সিলেটের সকাল শুরু হয় একটু দেরিতে। রমজান মাস হলে তো কথাই নেই। এখানকার মানুষের দিন শুরু হতে হতেই ১২টা! এ কোলাহলমুক্ত নগরীর সকালটা হঠাৎই বদলে গেল গতকাল। বদলে দিলেন একজন, হামজা দেওয়ান চৌধুরী। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা প্রথম ফুটবলার যিনি এখন বাংলাদেশের জার্সি গায়ে মাঠ মাতাবেন। হাইপ্রোফাইল তারকা ফুটবলার হামজাকে বরণে গতকাল সকাল থেকে সিলেটে সাজ সাজ রব। দলে দলে ক্রীড়াপ্রেমীরা ছুটলেন ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ফুটবল ফেডারেশন কর্মকর্তা, ফুটবলপ্রেমী, গণমাধ্যমকর্মী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সরব উপস্থিতি- সবমিলিয়ে বিমানবন্দরে প্রচণ্ড ভিড়। সেই ভিড় ঠেলে হাসিমুখে বাইরে বেরোলেন চকোলেট ট্রাকস্যুট পরা হামজা। এরপর অবাক মুগ্ধতায় গ্রহণ করলেন বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসার ঢালি। ইংলিশ চ্যাম্পিয়নশিপে লিগে শেফিল্ড ইউনাইটেডের হয়ে খেলা হামজা চৌধুরী গতকাল বেলা পৌনে বারোটার দিকে সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান। তার আগমন ঘিরে পুরো বিমানবন্দর এলাকায় নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। সামগ্রিক পরিস্থিতি দেখা ও নিয়ন্ত্রণে আগের দিনই সিলেটে পৌঁছেছিলেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের চার কর্মকর্তা। কাল সকালে যোগ দেন আরও তিনজন। বিমানবন্দরে হামজাকে ফুলেল স্বাগত জানান সবাই। হামজাকে বরণ করে নিতে সকাল থেকে ওসমানী বিমানবন্দরে ভিড় করেন বিপুল সংখ্যক ফুটবলপ্রেমী। ব্যানার, ফেস্টুন, হ্যান্ডমাইক নিয়ে দলে দলে সেখানে যান তারা। বিমানবন্দরের কনকোর্স হলের বাইরে জড়ো হয়ে তারা ‘ওয়েলকাম টু মাদারল্যান্ড’ ‘হামজা দ্য কিং’ প্রভৃতি নানা স্লোগান দেন। বিমানবন্দরের বাইরের সড়কে হামজাকে স্বাগত জানিয়ে বাফুফের পক্ষ থেকেও বিলবোর্ড টানানো হয়।
এর আগেও দেশে এসেছিলেন হামজা চৌধুরী। কিন্তু এবারের আসায় দেখেন অভাবনীয় দৃশ্য, যেখানে কেবলই ভালোবাসায় স্নাত হওয়া। ভিআইপি মর্যাদায় দ্রুতই ইমিগ্রেশন শেষ হয় হামজার। এরপরই হামজাকে ঘিরে ধরেন সবাই। ভালোবাসার এ ‘যন্ত্রণা’ হাসিমুখে সয়ে ভিআইপি গেটের বাইরে আসেন হামজা। ফুটবলপ্রেমী ও গণমাধ্যমকর্মীদের ভিড়ে এখানে চিড়েচ্যাপ্টা হওয়ার যোগাড়! সাংবাদিকদের একের পর এক প্রশ্ন, কিন্তু শোরগোলে কিছুই তো বোঝা যায় না! সিলেটি ভাষায় হামজাই বললেন, ‘আমি বুঝছি না, বুঝছি না’। বাফুফে কর্মকর্তারা চেষ্টা চালিয়েও ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হন। শেষমেশ এ পরিস্থিতিতেই হামজা বলেন, ‘দেশে ফিরে ভালো লাগছে। আমি খুবই রোমাঞ্চিত। আমার হৃদয় পরিপূর্ণ।’ এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে ভারতে বিপক্ষে ২৫ মার্চ ম্যাচ খেলতে হামজার দেশে আসা, সেই ম্যাচ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্ন হট্টগোলের কারণে বুঝতে পারেননি হামজা। একাধিকবার প্রশ্ন করার পর বুঝতে পেরে বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ, আমরা উইন খরমু (করব)। আমার বড় স্বপ্ন আছে। কোচ হাভিয়েরের সঙ্গে কাজ করব। ইনশাআল্লাহ, আমরা উইন খরিয়া (করে) প্রোগ্রেস করতে পারমু।’ হামজা হয়তো আরও অনেক কথাই বলতেন, কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুতই তাকে ভিতরে নিয়ে যান বাফুফে কর্মকর্তারা। বিমানবন্দর থেকে ছাদখোলা গাড়িতে কঠোর নিরাপত্তায় হামজা চৌধুরীকে নিয়ে যাওয়া হয় তার গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার স্নানঘাট গ্রামে। সেখানেও ভালোবাসায় স্নাত হন এ তরুণ তুর্কি। আজ সন্ধ্যায় ঢাকায় গিয়ে টিম হোটেলে যোগ দেওয়ার কথা হামজার। আগামীকাল টিমের ফটোসেশন শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি করা হতে পারে। হামজাকে বরণে ঢাকায়ও তোড়জোড় চালাচ্ছে বাফুফে। ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া তারকা হামজা চৌধুরী। তারিক কাজি, জামাল ভূঁইয়া, কাজেম শাহ, ফাহমেদুলদের মতো প্রবাসী ফুটবলার জাতীয় দলে খেলেছেন। বিশ্বসেরা মেসি ও তার দল এ দেশে খেলে গেছে। কিন্তু হামজাকে ঘিরে যে ‘হাইপ’, তা ছাপিয়ে গেছে অতীতের সব। ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-২১ দলে খেলা হামজাকে শুধু বাংলাদেশই নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার সেরা ফুটবলার হিসেবে তকমা দিচ্ছেন অনেকেই।