জুলাই বিপ্লবের চেতনায় বৈষম্যমুক্ত সমাজব্যবস্থা কায়েম, সাম্য ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে আগামীর বাংলাদেশ গড়তে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নামে নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটল, যার নেতৃত্বে থাকছেন বিপ্লবে সামনের কাতারে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র সমন্বয়করা। গতকাল বিকালে রাজধানীর ঐতিহাসিক মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে নতুন এ রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে।
নতুন দল ঘোষণার পর এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ ও দেশের জনগণের স্বার্থ সামনে রেখে রাষ্ট্র বিনির্মাণ করব। বাংলাদেশে ভারত ও পাকিস্তানপন্থি রাজনীতির ঠাঁই হবে না।’ গণপরিষদ নির্বাচনের দাবি জানিয়ে পার্টির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ নতুন করে দেশ গড়ার সুযোগ পেয়েছেন। এ নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের দায়িত্ব, যে তরুণরা নিতে চান, তারা ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষা- সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করবেন।’ প্রধান সমন্বয়কারী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘আজকের ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে উপস্থিত হয়েছি। বিগত সময়ে আমরা যারা গণতন্ত্রের কথা বলেছি- তাদের গুম, খুন, হত্যা করে ক্ষান্ত হয়নি বিদেশেও পাঠিয়েছে। গত ১৫ বছর যারা অত্যাচারিত হয়েছেন তাদের অভিনন্দন।’ জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেন, ‘আমরা রাজনৈতিক দল গঠন করছি তার মূল কারণ হচ্ছে দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি আমাদের ওয়াদা।’ দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠকের দায়িত্ব পাওয়া হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘যতদিন না এ দেশ থেকে পরিবারতন্ত্র কবরস্থ হবে, আমরা ততদিন লড়ে যাব। যোগ্যতার ভিত্তিতে দেশের নেতৃত্ব গড়ে উঠবে।’ পার্টির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম বলেন, ‘এ মঞ্চ থেকে আমরা শপথ নিতে চাই, এ ছোট জীবনে এত বড় দায়িত্বের আমানত যেন আমরা খেয়ানত না করি।’ যুগ্ম সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসুদ বলেন, ‘আমাদের সামনে উপস্থিত আছেন গণতন্ত্রের ইমাম নাহিদ ইসলাম। যিনি ক্ষমতার মসনদ থেকে রাজপথে ফিরে এসেছেন। এটা ঐতিহাসিক অধ্যায়।’ যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা বলেন, ‘আমরা নতুন ধারায় রাজনীতি করতে এসেছি। বিগত দিনগুলোতে রাজনীতির মানে ছিল ক্ষমতার খেলা।’
গতকাল সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন এ দলের নাম ঘোষণা করা হয়। শহীদ মো. ইসমাইল হাসান রাব্বির বোন মিম আক্তার দলটির নাম ঘোষণা করেন। নতুন দলের আহ্বায়ক হয়েছেন নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব করা হয়েছে আখতার হোসেনকে। আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের নাম ঘোষণার পর দলের আংশিক অর্গানোগ্রাম পড়ে শোনান আখতার হোসেন। আংশিক কমিটির অন্যান্য সদস্যের নাম ঘোষণা করেন তিনি। দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক পদে সামান্তা শারমিন ও আরিফুল ইসলাম আদীব, সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব পদে ডা. তাসনিম জারা ও নাহিদা সরোয়ার নিভা, প্রধান সমন্বয়কারী পদে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, যুগ্ম সমন্বয়ক পদে আবদুল হান্নান মাসউদ, মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) পদে হাসনাত আবদুল্লাহ ও মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) পদে সারজিস আলমের নাম ঘোষণা করেন তিনি। কমিটিতে মোট ১৫১টি পদ রয়েছে।
বিকাল সোয়া ৪টার দিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠান শুরু হয়। ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠের পর জুলাই গণ অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে জুলাই বিপ্লবের ওপর নির্মিত একটি ডকুমেন্টারি এবং আরেকটি ডকুমেন্টারিতে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, শেখ মুজিবুর রহমানের শাসন, নব্বইয়ের গণ অভ্যুত্থান এবং চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের প্রেক্ষাপট সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে যোগ দেন দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, জুলাই গণ অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যরা। এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিভিন্ন জেলা ও ঢাকার বিভিন্ন থানার নেতারা অনুষ্ঠানে মিছিল নিয়ে অংশ নেন।
ঘোষণাপত্রে যা আছে : অনুষ্ঠানে দলের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশ গড়তে আমরা প্রত্যেকে যার যার অবস্থান থেকে শপথ করি, ঐক্যবদ্ধ হই। আমাদের কাক্সিক্ষত সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে দৃঢ়চিত্তে এগিয়ে যাই। আমাদের দেশ, আমাদের অধিকার, আমাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিক অধরা কোনো স্বপ্ন নয়- এটি আমাদের প্রতিজ্ঞা।
নাহিদ ইসলাম বলেন, আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, হাজারো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এ নতুন স্বাধীনতা কেবল একটি সরকার পতন করে আরেকটি সরকার বসানোর জন্যই ঘটেনি। জনগণ বরং রাষ্ট্রের আষ্টেপৃষ্ঠে জেঁকে বসা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বিলোপের মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আকাক্সক্ষা থেকে এ অভ্যুত্থানে সাড়া দিয়েছিল, যেন জনগণের অধিকারভিত্তিক একটি রাষ্ট্র পুনর্গঠিত হয়। সে লক্ষ্য নিয়েই আমরা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিচ্ছি। এটি হবে একটি গণতান্ত্রিক, সমতাভিত্তিক ও জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল।
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক বলেন, আমরা দৃঢভাবে বিশ্বাস করি, জুলাই ২০২৪ গণ অভ্যুত্থান কেবল একটি ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধেই বিজয় নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণেরও শপথ। এখনই সময় নতুন স্বপ্ন দেখার, নতুন পথচলার এবং একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জুলাই শহীদ জাবীর ইবরাহীম (বয়স ৬)-এর বাবা নওশের আলী। তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লবে যে রক্তক্ষরণ হয়েছে, এর পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই না। নতুন রাজনৈতিক দলের প্রতি আমার অকুণ্ঠ সমর্থন থাকবে। তাদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে তারা যেন নতুন বাংলাদেশ উপহার দিতে পারে। আমি চাইব নতুন দলের কাছে বাংলাদেশ যেন নিরাপদ থাকে। শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি আমাদের সমর্থন থাকবে।