিত্ত সবই পুরুষের পক্ষে, সামাজিক সংস্কারও পুরুষকেই সমর্থন করে। মেয়েরা বিদ্যালয়ে প্রথম হলেও হতে পারে, এখন হচ্ছে, কিন্তু তার বাইরে সর্বত্রই তারা দ্বিতীয়।
তবে আগের দিনের তুলনায় মেয়েরা এখন নিজেদের অধিকার সম্পর্কে অধিক সচেতন। এখন তারা করুণাপ্রার্থী নয়, ক্ষমতাপ্রার্থী। সমাজে কিছু কিছু পরিবর্তন ঘটেছে এটা নিশ্চয়ই বলা যাবে, কিন্তু সেসব অগ্রগতির পেছনেও মূল শক্তিটা পুরুষের। সেখানে করুণা ছিল না, ছিল অর্থনৈতিক বিন্যাসে পরিবর্তন। ওই পরিবর্তনই নারীকে পেশা, শিক্ষা ও উপার্জনের কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে। ওইটুকুই, তার বেশি কিছু নয়।
ক্ষমতা পুরুষের হাতেই। পুরুষ তার ব্যক্তিগত সম্পত্তির সুযোগ নেয়, সেই সুযোগে নারীর ওপর কর্তৃত্ব করে। সন্তান ধারণের যে ক্ষমতা নারীর জন্য অসুবিধার কারণ হয় কিংবা হওয়ার আশঙ্কা থাকে, সেই অসুবিধার সুযোগও পুরুষ গ্রহণ করে এবং গ্রহণ করে নারীকে ভোগ্যসামগ্রীতে পরিণত করার ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদাররা মেয়েদের ওপর যে লাঞ্ছনা ঘটিয়েছিল, সেটি ছিল ওই গণহত্যার নিকৃষ্টতম অধ্যায়। আজ স্বাধীন বাংলাদেশেও নারী নির্যাতনের কোনো অবধি নেই। ধর্ষণ এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। আর ধর্ষণ যে কেবল বেআইনিভাবে হচ্ছে তা নয়, আইনিভাবেও হয়ে থাকে। ঘটে থাকে তা স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক সম্পর্কের ভিতরে থেকেও। প্রতি বছর অসংখ্য নারী-শিশু বিদেশে পাচার হচ্ছে। পাচার করছে পুরুষরাই। টাকার লোভে।
মেয়েদের কাজের যথার্থ মূল্যায়ন যে প্রায় অসম্ভব, সেটাও ওই পুরুষতান্ত্রিকতার কারণেই। এমনকি মেয়েরাও মেনে নেয় পুরুষের মূল্যায়ন। একাত্তরের যুদ্ধে আমাদের বিজয়ের পেছনে মেয়েদের যে অবদান, সেটা যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়নি। হয়তো হবেও না। মাঝখানে আবার বীরাঙ্গনা নাম দিয়ে কাউকে কাউকে বিড়ম্বিত করা হয়েছে। মেয়েরা প্রাণ হারিয়েছে তো বটেই, সম্ভ্রমও হারিয়েছে, আত্মহত্যাও করেছে। পুরুষদের তবু সুযোগ ছিল সরে যাবার, আত্মগোপন করার, সীমান্ত অতিক্রম করে গিয়ে প্রাণ বাঁচাবার। মেয়েরা আটকে পড়ে গেছে। স্বামী, ভাই, পিতাকে না পেয়ে হানাদাররা শোধ তুলেছে মেয়েদের ওপর। ইতিহাস লেখার সময় এই অংশটাকে আমরা যেন না ভুলি।
একাত্তরের যুদ্ধের সূচনাপর্বে শেখ মুজিবুর রহমান সাতই মার্চের বক্তৃতায় বাঙালি জাতির একক প্রতিনিধিতে পরিণত হয়েছিলেন। রেসকোর্সের মাঠে সেদিন মেয়েরাও ছিল, দেশজুড়ে ছেলেদের সঙ্গে মেয়েরাও ওই বক্তৃতা শুনেছে। বক্তৃতাতে তিনি ভাইদেরই সম্বোধন করেছিলেন, ‘ভায়েরা আমার’ই বলেছিলেন। সেদিন ওই ভাই সম্বোধনে কোনো অপূর্ণতা ছিল বলে মনে হয়নি। কেননা নারী-পুরুষনির্বিশেষে সেদিন সবাই সবার ভাই। বিচ্ছিন্নতা ছিল না। কিন্তু পরে তো বিচ্ছিন্নতা ঠিকই দেখা দিয়েছে। হানাদারদের আক্রমণের মুখে মেয়েদের বিপদটা ছিল নিশ্চুপ ও অবগুণ্ঠিত। মেয়েরা নিজেরাও চায়নি তাদের ওপর দিয়ে কী ধরনের বিপদ ও দুর্ভোগ গেছে সেটা উন্মোচিত হোক। আত্মীয়স্বজনও চেয়েছে, ব্যাপারটা অজানাই থাকুক। ঐক্য ও সংকটের ওই বিশেষ মুহূর্তে ‘আমরা’ বলতে জনগণ আওয়ামী লীগ, বোঝেনি। সমগ্র জাতিকেই বুঝেছে। যে জাতির মধ্যে নারী-পুরুষ, হিন্দু-মুসলমান, গরিব-ধনী সবাই ছিল। বিচ্ছিন্নতা তখন ছিল না ঠিকই, কিন্তু পরে তা চলে এসেছে এটা তো সত্য। বিশেষ করে যুদ্ধ শেষে। তখন সব বাঙালি আর এক থাকেনি, নানাভাবে বিভক্ত হয়ে গেছে। এবং মূল বিভাজনটা ঘটেছে ক্ষমতার কারণেই। পদপদবি সবাই পায়নি, পেয়েছে অল্প কিছু মানুষ, বাদবাকিরা নিক্ষিপ্ত হয়েছে বঞ্চনার প্রাচীন অন্ধকারে। সাধারণভাবে বলতে গেলে নারী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং সর্বোপরি গরিব মানুষ ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এরা সমাজের দুর্বলতর অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্ষমতায়নের প্রশ্নটা তাই সমস্যাই রয়ে গেল। তার মীমাংসা হয়নি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আজও মেয়েদের সঠিক প্রতিনিধিত্ব হয় না। এতে বিশেষভাবে তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার অভাবটা প্রতিফলিত হয়। সাধারণ আসনে তারা সাধারণত মনোনয়ন পায় না। কদাচিৎ মনোনয়ন পেলেও জয়ী হওয়া কষ্টকর হয়। মেয়েদের জন্য যে ৫০টি আসন সংরক্ষিত আছে, তাতে নির্বাচন নেই, মনোনয়ন রয়েছে। প্রধানত সরকারি দলের সদস্যরাই মনোনীত হয়ে ওই আসনের প্রায় সবটা পেয়ে যায়। সংসদে পাওয়া আসনের অনুপাতে নামমাত্র বণ্টন হয় অন্যদের মধ্যে। স্বভাবতই দাবি ওঠে আসনসংখ্যা বৃদ্ধির এবং সরাসরি নির্বাচনের। মেয়েরা যেহেতু সমানভাবে আসতে পারছে না, তাই প্রাথমিকভাবে প্রতি তিনটি সাধারণ আসনের বিপরীতে একটি অর্থাৎ সব মিলিয়ে ১০০ আসন তাদের জন্য সংরক্ষিত রাখা অযৌক্তিক মনে হয় না। এবং সে নির্বাচন অবশ্যই সরাসরি হতে হবে।
কিন্তু তাতে কি ক্ষমতায়নের সমস্যার সমাধান হবে? মোটেই না। ক্ষমতায়নের মূল বিষয়টা হলো সর্বক্ষেত্রে অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠা। সেটা গণতন্ত্রেরও মূল কথা বৈকি। মেয়েদের সমান অধিকারের কথা সংবিধানে সুন্দর করে লেখা আছে, কিন্তু বাস্তবে সেসব অধিকার মোটেই নেই। তাদের জন্য সুযোগও সামান্য। সুযোগ পেলে তারা যে পুরুষদের তুলনায় মোটেই পিছিয়ে থাকবে না তার প্রমাণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের ইতোমধ্যে অর্জিত সাফল্য। কিন্তু ওইটুকুই। তার বাইরে তারা কেবল বঞ্চিত নয়, রীতিমতো বিপন্ন। ক্ষমতাবান পুরুষ। বিদ্যাসাগরের ভাষায় পুরুষ জাতি তাদের নানাভাবে বঞ্চিত ও বিপন্ন করেছে।
নারীর ক্ষমতায়নের জন্য আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। সেটাই হওয়া দরকার আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য অর্জনে সংসদীয় গণতন্ত্র কী ধরনের ভূমিকা রাখবে, সে নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ক্ষমতা বড়ই নৃশংস প্রাণী, সবকিছুকে সে তার ভোগের সামগ্রী করতে চায়। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও দুর্বলের ক্ষমতায়ন যে সহজ ব্যাপার নয়, এবং তা যে সংগ্রাম ভিন্ন অর্জিত হয় না সেই নির্মম সত্যটি আমরা যেন কখনোই উপেক্ষা না করি। এ ব্যাপারে আপস বা অল্পে সন্তুষ্টির কোনো জায়গা নেই।
লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়