মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল ভারতে যাই। সেখানে ৭ এপ্রিল থেকে শিলিগুড়ির মুজিব ক্যাম্পে মাসব্যাপী গেরিলা যুদ্ধ ও অস্ত্র পরিচালনার প্রশিক্ষণ শেষে ৬ নম্বর সেক্টরের নীলফামারী জেলা সীমান্তের হিমকুমারী ক্যাম্পে যোগদান করি। সেখানে ১ নম্বর কোম্পানির সেকশন কমান্ডার হিসেবে বিভিন্ন ব্রিজ, কালভার্ট, বিওপি ইত্যাদি ধ্বংস ও যোগাযোগ বিছিন্ন করার দায়িত্ব পালন করি।
মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসের প্রতিটি দিন-রাত ছিল অনেক স্মৃতিবিজড়িত। তরুণ, যুবক, ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক যারা আমাদের সহযোদ্ধা হিসেবে মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন, অনেকে শহীদ হয়েছেন, অনেকে নিজের সর্বস্ব দিয়ে আমাদের সক্রিয় সহযোগিতা করেছেন। বিশেষ করে গ্রামীণ নারীরা সহযোগিতা করেছেন। ১৯৭১-এর ১৭ ডিসেম্বর রংপুরে ফিরে মেডিকেল কলেজে স্থাপিত ক্যাম্পে অস্ত্র জমা দিয়ে বাসায় ফিরে যাই। পরদিন সকালে আমার প্রিয় সংগঠন টাউন হলের পেছনে শিখা সংসদে এসে যা দেখতে পাই তা ভাষায় বর্ণনাতীত। তখনো টাউন হলের গ্রিন রুমে একজন নারী পানি পানি বলে হাঁকছিল। শিখার পিয়ন নির্মলকে পানি দিতে বলি। নিয়তির নির্মম পরিহাস পানি পানের পরপরই ওই নারী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন আর কিছু বলতে পারেননি। আর একটি মেয়ে তার হাতের আঙুলের রক্ত দিয়ে হলের দেয়ালে লিখেছিল- আমি বাঁচতে চাই। হানাদার বাহিনী তাদের কাউকেই বাঁচতে দেয়নি। তারা রংপুর অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে নারী-পুরুষকে ধরে এনে পাশবিক নির্যাতন চালায়। ১৮ ডিসেম্বর সকালেও টাউন হলের পেছনের হর্টিকালচার ফার্মে অসংখ্য মানুষের লাশ শিয়াল-কুকুরে টানাহেঁচড়া করছিল। হলের পেছনের পাকা ইদারায় পড়ে ছিল অসংখ্য ধর্ষিত নারীর লাশ। এ সময় ১৬৭টি মাথার খুলি উদ্ধার করা হয়েছিল টাউন হল বধ্যভূমি থেকে। আর কিছু লাশের অংশবিশেষ ফার্মের মাটিতে গর্ত করে পুঁতে দেওয়া হয়েছিল।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, শ্রুতিলেখক : নজরুল ইসলাম মৃধা, রংপুর