২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশন একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সব প্রস্তুতি নিচ্ছে। রোডম্যাপও ঘোষণা করেছে। অথচ আনুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনসহ কয়েকটি বিষয় নিয়ে গণ অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে ‘মরণপণ’ লড়াই চলমান, তাতে সরকার ঘোষিত নির্বাচন যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হওয়া নিয়ে জনমনে ধোঁয়াশা কাটছে না। যদি রাজনৈতিক দলগুলো তাদের দ্বিমতের বিষয়গুলোতে ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারে তাহলে দেশ গণতন্ত্রের পথ হারাতে পারে।
ফ্যাসিবাদী সরকারের বিদায়ের পর দেশের জনগণ একটি মানবিক বাংলাদেশের প্রত্যাশায় আইনের শাসন এবং সর্বস্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা করেছিল। কিন্তু জনগণের সেই প্রত্যাশা পূরণের দিকে দেশ কচ্ছপগতিতে এগোচ্ছে।
তাই একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার জনগণের এই প্রত্যাশা পূরণের পথ দেখাতে পারে। অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোকে দ্বিমতের জায়গায় অবশ্যই ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। তা না হলে মানবিক বাংলাদেশে, আইনের শাসন ও সুশাসনের আশা অধরাই থেকে যাবে।
ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের মধ্যে সংলাপে ১৮৮ সুপারিশের মধ্যে ৭১টিতে একমত হয়েছে। তার মধ্য থেকে ঐকমত্য কমিশন সংলাপে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর কাছে জুলাই সনদের জন্য আট দফা অঙ্গীকারনামা মতামতের জন্য পাঠিয়েছে। এর কয়েকটি দফায় দলগুলো ভিন্ন ভিন্ন মতামত দিয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত বিরোধপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য না হবে, ততক্ষণ এই সংকট দূর হওয়া কঠিন।
যেমন ‘জুলাই সনদকে সংবিধানের ওপর প্রাধান্য দিতে হবে এবং এই সনদ সম্পর্কে আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না।’ এ দাবি এনসিপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের। এতে একমত নয় বিএনপি।
এ ছাড়া এই সনদের আইনি ভিত্তি এবং নির্বাচনের আগে বাস্তবায়নের দাবিতে সোচ্চার এনসিপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন। কিন্তু বিএনপি চায়, যেসব সাংবিধানিক সংস্কারে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো নির্বাচনের আগে নয়; আগামী সংসদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে। আবার আগামী সংসদ নির্বাচন আনুপাতিক পদ্ধতিতে চায় এনসিপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন। অর্থাৎ যে রাজনৈতিক দল বা জোট দেশের মোট ভোটের যত শতাংশ পাবে, সংসদে সেই দল বা জোট তত শতাংশ প্রতিনিধি পাবে। এতে এই দলগুলো মনে করছে, তাহলে ছোট দলগুলোরও সংসদে প্রতিনিধিত্ব থাকবে এবং সরকারি দল যাতে স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে তার রাশ টেনে ধরা যাবে।
অপর মত হচ্ছে, পিআর পদ্ধতির নির্বাচনে দলের প্রতীকে ভোট দেওয়ার বিধান থাকায় নির্দিষ্ট এলাকার নির্দিষ্ট প্রতিনিধি থাকে না। আবার রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারাই তাদের পছন্দের লোককে প্রতিনিধি করতে পারেন। যেখানে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে না। এ ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরেও বিভিন্ন জনগোষ্ঠী যেমন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ যারা মাঝেমধ্যে প্রশ্ন তোলে সাম্প্রদায়িকতার এবং আদিবাসীরা যাদের মধ্যে কেউ স্বায়ত্তশাসন চায়, আবার কেউ বা স্বাধীনতা। এ ছাড়া গার্মেন্ট শ্রমিক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, যৌনকর্মী ও সমকামী ইত্যাদি জনগোষ্ঠীও তাদের দাবি নিয়ে সোচ্চার। এসব জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে যদি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে তাদের প্রতিনিধি সংসদে পাঠাতে পারে, তাহলে সংসদে অনিবার্যভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাশাপাশি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। আবার এনসিপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন দাবি করছে গণপরিষদ নির্বাচন। তারা বলছে, ১২০ দিনের মধ্যে গণপরিষদ ‘পুনর্লিখিত সংবিধান’ প্রণয়ন ও গ্রহণ করবে। এরপর গণপরিষদ পাঁচ বছর মেয়াদি সংসদে রূপান্তরিত হবে। তাতে নির্বাচন বিলম্বের আশঙ্কা থাকছে না। তারা আরও বলছে, বর্তমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭৯ অনুযায়ী সংসদের কার্যক্রম এবং ১২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচনি আইন ও নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলা যায় না। তারা বলছে, জিয়াউর রহমান যেভাবে সংসদের বাইরে সংবিধান সংশোধন করেছেন, একইভাবে এবারও জনগণের অভিপ্রায়ে করা যায়।
বিএনপি এই বক্তব্য নাকচ করে দিয়ে বলেছে, ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির ফরমানে সংবিধানের সেসব পরিবর্তন আনা হয়েছিল, তা পরে সংসদে অনুমোদন করা হয়েছিল। সেই সময়ে সংবিধান স্থগিত ছিল।
লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট