কিছুতেই ঢাকা নগরের বায়ুর মান উন্নত হচ্ছে না। দূষণকারীদের বিরুদ্ধে পরিবেশ উপদেষ্টার একাধিকবার কড়া হুঁশিয়ারি ও অভিযান চালিয়ে অবৈধ ইটভাটাগুলো বন্ধের পরও বায়ুদূষণে বিশ্বকে টেক্কা দিচ্ছে ঢাকা। গতকাল দিনভর ধুলা ও ধোঁয়ায় ঢাকা ছিল রাজধানীর আকাশ। এক কিলোমিটার দূরের ভবনগুলোও ছিল অস্পষ্ট। সকাল থেকে সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিশ্বের ১২৪টি বড় শহরের মধ্যে বায়ুদূষণে ঢাকা ছিল শীর্ষে। দূষণ সবচেয়ে বেশি ছিল অভিজাত এলাকা গুলশান, বারিধারা, ইস্টার্ন হাউজিং, মহাখালী ও পুরান ঢাকায়।
আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউ এয়ারের লাইভ প্রতিবেদনে এমন চিত্র দেখা গেছে। দিনভর বায়ুমান সূচকে বিশ্বের অন্য শহরগুলোর অবস্থান বদলালেও ঢাকা শীর্ষেই ছিল। গতকাল সকাল ৭টায় স্বাভাবিক বাতাসের চেয়ে ২৯ গুণ দূষিত বাতাসে শ্বাস নিয়ে ঘুম থেকে উঠেছে রাজধানীবাসী। এ সময় বায়ুমান সূচকে ঢাকার স্কোর ছিল ২২২, যা খুবই অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত। প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ক্ষতিকর অতিসূক্ষ্ম বস্তুকণা (পিএম ২.৫) ছিল ১৪৬.৭ মাইক্রোগ্রাম। পরের ঘণ্টায় দূষণ আরও বেড়ে সূচক হয় ২২৪। সকাল সাড়ে ১০টায় সূচক হয় ২২৬। এ সময় বায়ুমান সূচকে ১৯১ স্কোর নিয়ে ঢাকার পর দূষণে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল পাকিস্তানের লাহোর। ১৮৯ স্কোর নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে ছিল ভারতের নয়াদিল্লি। বিকাল ৪টায় দূষণ কিছুটা কমে ঢাকার স্কোর ১৯৬-এ নামলেও শীর্ষ অবস্থানের পরিবর্তন হয়নি। তবে এ সময় দূষণে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে আসে থাইল্যান্ডের চিয়াংমাই শহর ও তৃতীয় অবস্থানে ছিল ভিয়েতনামের হ্যানয়। সন্ধ্যা ৭টায়ও শীর্ষ দূষিত নগরী ছিল ঢাকা।
এদিকে ঢাকা দূষণের শীর্ষে থাকলেও সব এলাকায় দূষণ সমান পর্যায়ে ছিল না। বরাবরের মতো বায়ুর মান সবচেয়ে খারাপ ছিল কূটনৈতিকপাড়া বারিধারা এলাকা। সন্ধ্যা ৭টায় বায়ুমান সূচকে ঢাকার গড় স্কোর যখন ১৮৯, তখন বারিধারার মার্কিন দূতাবাস এলাকায় স্কোর ছিল ২৮০। অর্থাৎ অভিজাত এলাকা বারিধারার প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ক্ষতিকর পিএম ২.৫ ছিল ২০৫ মাইক্রোগ্রাম, যা স্বাভাবিক বাতাসের চেয়ে ৪১ গুণ দূষিত।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বায়ুম লীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরে সবচেয়ে দূষিত বাতাস থাকে জানুয়ারি মাসে। দূষণে দ্বিতীয় থাকে ফেব্রুয়ারি, তৃতীয় ডিসেম্বর ও চতুর্থ মার্চ। ২০১৬ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৯ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বায়ুমান সূচকে ঢাকার গড় স্কোর ছিল ১৮৮। গতকাল সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত স্কোর ছিল ২০০ এর উপরে ছিল।
মার্চেও ভয়াবহ বায়ুদূষণের কারণ ও রাজধানীর কেন্দ্রে কোনো ইটভাটা না থাকার পরও দূষণ সবচেয়ে বেশি থাকা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ক্যাপস-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ইটভাটা দূষণের অন্যতম একটা কারণ। তবে ঢাকায় বায়ুদূষণের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে বিধি না মেনে নির্মাণকাজ, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল ও দুই সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন স্থানে বর্জ্য পোড়ানো। এ ছাড়া গতকাল আকাশে মেঘ ছিল। সূর্যের আলো দেখা যায়নি। বাতাসও কম ছিল। তাই দূষক উপাদানগুলো মেঘ ও মাটির মাঝে আটকা পড়ে। এজন্য বাতাসের মান দ্বিগুণ খারাপ হয়ে যায়।