ঢাকা মহানগরীতে ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে মোবাইল ফোন চুরি-ছিনতাইকারী চক্র। বিভিন্ন স্থানে এ মুহূর্তে বড় আতঙ্কের নাম এটি। বেপরোয়া ছিনতাইকারীদের ভয়ে তটস্থ নগরবাসী। শুধু সন্ধ্যা বা রাত নয় দিনদুপুরেও এখন ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এ কাজে মোটরসাইকেলও ব্যবহার করছে ছিনতাইকারীরা। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলিতে বেপরোয়া এখন চক্রটি। রাত গভীর হলে যানবাহন ও মানুষের সমাগম কমে গেলে ছিনতাইকারীরা বেপরোয়া হয়ে পড়ে। এ সময় কিছু এলাকা রিকশা ও হেঁটে চলাচলকারীদের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দেশীয় অস্ত্রধারী ও দলবদ্ধ এসব ছিনতাইকারীর সঙ্গে পেওে ওঠাও কঠিন। একটু বলপ্রয়োগ করতে গেলে প্রাণে মেরে ফেলার ভয় থাকে। বাস, প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল বা রিকশায় মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় ছোঁ মেরে চোখের পলকে মোবাইল ফোন নিয়ে যাচ্ছে। দোকান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা বাসা থেকে কৌশলে মোবাইল ফোন চুরি করে নিয়ে দ্রুত সটকে পড়ছে।
১৭ মার্চ ভোরে ঝিগাতলায় ফজরের নামাজ পড়তে বের হন এক ব্যক্তি। এ সময় তিনি কলাপসিবল গেট লাগাতে ভুলে যান। তিনি বাইরে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চারজন নারী ওই বাসায় প্রবেশ করে। তারা বাড়ির নিচতলা ও দোতলার ফ্ল্যাট থেকে আইফোনসহ তিনটি মোবাইল ফোন, একটা ট্যাব ও কিছু টাকা চুরি করে পালিয়ে যায়। যা বাসার সিসিটিভির ক্যামেরায় ধরা পড়ে। ১৬ মার্চ ভাটারা এলাকায় রিকশায় করে গন্তব্যে যাচ্ছিলেন মনোয়ারুল হক নামে এক ব্যক্তি। তিনি মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। এ সময় মোটরসাইকেলের আরোহী ছোঁ মেরে মোবাইল ফোনটি নিয়ে সটকে পড়ে। এ ঘটনায় তিনি ভাটারা থানায় জিডি করেছেন। শুধু এ ঘটনাগুলোই নয়, এমন চিত্র এখন রাজধানীজুড়ে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর ৫০টি থানায় প্রতিদিন যত জিডি বা মামলা হচ্ছে তার বেশির ভাগই মোবাইল ফোন কেন্দ্রিক।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোবাইল ফোন চুরির সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটা হাত বদল হয়ে যায়। চুরি করে প্রথমেই চক্রের সদস্যরা মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেয়। এরপর সিম ফেলে দিয়ে মোবাইল ফোনটি ফ্ল্যাশ দেয়। দামি ফোন হলে ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি (আইএমইআই) নম্বর পরিবর্তন করে ফেলে। এরপর মোবাইল ফোনগুলো বিভিন্ন দামে বাজারে বিক্রি করে দেয়। ছিনতাই বা চুরি হওয়া মোবাইল ফোন কয়েক হাত বদল হয়ে সীমান্তে চলে যাচ্ছে। এমনকি কিছু কিছু মোবাইল ফোন সীমান্তের ওপারেও চলে যাচ্ছে। মোবাইল ফোন হাতিয়ে নেওয়া এ চক্রটি বাস, লঞ্চ বা ট্রেন স্টেশনে ওতপেতে থাকে। এ ছাড়া যেসব স্থানে লোকজনের ভিড় বেশি সেখানে এদের উৎপাত বেড়ে যায়। পুলিশ বলছে, রাজধানীর বিভিন্ন থানা এলাকায় চুরি-ছিনতাইসংক্রান্ত অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। ছিনতাইয়ের হটস্পটগুলোকে শুধু রাতের আঁধারে নয়, দিনের বেলায়ও মোবাইল ফোন লুটে নিয়ে মুহূর্তে সটকে পড়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে ছিনতাইকারী। প্রতিদিন একাধিক চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও থানায় মামলার সংখ্যা কম। বেশির ভাগ মানুষই হয়রানি ও ঝামেলার আশঙ্কায় মামলা করেন না। ছিনতাইকারীরা বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চ টার্মিনাল ও রেলস্টেশন থেকে বাসামুখী অথবা বাসা থেকে স্টেশনমুখী যাত্রীদের লক্ষ্যবস্তু বানায়।
সম্প্রতি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, ইদানীং কিছু স্ট্রিট অপরাধ হচ্ছে। যেমন- মোবাইল টান দেওয়া বা মোবাইল নিয়ে দৌড় দেওয়া। এর চেয়ে সহজভাবে কোনো অপরাধ করা যায় না। ৮০-৯০ ভাগ ক্ষেত্রে সেটি করে উঠতি বয়সের ছেলেরা। যারা এ কাজটি করছে তাদের বয়স ১৫-২০ বা ২২ বছর। আমরা যাদের কিশোর গ্যাং বলি। বাস, প্রাইভেট কার মোটরবাইকের যাত্রী হয়তো মনোনিবেশ করেন কথায়, তখন পেছন থেকে এসে মোবাইলটা টান দিয়ে দৌড় দেয়। ডিএমপির ডিসি (মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জানান, মোবাইল চুরি বা ছিনতাইয়ের ঘটনা জানালে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রতিনিয়ত আমরা চুরি বা ছিনতাই হওয়ার মোবাইল ফোন উদ্ধার করে প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিচ্ছি। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার লে. কর্নেল আশিকুর রহমান বলেন, নগরীতে চুরি-ছিনতাই প্রতিরোধে র্যাব সর্বদা তৎপর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, চুরি-ছিনতাইকে বড় কোনো ধরনের অপরাধ হিসেবে এখনো গণ্য করা হয় না। ফলে যারা গ্রেপ্তার হয়, তারা আদালত থেকে দ্রুত জামিনে বের হয়ে ফের একই অপরাধে জড়াচ্ছে। এসব ঘটনা কমাতে হলে সামাজিক নজরদারি বাড়ানোসহ একে অন্যের বিপদে এগিয়ে আসার প্রবণতা বাড়াতে হবে।