পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম সাধনা ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। আশা করা যায় তোমরা মুত্তাকি হতে পারবে।।’ (সুরা বাকারাহ, আয়াত ১৮৩।) আরবি সিয়াম শব্দের অর্থ কোনো কিছু থেকে বিরত থাকা। সিয়ামের আরেকটি অর্থ হলো- সব ধরনের কাজকর্ম বন্ধ করে দেওয়া বা নিশ্চল থেমে থাকা। তাফসিরে মাজহারিতে সিয়াম শব্দের বিশ্লেষণ উল্লেখ করতে গিয়ে লেখক বলেন, ‘সাওম শব্দের অর্থ থেমে থাকা। মধ্য দুপুরকে আরবরা ‘সামান নাহার’ বলে থাকে। এর অর্থ হলো দিন থেমে আছে। মধ্য দুপুরে সূর্য ঠিক মাথার ওপরে থাকে। তখন মনে হয় সূর্য নিশ্চল। যদিও সূর্য ক্রম চলমান রয়েছে। শরিয়তের পরিভাষায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিয়তের সঙ্গে পানাহার ও যৌন ক্রিয়া বন্ধ রাখাকে সাওম বলে।’ (তাফসিরে মাজহারি, ১ম খ , ৩৫৬ পৃষ্ঠা।)
সিয়াম পালন করার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো মোত্তাকি হওয়া। মোত্তাকি শব্দটি এসেছে তাকওয়া শব্দ থেকে। আরবি তাকওয়া শব্দের অর্থ ভয়। যার মনে সব সময় আল্লাহতায়ালার ভয় কাজ করে, সে কখনো অন্যায়-অনিয়ম, মিথ্যা-দুর্নীতির সঙ্গে মিশে যেতে পারে না। এমন বান্দাকেই কোরআনে মোত্তাকি বলা হয়েছে। হাদিস শরিফে রসুল (সা.) বলেছেন, ‘আত্তাকওয়া হা হুনা। তাকওয়া থাকে এখানে। এই বলে তিনি বুকের বাঁ দিকে ইশারা করলেন।’ (মিশকাত।) তাকওয়া থাকে মনে। অন্তরে। হৃদয়ের গভীরে। যেখানে কোনো বিজ্ঞানীর এক্সরে মেশিনও পৌঁছতে পারে না- সেখানে লালন করতে হয় তাকওয়া। আফসোস! আমাদের তাকওয়া এখন পোশাকে-দাড়িতে-মেসওয়াকে এসে গেছে। তাই আমরাও মেকি মোত্তাকি, মেকি মুসলমান হয়ে পড়েছি। হে আমার দরদি পাঠক! সিয়াম এসেছে আমাদের সত্যিকারের মুমিন, খাঁটি মোত্তাকি বানাতে।
ইবাদতের মধ্যে সিয়ামই এমন একটি ইবাদত যা পালন করতে বাহ্যিক কোনো সুরতের প্রয়োজন হয় না। নামাজ পড়ার জন্য আপনাকে মসজিদে যেতে হয়, একটি নির্দিষ্ট নিয়মে দাঁড়াতে হয়, ওঠাবসা করতে হয়, মানুষ দেখে, দেখার সুযোগ থাকে। হজের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। জাকাত দিতে হলে অন্য মানুষ আপনার থেকে জাকাত নেবে। সে আপনার জাকাতের বিষয়টি জানবে, দেখবে। রোজাই একমাত্র ইবাদত, যা করতে অন্য কারও সাহায্য লাগে না, অন্য কেউ জানে না। মানে এখানে রিয়ার কোনো সুযোগ নেই। আপনি সারা দিন যার সঙ্গে কাজ করেন, তাকে যদি মুখ ফুটে না বলেন, তাহলে কিন্তু জানতেও পারবে না আপনি রোজাদার। তাহলে দেখা যাচ্ছে, রোজা একান্তই আপনার ইবাদত। আপনার আর আপনার প্রভু ছাড়া কেউ জানবে না আপনি রোজাদার। হ্যাঁ কেউ যদি রোজা না রেখেও রোজার ভান করে বা বলে বেড়ায় আামি রোজাদার, আমি রোজাদার, সেটা ভিন্ন কথা। সে তো রোজার মানেই বুঝল না।
এই যে আপনি একান্তভাবে রোজা রাখছেন, শুধু আল্লাহর জন্য। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানার-দেখার সুযোগ রইল না; ঠিক এ কারণেই আল্লাহ বলেছেন, ‘আদম সন্তানের সব আমলের প্রতিদান ১০ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। রোজার কথা ভিন্ন। রোজার প্রতিদান কত বাড়াব কী দেব সেটা শুধু আমিই জানি। আসসওমু লী ওয়া আনা আজযি বিহি। বান্দা রোজা রাখে শুধু আমার জন্যই। কেননা, অন্য কোনো উদ্দেশ্যে রোজা রাখার সুযোগ নেই। কেউ জানবে সে উপায়ও নেই। রোজা আমার জন্য। আমি নিজ হাতে এর প্রতিদান দেব। আরেকটি অনুবাদ হতে পারে এ রকম- রোজা আমার জন্য, আমিই রোজার পুরস্কার।’
আসলে রোজা একটি খেলা মাত্র। প্রেমের খেলা। এ খেলায় যারা অংশগ্রহণ করে, তারা কেউ চ্যাম্পিয়ন হয়, আবার কেউ হয় রানার্সআপ। যারা চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি, জীবনজুড়ে তাদের সাধনা করতে হবে। আর যারা চ্যম্পিয়ন হয়, তাদের জুটে যায় আল্লাহপ্রাপ্তি। কদরপ্রাপ্তি। তখন এক রাতের প্রেম-মিলন তাদের কাছে হাজার রাতের চেয়েও বেশি মধুর, বেশি দামি মনে হয়। সুফি গবেষক আহমাদ উল্লাহর গবেষণায় এভাবেই উঠে এসেছে সিয়াম সাধনার সার-নির্যাস।
তো পাঠক! আমাদের রোজাও যেন হয় আল্লাহপ্রাপ্তির রোজা। কদর পাওয়ার রোজা। আমরা যেন রোজা রেখে জাহান্নামি না হই। হাদিস শরিফে রসুল (সা.) বলেছেন, ‘কত রোজাদার আছে, তাদের শুধু উপাস থাকা ছাড়া আর কোনো ফায়দা হয় না।’ আফসোস! তাদের জন্য যারা সিয়ামের মতো মহাসমুদ্র থেকে একবিন্দুও অর্জন করতে পারে না। আফসোস! যারা সিয়াম পেয়েও মানুষ থেকে মুমিন, মুমিন থেকে মোত্তাাকি, মোত্তাকি থেকে সুফি-দরবেশ হয়ে আল্লাহওয়ালা হতে পারে না। হে আল্লাহ! আমাদের সিয়ামকে সুফি হওয়ার মাধ্যম বানিয়ে দিন। এ সিয়াম যেন হয় আমাদের জন্য তোমাকে পাওয়ার, কদর পাওয়ার সিয়াম। হয় যেন প্রেমের খেলায়, আশেক মাশুকের খেলায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সিয়াম। আমিন।
লেখক : প্রিন্সিপাল, সেইফ এডুকেশন ইনস্টিটিউট
পীর সাহেব, আউলিয়ানগর, www.selimazadi.com